• 29 Oct, 2026

হবিগঞ্জ শহর ও উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ: সুলতানি আমলের লাল টিলা

হবিগঞ্জ শহর ও উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ: সুলতানি আমলের লাল টিলা

খোয়াই নদীর তীরে হবিগঞ্জ শহর — হবিবগঞ্জ থেকে নামের ইতিহাস; শহর থেকে ১১ কিমি দূরে উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ (১৫১৩, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমল, নির্মাতা শাহ মজলিস আমিন) — ‘গায়েবী মসজিদ’ হিসেবে স্থানীয় পরিচিতিসহ যাচাইকৃত গাইড।

হবিগঞ্জ জেলার আগের পোস্টগুলো ছিল বন, বাগান আর গ্রামের — তেলিয়াপাড়ার ইতিহাস ও বানিয়াচংয়ের রাজবাড়ি। এবার জেলা সদর শহরটা নিজে: খোয়াই নদীর তীরের এই জনপদের ইতিহাস পাঁচশ বছরের পুরনো একটি মসজিদ পর্যন্ত পৌঁছায় — শহরের উপকণ্ঠের এক লাল টিলায় দাঁড়িয়ে থাকা উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ।

হবিবগঞ্জ থেকে হবিগঞ্জ: শহরের নামকথা

  • জেলা-পরিচিতির প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ঐতিহাসিক সুলতানসী হাবেলীর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ সুলতানের বংশধর সৈয়দ হবিব উল্লাহ খোয়াই নদীর তীরে একটি গঞ্জ (বাজার) প্রতিষ্ঠা করেন; তাঁর নাম থেকেই জায়গাটির নাম হয় হবিবগঞ্জ, যা কালক্রমে হবিগঞ্জ (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
  • প্রশাসনিক সিঁড়ি: ১৮৬৭ সালে মহকুমা ঘোষণা ও ১৮৭৮ সালে সিলেট জেলার অন্তর্ভুক্ত মহকুমা হিসেবে যাত্রা; ১৮৯৩ সালের ৭ এপ্রিল থানা গঠিত হয় (আসাম প্রাদেশিক সরকারের বিজ্ঞপ্তি); অবশেষে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ জেলায় উন্নীত হয় হবিগঞ্জ (সিলেটপিডিয়া/বাংলা উইকিপিডিয়া)। জেলার মোট আয়তন ২,৬৩৬.৫৮ বর্গকিমি।
  • আজকের শহরটি জেলার বাণিজ্য-প্রাণকেন্দ্র — চা, গ্যাসক্ষেত্র আর হাওরের মাছের আড়ত ঘিরে এর ব্যস্ততা। একক কোনো বিখ্যাত খাবার না থাকলেও স্থানীয় আনারস, কমলা, পান, লেবু ও কাঁঠালের সুখ্যাতি আছে; হাওরের তাজা মাছ আর খামারের হাঁসের ঝোল খাবারের টেবিলের নিয়মিত অতিথি (উইকিভ্রমণ)।

শহর থেকে ১১ কিলোমিটার: উচাইলের পথে

শহর থেকে বাস/সিএনজিতে ~১১ কিলোমিটার গেলেই রাজিউড়া ইউনিয়নের উচাইল (শংকরপাশা) গ্রাম। পথের শেষটা গ্রাম্য — সাইনবোর্ড প্রায় নেই, স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করতে হয়; আর সেখানে মসজিদটিকে সবাই চেনে অন্য নামে — ‘গায়েবী মসজিদ’ (ভ্রমণ-ব্লগ প্রতিবেদন)। নামটির কারণও ইতিহাসের অংশ: দীর্ঘকাল জঙ্গলে ঢাকা থাকার পর আবাদের সময় মসজিদটি যেন ‘গায়েব থেকে’ ফিরে এসেছিল।

মসজিদটি: শিলালিপি যা বলে

  • নির্মাণকাল: মসজিদের গায়ে উৎকীর্ণ শিলালিপি অনুযায়ী নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ১৫১৩ সালে, বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে; নির্মাতা তাঁর প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহ মজলিস আমিন (বাংলা উইকিপিডিয়া/প্রথম আলো)। বাংলাপিডিয়ার মতে ভবনটির নির্মাণকাল ১৪৯৪–১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে — তারিখ নিয়ে দুটি পাঠ থাকলেও সুলতানি আমল ও নির্মাতা নিয়ে সূত্রগুলো একমত।
  • উদ্দেশ্য: ইংরেজি উইকিপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, তরফ বিজয়ের স্মরণে, সেই স্থানেই মসজিদটি নির্মিত — যেখান থেকে বিজয়-অভিযান শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়; নির্মাতা মজলিস আমিন নিজে ছিলেন শাহজালালের সঙ্গী সাধকদের ধারার সঙ্গে যুক্ত, আর তাঁর মাজার মসজিদের পাশেই অবস্থিত।
  • স্থাপত্য: লাল পোড়ামাটির ইটের বর্গাকার এককক্ষ মসজিদ — দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ২১ ফুট ৬ ইঞ্চি, পূর্বদিকে সরু বারান্দা; প্রধান কক্ষের ওপর একটি বড় গম্বুজ ও বারান্দার ওপরে ছোট গম্বুজসহ মোট চারটি গম্বুজ (বাংলা উইকিপিডিয়া); চার কোণায় ও বারান্দায় মিলিয়ে ছয়টি অষ্টভুজ বুরুজ; দেয়াল প্রায় পাঁচ ফুট পুরু (পশ্চিম দেয়াল আরও বেশি — ভ্রমণগাইড); মোট ১৫টি দরজা-জানালা, পূর্ব সদরে খিলানশোভিত তিনটি প্রবেশপথ; দেয়ালের প্যানেলে ডালিম গাছের রিলিফসহ টেরাকোটা-ধাঁচের অলংকরণ (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। ধারণক্ষমতা মাত্র ~১০০ মুসল্লি — এটি জামে মসজিদের জৌলুস নয়, সুলতানি যুগের মিতব্যয়ী কারুকাজ। পেছনে/দক্ষিণে বিশাল একটি দিঘি; টিলাটির কারণে স্থানীয় আরেক নাম ‘লাল টিলা মসজিদ’ (ভ্রমণগাইড)।
  • বর্তমান অবস্থা: মসজিদটি সক্রিয় — নিয়মিত নামাজ হয়; প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সবুজে ঢাকা, খেজুরগাছের সারি ঘিরে আছে চত্বরকে (প্রথম আলো)। অনেক পুরাকীর্তির তুলনায় অবস্থা ভালো হলেও, সুলতানি ঐতিহ্যের এই নিদর্শনটির জরুরি সংস্কার প্রয়োজন বলে ২০২৫ সালের এক পাঠক-চিঠিতে উদ্বেগ জানানো হয়েছে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস) — ঘুরতে গেলে সৌন্দর্যের সঙ্গে সেই প্রয়োজনটাও চোখে পড়বে।

শহরে আরও কিছুক্ষণ

  • খোয়াই নদীর পাড়: সন্ধ্যায় শহরের মানুষের হাঁটার ঠিকানা; নদীটা শহরের জন্মদাতা বাজারের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
  • সার্কিট হাউস ও পুরনো শহর: ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া (উইকিভ্রমণ তালিকা); কাছাকাছি মশাজানের দিঘিও সদরের পুরনো জলাশয়গুলোর একটি।
  • শহরটি ঘাঁটি হিসেবে ভালো: এখান থেকে বানিয়াচং, সাতছড়ি-রেমা-কালেঙ্গা আর তেলিয়াপাড়া — সবই দিনের ট্রিপে ধরা যায়।

যাওয়া ও টিপস

  • হবিগঞ্জ পৌঁছানো: ঢাকা থেকে বাসে শায়েস্তাগঞ্জ/হবিগঞ্জ; সিলেট থেকে ‘হবিগঞ্জ বিরতিহীন’ বাসে ~২–২.৫ ঘণ্টা (উইকিভ্রমণ — ভাড়ার অঙ্ক সময়ের সঙ্গে বদলায়, যাত্রার আগে যাচাই করুন)। ট্রেনে শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশন নেমে বাস/সিএনজিতে শহর।
  • মসজিদে: শহর থেকে বাস/সিএনজিতে উচাইল বাজার; শেষ অংশে স্থানীয়দের দিকনির্দেশনা নিন — সাইনবোর্ডের অভাবে অনেকেই প্রথমবার পথ হাতড়ান (ভ্রমণ-ব্লগ)। এটি চালু মসজিদ — নামাজের সময় ছাড়া ভেতরে ঢুকুন, পোশাক ও ভঙ্গিতে ইবাদতস্থলের শিষ্টাচার মেনে চলুন।
  • সেরা সময়: সকালের আলোয় লাল ইট সবচেয়ে জীবন্ত; শুক্রবার জুমার ভিড় এড়িয়ে অন্য দিন যাওয়া ভালো, যদি উদ্দেশ্য স্থাপত্য দেখা হয়।

অর্ধদিনের নমুনা সূচি

  • সকাল ৯টা: উচাইল শংকরপাশা শাহী মসজিদ — স্থাপত্য, মাজার ও দিঘি।
  • দুপুর: শহরে ফিরে হাওরের মাছের হোটেল-খাবার।
  • বিকেল: খোয়াইয়ের পাড়ে সূর্যাস্ত; হাতে সময় থাকলে মশাজানের দিঘি।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

মসজিদটিকে ‘গায়েবী’ বলা হয় কেন?

দীর্ঘদিন জনমানবহীন জঙ্গলে ঢাকা থাকার পর জমি আবাদের সময় এটি আবার আবিষ্কৃত হয় — সেই ‘হঠাৎ ফিরে পাওয়া’ থেকেই স্থানীয় নাম গায়েবী মসজিদ (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণ-ব্লগ)।

উচাইল শাহী মসজিদ আর শংকরপাশা শাহী মসজিদ কি একই?

হ্যাঁ — একই মসজিদের দুই নাম; পূর্ণ নাম উচাইল শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদ।

মসজিদে নামাজ হয় কি এখনো?

হ্যাঁ — এটি সক্রিয় মসজিদ (উইকিপিডিয়া)। তাই ভ্রমণের আচরণও সেই অনুযায়ী রাখুন।

শেষকথা

বানিয়াচংয়ের রাজারা গেলেও তাঁদের গ্রাম টিকে আছে; সুলতানরা গেছেন, রয়ে গেছে এই লাল টিলার মসজিদ। পরের পোস্টে চুনারুঘাটের মুড়ারবন্দ — সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের মাজারের গল্প, যাঁর বংশধারার সঙ্গেই হবিগঞ্জ নামটাও জড়িয়ে।