• 29 Oct, 2026

চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও চা জাদুঘর: শ্রীমঙ্গলে চা-বিজ্ঞান আর দেড়শ বছরের ঐতিহ্য

চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ও চা জাদুঘর: শ্রীমঙ্গলে চা-বিজ্ঞান আর দেড়শ বছরের ঐতিহ্য

শ্রীমঙ্গলের দুই চা-ঠিকানা — বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (১৯৫৭ সালে গবেষণা স্টেশন, ১৯৭৩ থেকে ইনস্টিটিউট; ২৩টি ক্লোন ও ৫টি বীজজাতের উদ্ভাবক) ও দেশের প্রথম চা জাদুঘর (খুলেছে ১৬ সেপ্টেম্বর ২০০৯; চার কক্ষে বঙ্গবন্ধুর চেয়ার-টেবিল থেকে শ্রমিকদের রৌপ্য মুদ্রা) — যাচাইকৃত গাইড।

শ্রীমঙ্গলের চা-গল্পের দুটি প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যায় এক রাস্তাতেই — ভানুগাছ সড়ক ধরে শহর থেকে ~৩ কিলোমিটার গেলেই সবুজে ঘেরা দুটি ক্যাম্পাস: একদিকে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) — যেখানে চায়ের ভবিষ্যত লেখা হয়; আরেকদিকে চা জাদুঘর — যেখানে সংরক্ষিত তার দেড়শ বছরের অতীত।

বিটিআরআই: গবেষণা স্টেশন থেকে ইনস্টিটিউট

  • প্রতিষ্ঠার ধাপগুলো: দেশভাগের পর চা-শিল্পের প্রযুক্তিগত ঘাটতি মেটাতে পাকিস্তান চা বোর্ড ১৯৫২ সালে নিজস্ব গবেষণা স্টেশনের সিদ্ধান্ত নেয়; ফলে ১৯৫৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে যাত্রা শুরু করে ‘পাকিস্তান চা গবেষণা স্টেশন’। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে সেটি পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউটে উন্নীত হয়ে পায় বর্তমান নাম (বিটিআরআই-এর নিজস্ব ওয়েবসাইট/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
  • পরিচিতি: এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ চা বোর্ডের স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার অন্যতম ইনস্টিটিউট। প্রধান কার্যালয় শ্রীমঙ্গলেই।
  • অবদান: বিটিআরআই এ পর্যন্ত উচ্চফলনশীল ও মানসম্পন্ন ২৩টি ক্লোন ও ৫টি বীজজাত উদ্ভাবন করেছে (বিটিআরআই); আটটি গবেষণা বিভাগের মাধ্যমে চাষপ্রযুক্তি, মৃত্তিকা, পোকা-রোগ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কাজ চলছে, আর গবেষণার ফল বাগানগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়াই প্রতিষ্ঠানটির কাজের অর্ধেক।
  • দর্শনার্থীদের জন্য: এটি প্রথমত গবেষণা-প্রতিষ্ঠান, পিকনিক স্পট নয় — ক্যাম্পাসের প্রায়োগিক বাগান ও গাছপালার সবুজ বাইরে থেকে উপভোগ করা গেলেও ভেতরে ঘোরার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি প্রয়োজন ধরে নিন। বিজ্ঞানমনস্ক ভ্রমণকারীর আসল গন্তব্য এর পাশের জাদুঘরটি।

চা জাদুঘর: চার কক্ষে দেড়শ বছর

  • পরিচয়: দেশের প্রথম চা জাদুঘর, দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় ২০০৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর (ডেইলি স্টার, মে ২০২৪)। ভানুগাছ সড়কের ধারে, সবুজ পরিবেশে অবস্থিত — কাছেই বিটিআরআই ক্যাম্পাস।
  • প্রথম কক্ষ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি; পাশে তাঁর ব্যবহৃত চেয়ার ও টেবিল — ১৯৫৭–৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান চা বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কার স্মৃতিচিহ্ন (ডেইলি স্টার)।
  • দ্বিতীয় কক্ষ: চা-গাছ দিয়ে তৈরি আসবাব, ব্রিটিশ আমলে শ্রমিকদের ছাঁটাই ও আগাছা পরিষ্কারের যন্ত্র, ম্যানেজারদের বাংলোর প্রাচীন রেডিও, দেয়ালঘড়ি, চারা রোপণের বিশেষ সরঞ্জাম, নানা ধরনের কলম। এখানেই দেখা মেলে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার রুপো ও তামার মুদ্রার সংগ্রহ — বাগান-জীবনের অর্থনীতির সরাসরি সাক্ষ্য।
  • তৃতীয় কক্ষ: কেরোসিনে চলা পুরনো ফ্রিজ, ভিনটেজ গাড়ির চেসিস, বৈদ্যুতিক পাখা, ট্রাক্টরের লাঙলের অংশ, বাগান-প্রহরীদের ধনুক-তীর, হিসাবরক্ষকদের টাকার বাক্স — আর বিটিআরআইয়ের প্রথম কম্পিউটার ও টাইপরাইটার।
  • চতুর্থ কক্ষসহ পুরো সংগ্রহ: অন্য ভ্রমণ-বিবরণে মোট ৪৪টির বেশি স্মারক-সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে (ইনফোপোকা)। পুরনো চা-গাছের কাঠে তৈরি ছোট টেবিলগুলো জাদুঘরের সবচেয়ে অভিনব প্রদর্শনীগুলোর একটি — গাছ থেকে আসবাব, অর্থাৎ শিল্পটা নিজেই নিজের ইতিহাসের সাক্ষী।

দুটি মিলিয়ে এক বিকেল

ক্যাম্পাস-এলাকাটি শান্ত ও ছায়াঘেরা — জাদুঘর দেখতে আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা যথেষ্ট। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বন্ধ থাকতে পারে; যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নিন (জাদুঘরের নির্ধারিত সময়সূচি অনলাইনে নিয়মিত হালনাগাদ হয় না)। প্রবেশে নামমাত্র ফি প্রযোজ্য হতে পারে।

যাওয়া ও টিপস

  • রুট: শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ভানুগাছ সড়কে রিকশা/ইজিবাইক/সিএনজিতে ~৩ কিমি; ড্রাইভারকে ‘চা জাদুঘর’ বা ‘বিটিআরআই’ বললেই চেনে।
  • কম্বিনেশন: একই সড়ক ধরে এগোলে কমলগঞ্জের পথে মাধবপুর লেক — একই অর্ধদিনে দুটোই ধরা যায়।
  • শিষ্টাচার: জাদুঘরের প্রদর্শনীতে হাত দেওয়া যাবে না; বিটিআরআই ক্যাম্পাসে অনুমতি ছাড়া ভেতরে যাওয়া ঠিক নয় — দুটোই সংরক্ষিত প্রাঙ্গণ।

অর্ধদিনের নমুনা সূচি

  • দুপুর ৩টা: চা জাদুঘর — চার কক্ষ মন দিয়ে।
  • বিকেল: বিটিআরআই ক্যাম্পাসের বাইরের সবুজে হাঁটা, ভানুগাছ সড়কের চা-দোকানে এক কাপ তাজা চা।
  • সন্ধ্যা: শহরে ফিরে নীলকণ্ঠের সাতরঙা চা — অতীত দেখা শেষে বর্তমানের স্বাদ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

চা জাদুঘর কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

২০০৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর — দেশের প্রথম চা জাদুঘর হিসেবে (ডেইলি স্টার)।

বিটিআরআই কবে থেকে কাজ করছে?

১৯৫৭ সালে গবেষণা স্টেশন হিসেবে শুরু; ইনস্টিটিউটের মর্যাদা পায় ১৯৭৩ সালে।

জাদুঘরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রদর্শনী কোনটি?

অনেকের কাছে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত চেয়ার-টেবিল; কারো কাছে শ্রমিকদের মজুরির রৌপ্য মুদ্রা আর চা-গাছের আসবাব — দুটোই ইতিহাসের দুই মেরুর গল্প বলে।

শেষকথা

চা এখানে শুধু পানীয় নয় — গবেষণাগার থেকে জাদুঘর পর্যন্ত যার জীবনী লেখা আছে। আর সেই জীবনীর প্রথম পাতাটা লেখা হয়েছিল কোথায়, তার গল্প মালনীছড়ার পোস্টে। পরের পোস্টে প্রকৃতির কাছে ফেরা — লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের উল্লুক-বন।