জয়পুরহাটের সবচেয়ে প্রিয় ঠিকানা শহর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, ছোট যমুনা নদীর তীরে বেলআমলা গ্রামের বারো শিবালয় — একটি বড় মন্দিরকে ঘিরে এগারোটি ছোট শিব মন্দিরের সবুজ, নির্জন চত্বর। এই পোস্টে মন্দিরগুলোর গল্প বলা হলো সৎভাবে: কারণ এদের বয়স নিয়ে তিনটি আলাদা দাবি প্রচলিত, আর কোনোটিই পাথরে লেখা নয়।
বারোটি মন্দিরের চত্বর
কেন্দ্রে ইটের তৈরি বড় শিবালয়, চারপাশে ১১টি ছোট একই ধাঁচের মন্দির — মোট বারোটি (ডেইলি স্টার, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বরাতে)। দেয়ালে টেরাকোটা ফলকের অলংকরণ; ভেতরে গণেশের চিত্র, রাম-লক্ষ্মণ-সীতা, হনুমান ও কালীর প্রতিমা-চিত্র, আর আঙিনার মাঝখানে নন্দী মূর্তি (ভ্রমণগাইড)। মন্দির এলাকা থেকে সংগৃহীত চণ্ডী, সূর্য ও বাসুদেব মূর্তি দেখে ধারণা করা হয়, এককালে এখানে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও তীর্থ ছিল (বাংলা উইকিপিডিয়া) — অর্থাৎ জায়গাটির ধর্মীয় ইতিহাস শৈব পর্বের চেয়েও পুরনো হতে পারে। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট যমুনা চত্বরটিকে দিয়েছে আলাদা শান্তি।
বয়স নিয়ে তিন দাবি: সপ্তম শতক, সেন যুগ, নাকি ১৭০০?
লিপিবদ্ধ ইতিহাস পাওয়া যায়নি (বাংলা উইকিপিডিয়া) — তার বদলে তিনটি বর্ণনা ঘোরে। প্রথম, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে মন্দিরগুলো সপ্তম শতকের (৭০০–৮০০ খ্রিস্টাব্দ) শিবভক্তদের তৈরি (ডেইলি স্টার, ২০০৮)। দ্বিতীয়, স্থাপত্যশৈলী দেখে অনুমান করা হয় এটি সেন যুগের কাজ, এবং শিব-উপাসক রাজা বল্লাল সেনকেই প্রতিষ্ঠাতা মনে করা হয় (ভ্রমণগাইড/বাংলা উইকিপিডিয়া)। তৃতীয়, অন্য এক বর্ণনায় ধনাঢ্য কায়স্থ রাজীব লোচন মণ্ডল ১৭০০ সালে মন্দিরটি নির্মাণ করেন; তাঁর বংশধররাই পরে এখানকার বড় জমিদার হন, যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে নিলামে ওঠে ধ্বংস হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কোন দাবিটি ঠিক, তা নিশ্চিত করার মতো শিলালিপি বা দলিল আজও মেলেনি — ভ্রমণকারী হিসেবে তিনটিই জেনে যাওয়া ভালো। তুলনায় কাছের পাহাড়পুরের তারিখ পাথরের সিলে লেখা — বারো শিবালয়ের রহস্য সেখানেই আলাদা।
শিবরাত্রির মেলা ও যত্নের ঘাটতি
প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের শিব চতুর্দশীতে এখানে দুদিনব্যাপী শিবরাত্রি পূজা ও ঐতিহ্যবাহী মেলা বসে (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণগাইড/ডেইলি স্টার) — ভক্তরা ছোট যমুনায় স্নান করে শিবের মাথায় দুধ-পানি ঢালেন; মেলায় শাঁখা-সিঁদুর, পুতুল, খেলনা ও ঘর-সাজানোর জিনিস বিক্রি হয়। সৎ নোট দুটি: ডেইলি স্টার ২০০৮ সালেই লিখেছিল, মাটির লবণাক্ততা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে টেরাকোটা ফলক ক্ষয়ে যাচ্ছে, কোনো সংস্কার হয়নি, এমনকি মন্দিরে অবিবেচকভাবে সাদা রং করা হয়েছিল; আর ২০১৭ সালের দিকে একবার মন্দিরের প্রাচীন মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে (আরটিভি) — যার তদন্ত হয়। মন্দির আজও সক্রিয় পূজার জায়গা; দর্শনার্থীরা পোশাক ও আচরণে সেই মর্যাদা রাখবেন।
জয়পুরহাট শহর: ছোট্ট জেলার প্রাণকেন্দ্র
জেলাশহর জয়পুরহাট ছোট যমুনার অববাহিকার কৃষি-বাণিজ্যের শহর — লকমা-আছরাঙ্গা থেকে পাহাড়পুর-মহাস্থানগড় পর্যন্ত পুরো বরেন্দ্র-সার্কিটের স্বাভাবিক ঘাঁটি। শহর থেকে বারো শিবালয় যাওয়া সবচেয়ে সহজ — সদর থেকে গদন শহর স্টপেজ হয়ে ভ্যান/রিকশায় মাত্র ১৫–২০ মিনিট (ভ্রমণগাইড/এলআরবি ট্রাভেল)। শিবরাত্রির সময় গেলে মেলার ভিড় মাথায় রেখে সকালে যান; অন্য সময় গেলে বিকেলের আলোয় টেরাকোটা সবচেয়ে সুন্দর দেখায়।
ভ্রমণ তথ্য
ঢাকা থেকে বাস/ট্রেনে জয়পুরহাট; শহরে রাত কাটিয়ে সকালে বারো শিবালয়, তারপর আছরাঙ্গা দীঘি (ক্ষেতলাল) বা লকমা (পাঁচবিবি) — জেলার তিন ঠিকানা একদিনে সম্ভব। মন্দির প্রাঙ্গণে পূজার সময় ভিড় থাকে; ছবি তোলার আগে পূজারীদের অসুবিধা হচ্ছে কি না খেয়াল করুন। এই পোস্টের সঙ্গে জয়পুরহাট জেলা সম্পূর্ণ (২/২) — আর তার সঙ্গে রাজশাহী বিভাগের পুরো সিরিজটাই শেষ হলো।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বারো শিবালয়ে মন্দির কয়টি?
একটি বড় শিবালয় ও চারপাশে এগারোটি ছোট — মোট বারোটি (ডেইলি স্টার)।
মন্দিরগুলো কে গড়েন?
নিশ্চিত জানা যায়নি — বল্লাল সেন, সপ্তম শতকের শিবভক্ত ও রাজীব লোচন মণ্ডল (১৭০০), তিনটি দাবিই প্রচলিত (বাংলা উইকিপিডিয়া/ডেইলি স্টার)।
শিবরাত্রির মেলা কখন?
ফাল্গুনের শিব চতুর্দশীতে, দুদিনব্যাপী (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
শহর থেকে কত দূর?
প্রায় ৪ কিলোমিটার, ছোট যমুনার তীরে বেলআমলা গ্রামে (ভ্রমণগাইড)।
মন্দিরের অবস্থা কেমন?
লবণাক্ততায় টেরাকোটা ক্ষয় হচ্ছে বলে ২০০৮ সালেই ডেইলি স্টার জানিয়েছিল; সংস্কারের হালের খবর এই লেখায় যাচাই করা হয়নি।
শেষকথা
নিশ্চিত তারিখ নেই বলেই বারো শিবালয় যেন আরও মানবিক — সাতশো বছরের হোক বা তিনশো বছরের, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে শিবরাত্রিতে নদীতে স্নান করে মন্দিরে উঠেছে। জয়পুরহাট ভ্রমণ শুরু হোক এই চত্বর থেকেই।