• 29 Oct, 2026

হামহাম জলপ্রপাত ট্রেকিং গাইড: চিতা ঝর্ণার খোঁজে রাজকান্দির গভীর বনে

হামহাম জলপ্রপাত ট্রেকিং গাইড: চিতা ঝর্ণার খোঁজে রাজকান্দির গভীর বনে

কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনে হামহাম (স্থানীয় নাম চিতা ঝর্ণা) — ২০১০ সালের শেষে গাইড শ্যামল দেববর্মার দলের ‘আবিষ্কার’, উচ্চতা অনাপত্তি ১৩৫–১৭০ ফুটের বিতর্ক, কলাবনপাড়া ও চম্পারায় হয়ে ২.৫–৪ ঘণ্টার ট্রেক, বর্ষার ঝুঁকি ও প্রস্তুতির যাচাইকৃত সম্পূর্ণ গাইড।

লাওয়াছড়ার সাজানো ট্রেইল যাঁদের কাছে খুব সহজ মনে হয়, কমলগঞ্জেরই আরেক প্রান্তে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে আসল পরীক্ষা — হামহাম জলপ্রপাত। কোনো সাইনবোর্ডওয়ালা গেট নেই, টিকিটঘর নেই; আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝিরি, কাদা আর টিলা পেরোনোর পর গভীর বনের বুকে হঠাৎ দেখা পাওয়া এক প্রশস্ত পর্দার মতো ঝরনা।

পরিচয়: ২০১০ সালে ‘আবিষ্কৃত’ ঝর্ণা

  • অবস্থান: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে, কুরমা বন বিট এলাকায় (বাংলা উইকিপিডিয়া/জেলা প্রশাসনের পর্যটন পাতা)।
  • আবিষ্কারের গল্প: স্থানীয়রা ঝর্ণাটিকে চিনত প্রজন্ম ধরে, তবে বাইরের জগতের কাছে এটি আসে ২০১০ সালের শেষাংশে — পর্যটন গাইড শ্যামল দেববর্মার সঙ্গে দুর্গম জঙ্গলে ঘুরতে যাওয়া একদল পর্যটকের হাত ধরে (জেলা প্রশাসন/ইউএনবি)। কোনো কোনো বর্ণনায় সালটি ২০০৯-ও এসেছে।
  • দুটি নাম: স্থানীয়দের কাছে এটি চিতা ঝর্ণা — এই বনে একসময় চিতাবাঘ দেখা যেত বলে। ‘হামহাম’ নামের ব্যাখ্যা দুই রকম: কেউ বলেন আরবি ‘হাম্মাম’ (গোসলখানা) থেকে, কেউ বলেন সিলেটি ভাষায় পানির তীব্র শব্দ বোঝানো ‘আ-ম আ-ম’ ধ্বনি থেকে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
  • উচ্চতার বিতর্ক — সত্যটা যা: হামহামের উচ্চতা কখনোই সরকারিভাবে মাপা হয়নি। অনুমান ১৩৫ ফুট থেকে ১৪৭, এমনকি ১৭০ ফুট পর্যন্ত পাওয়া যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। তুলনায় সরকারিভাবে স্বীকৃত দেশের সর্বোচ্চ মাধবকুণ্ডের মাপ ১৬২ ফুট (১৯৯৯ সালের হিসাব) — তাই ‘হামহামই সবচেয়ে উঁচু’ দাবিটি প্রমাণিত নয়। তবে গবেষকদের মতে এর ব্যাপ্তি (প্রস্থ ও বিস্তার) মাধবকুণ্ডের প্রায় তিনগুণ — দুই ধাপে নামা প্রশস্ত জলধারাই এর আসল জাদু।

ট্রেক: পথটাই অর্ধেক অভিজ্ঞতা

  • রুট: শ্রীমঙ্গল থেকে কমলগঞ্জ/ভানুগাছ হয়ে গাড়ি চলে চম্পারায় চা বাগান (কুরমা বিট) কিংবা ত্রিপুরা গ্রাম কলাবনপাড়া পর্যন্ত — কলাবনপাড়াই এখন জনপ্রিয় ট্রেইলহেড। জেলা প্রশাসনের বর্ণনা অনুযায়ী চম্পারায় থেকে ঝর্ণা ~৭ কিলোমিটার; পথে পড়ে অত্যন্ত খাড়া মোকাম টিলা, একের পর এক ঝিরি ও ছড়ার কাদাজল।
  • সময়: একপথে হাঁটা ~২.৫–৪ ঘণ্টা (রুট, ঋতু ও ফিটনেসভেদে; কোনো কোনো ট্যুরে মাধবপুর দিক থেকে ৪–৫ ঘণ্টার বিবরণও আছে — এক্সপিডিয়া ট্যুর-বিবরণ)। অর্থাৎ যাওয়া-আসা মিলিয়ে পুরো একদিনের অভিযান; ভোরে রওনা না দিলে বনে সন্ধ্যা নেমে আসার ঝুঁকি থাকে।
  • পথে যা যা: সারি সারি কলাগাছ, জারুল, চিকরাশি ও কদমের বন; বেতবাগান ও ডুমুরের ডালে চশমাপড়া হনুমানের দল; দোলু, মুলি, মিতিঙ্গা ও কালি বাঁশের ঝাড়; রংবেরঙের প্রজাপতি (উইকিভ্রমণ)। হাঁটতে হয় কখনো গোড়ালি-পানি, কখনো ঊরু-পানি ছড়া পেরিয়ে — পায়ের জুতা ভিজবেই, সেটা ধরেই নিন।
  • গাইড: সরকারি কোনো অবকাঠামো এখানে গড়ে ওঠেনি (উইকিপিডিয়া) — স্থানীয় গাইড ছাড়া যাওয়া কার্যত অসম্ভব ও বিপজ্জনক। কলাবনপাড়া/চম্পারায় থেকে গাইড নিন; ফি দরদামে ঠিক হয়, যাওয়ার আগে চুক্তি পরিষ্কার করুন।

ঝুঁকি: যেগুলো লুকানো যাবে না

  • খাড়া ও পিচ্ছিল ঢাল: বর্ষায় টিলার পথ কাদায় পরিণত হয়; কয়েকটি অংশে পিছলে পড়লে গুরুতর আঘাতের আশঙ্কা সত্যিকারের (ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ভ্রমণ-সতর্কতা)।
  • হঠাৎ বন্যা: ভারী বৃষ্টিতে ছড়াগুলোর পানি হঠাৎ বেড়ে যায় — বৃষ্টির মধ্যে বা পরপরই ট্রেক শুরু করবেন না; গাইডের আবহাওয়া-বিচারই চূড়ান্ত কথা।
  • জোঁক: বর্ষায় রাজকান্দির জোঁক কুখ্যাত — লম্বা মোজা, লবণ ও বদ্ধ জুতা অপরিহার্য।
  • অন্যান্য: পথের অনেক অংশে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই; পানি ও খাবারের কোনো দোকান নেই — সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি, শুকনো খাবার ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম নিন; সন্ধ্যার আগেই ফেরার হিসাব মাথায় রাখুন; প্লাস্টিক ফেলে আসবেন না।

কখন যাবেন

  • বর্ষা (জুন–সেপ্টেম্বর): ঝর্ণা পূর্ণ যৌবনে — তবে ট্রেক সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
  • বর্ষার পর (অক্টোবর–নভেম্বর): পানি ভালোই থাকে, পথ তুলনামূলক কম পিচ্ছিল — অনেকের কাছে সেরা ভারসাম্য (ভ্রমণগাইড)।
  • শীত: পথ সহজ, কিন্তু ঝর্ণা ক্ষীণ — দুটোর একটা বেছে নিতেই হবে।

যাওয়া ও প্রস্তুতি

  • যাওয়া: শ্রীমঙ্গল/ভানুগাছ থেকে সিএনজি বা জিপে কলাবনপাড়া/চম্পারায়; সেখান থেকে গাইডসহ হাঁটা। আগের রাতে শ্রীমঙ্গলে থেকে ভোরে রওনা দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
  • প্রস্তুতি: গ্রিপওয়ালা ট্রেকিং জুতা বা গামবুট, হালকা ব্যাকপ্যাক, অতিরিক্ত পোশাক (ফেরার পর বদলাতে), রেইনকোট (বর্ষায়), পানির বোতল, লবণ, টর্চ — আর সবচেয়ে জরুরি, নিজের সামর্থ্যের সৎ মূল্যায়ন: শিশু, বয়স্ক ও হাঁটু-সমস্যায় ভোগা কারো জন্য এই ট্রেক নয়।

পুরো দিনের নমুনা সূচি

  • ভোর ৬টা: শ্রীমঙ্গল থেকে রওনা; কলাবনপাড়ায় গাইড নিয়ে ট্রেক শুরু।
  • সকাল ১০টা–১১টা: হামহামে পৌঁছে জিরোনো, ছবি, ঝর্ণার তলার পুকুরে সাবধানে পা ভেজানো (স্রোতের শক্তি বুঝে)।
  • দুপুর ১২টা: ফেরার ট্রেক; বিকেল ৪টার মধ্যে ট্রেইলহেডে; সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

হামহাম কি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ঝর্ণা?

অনিশ্চিত — এর উচ্চতা আনুষ্ঠানিকভাবে মাপা হয়নি; অনুমানের পরিসর (১৩৫–১৭০ ফুট) মাধবকুণ্ডের সরকারি মাপকে (১৬২ ফুট) ছাড়িয়েও যায়, নিচেও থাকে। নিশ্চিত বিষয়টি হলো এর অসাধারণ প্রস্থ।

গাইড ছাড়া যাওয়া যায় কি?

কার্যত না — চিহ্নহীন জঙ্গলপথ, একাধিক ছড়া ও খাড়া টিলা; স্থানীয় গাইডই নিরাপত্তার প্রধান শর্ত।

শীতকালে গেলে কেমন হবে?

ট্রেক সহজ হবে, কিন্তু পানি কমে ঝর্ণা শীর্ণ হয়ে যায় — সৌন্দর্যের জন্য বর্ষা/শরৎই ভালো।

শেষকথা

হামহাম সেই বিরল গন্তব্য, যেখানে পৌঁছানোটাই পুরস্কারের অর্ধেক। শ্রীমঙ্গলে রাত কাটিয়ে ভোরে বেরিয়ে পড়ুন। পরের পোস্টে একদম অন্যরকম সহজ সৌন্দর্য — মাধবপুর লেক ও তার চা বাগান।