• 31 Oct, 2026

বুড়িমারী স্থলবন্দর ও তিনবিঘা করিডোর গাইড — পাটগ্রাম সীমান্তের বাণিজ্য ও ইমিগ্রেশন, বুড়িমারী এক্সপ্রেসের বাস্তবতা, ১৭৮ মিটার করিডোরের ইতিহাস এবং দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের গল্পসহ ভ্রমণ তথ্য।

লালমনিরহাটের উত্তরের শেষ প্রান্ত পাটগ্রাম — এখানে একই উপজেলায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেশের অন্যতম ব্যস্ত সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্র বুড়িমারী স্থলবন্দর আর দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অস্বাভাবিক সীমান্ত-ব্যবস্থা তিনবিঘা করিডোর। একদিকে ট্রাকের সারি আর ইমিগ্রেশনের লাইন, অন্যদিকে মাত্র ১৭৮ মিটার লম্বা একটা সড়ক, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটা গোটা জনপদের ঠিকানা।

বুড়িমারী বন্দর: শুল্ক স্টেশন থেকে স্থলবন্দর

বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে স্থলপথে বাণিজ্যের জন্য বুড়িমারী জিরো পয়েন্টে ১৯৮৮ সালে শুল্ক স্টেশন চালু হয়; ২০০২ সালের ১২ জানুয়ারি সেটি স্থলবন্দর ঘোষিত হয় এবং ২০১০ সালের ৯ এপ্রিল থেকে বন্দরের পূর্ণ কার্যক্রম শুরু হয় — পরিচালনায় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। ওপারে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জের চ্যাংরাবান্ধা। অবস্থান: পাটগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার, লালমনিরহাট থেকে প্রায় ৯৫ কিলোমিটার; ভুটানের ফুন্টসলিং এখান থেকে মাত্র প্রায় ১০৮ কিলোমিটার (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

বাণিজ্য: পাথর, কয়লা আর ভুটান-নেপালের ট্রানজিট

এই বন্দর দিয়ে আমদানি হয় কয়লা, পাথর, কাঠ, সিমেন্ট, চায়না ক্লে, কোয়ার্টজ, রাসায়নিক সার, ফলমূল, পেঁয়াজ-রসুন-আদা, চাল-ডাল-গমসহ নানা পণ্য; বাংলাদেশ থেকে যায় ইলিশ, মেলামাইন সামগ্রী ও ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বিশেষ করে ভুটান থেকে পাথর আমদানির প্রধান পথ এই বুড়িমারী, আর ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভুটান ও নেপালের সঙ্গে ট্রানজিট বাণিজ্যও চলে এই রুটে। উত্তরের আরেক পাথর-বাণিজ্যের বন্দর সোনাহাটের গল্প এই বুড়িমারীরই প্রতিচ্ছবি। যাত্রীদের জন্য এখানে সক্রিয় ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট রয়েছে — উৎসবের ছুটিতে পণ্য পারাপার বন্ধ থাকলেও পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চলাচল স্বাভাবিক থাকে (অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন)।

বুড়িমারী এক্সপ্রেস: নামে বুড়িমারী, গন্তব্য লালমনিরহাট

সীমান্তযাত্রীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেটাতে ২০২৪ সালের ১২ মার্চ চালু হয় আন্তঃনগর বুড়িমারী এক্সপ্রেস (বাংলা উইকিপিডিয়া)। তবে সৎ তথ্যটা জরুরি: মূল ট্রেনটি চলে ঢাকা–লালমনিরহাট পথে; বুড়িমারী থেকে যাত্রীরা শাটল ট্রেনে লালমনিরহাট এসে এক্সপ্রেস ধরেন। সরাসরি বুড়িমারী–ঢাকা ট্রেনের দাবিতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে পাটগ্রাম-হাতীবান্ধায় রেল অবরোধও হয়েছিল; কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে তা ওঠে (সংবাদ প্রতিবেদন)। লালমনিরহাট–বুড়িমারী রেলপথ প্রায় ৮৪ কিলোমিটার, স্টেশন ১৩টি। আর এই জেলারই অন্য প্রান্তের দর্শনীয় জল-অবকাঠামো তিস্তা ব্যারেজ — একই সফরে জোড়া দেওয়া যায়।

তিনবিঘা করিডোর: ১৭৮ মিটারের ইতিহাস

পাটগ্রাম শহরের কাছেই সেই বিখ্যাত সড়ক — ভারতের জমি, মাপ মাত্র ১৭৮ মিটার লম্বা ও ৮৫ মিটার চওড়া। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে ভারত এই জমি বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে ইজারা দিতে সম্মত হয়, যাতে ভারতের ভেতরে ঘেরা বাংলাদেশি ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় (উইকিপিডিয়া; ডেইলি স্টার)। বাংলাদেশ তখনই দক্ষিণ বেরুবাড়ি হস্তান্তর করলেও ভারতের পক্ষে সাংবিধানিক জটিলতায় করিডোর হস্তান্তর আটকে থাকে প্রায় দুই দশক। অবশেষে ১৯৯২ সালের ২৬ জুন করিডোর খোলে দিনে মাত্র ছয় ঘণ্টার জন্য; ১৯৯৬ সাল থেকে বারো ঘণ্টা; আর ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর চব্বিশ ঘণ্টা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় (ডেইলি স্টার)। ২০১৫ সালের ছিটমহল বিনিময়ে ১৬২টি ছিটমহলের সব মিটে গেলেও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা থেকে যায় — আজ এটাই বাংলাদেশের একমাত্র টিকে থাকা ছিটমহল, আয়তন প্রায় ১৮.৬৮ বর্গকিলোমিটার (ডেইলি স্টার, ২০১১)।

ভ্রমণ তথ্য ও সতর্কতা

যাওয়া: লালমনিরহাট থেকে বাস বা ট্রেনে পাটগ্রাম/বুড়িমারী; ঢাকা থেকে বুড়িমারী এক্সপ্রেসে লালমনিরহাট নেমে শাটল বা বাসে। ভারতে যেতে বৈধ পাসপোর্ট-ভিসা বাধ্যতামূলক; সীমান্তের ছুটির ক্যালেন্ডার দেখে যান — যেমন দুর্গাপূজায় অক্টোবর ২০২৬-এ টানা সাত দিন পণ্য পারাপার বন্ধ ছিল (যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক ছিল) এবং নভেম্বরেও পূজা উপলক্ষে কিছুদিন বন্ধের ঘোষণা রয়েছে (অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন) — সর্বশেষ অবস্থা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নিন। তিনবিঘা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা: করিডোরটি ছিটমহলবাসীর যাতায়াতের পথ, সাধারণ পর্যটকদের অবাধ প্রবেশের জায়গা নয়; এলাকায় গেলে চেকপোস্টের নিয়ম মেনে চলুন, অনুমতি ছাড়া ছিটমহলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করবেন না, আর সীমান্ত এলাকায় ছবি তোলার আগে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশনা জেনে নিন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বুড়িমারী স্থলবন্দর কবে চালু হয়?

শুল্ক স্টেশন ১৯৮৮ সালে; স্থলবন্দর ঘোষণা ২০০২ সালে; পূর্ণ কার্যক্রম ২০১০ সালের ৯ এপ্রিল থেকে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

ওপারের ভারতীয় স্টেশন কোনটি?

পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার চ্যাংরাবান্ধা (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

তিনবিঘা করিডোর কত বড়?

১৭৮ মিটার লম্বা ও ৮৫ মিটার চওড়া ভারতীয় জমি, যা স্থায়ী ইজারায় বাংলাদেশ ব্যবহার করে (উইকিপিডিয়া)।

করিডোর এখন কতক্ষণ খোলা থাকে?

২০১১ সালের অক্টোবর থেকে চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা (ডেইলি স্টার)।

বুড়িমারী এক্সপ্রেস কি সরাসরি বুড়িমারী যায়?

না — মূল ট্রেন ঢাকা–লালমনিরহাট চলে; বুড়িমারী থেকে শাটল ট্রেন সংযোগ দেয় (বাংলা উইকিপিডিয়া; সংবাদ প্রতিবেদন)।

দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা কি এখনো ছিটমহল?

হ্যাঁ — ২০১৫ সালের বিনিময়ের পর এটাই একমাত্র টিকে থাকা বাংলাদেশি ছিটমহল, করিডোর দিয়েই মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।

শেষকথা

বুড়িমারীতে একই দিনে দেখা মেলে বাণিজ্যের বাংলাদেশ আর ভূগোলের অদ্ভুত বাস্তবতা — যেখানে ১৭৮ মিটারের একটা সড়ক একটা জনপদের মুক্তির নাম। সীমান্ত ভ্রমণে এই দুই গল্পই পাটগ্রামকে দেশের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঠিকানাগুলোর একটা করে তোলে।