• 29 Oct, 2026

শিমুল বাগান: ফেব্রুয়ারিতে মানিগাঁওয়ে লালের মেলা

শিমুল বাগান: ফেব্রুয়ারিতে মানিগাঁওয়ে লালের মেলা

তাহিরপুরের মানিগাঁওয়ে জয়নাল আবেদীনের শিমুল বাগান — ~১০০ বিঘায় ~৩,০০০ গাছ (২০০২–০৩), মাঝ-ফেব্রুয়ারিতে একসাথে ~২,০০০ গাছে লাল ফুল; দেশের বৃহত্তম শিমুল বাগান; প্রবেশ ৫০ টাকা, সেরা সময়, ভিড়ের বাস্তবতা ও রুট-খরচসহ যাচাইকৃত গাইড।

বছরে মাত্র কয়েক সপ্তাহ — ফেব্রুয়ারির আকাশ নীল, আর তাহিরপুরের মানিগাঁও গ্রামের মাটি-আকাশ দুটোই লাল। জাদুকাটা নদীর তীরে, ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়ের সামনে, সারিবদ্ধ প্রায় তিন হাজার শিমুল গাছে একসঙ্গে ফোটে আগুন-লাল ফুল। নাম তার শিমুল বাগান — দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগান হিসেবে পরিচিত (ইউএনবি/দুর্বা)। কিন্তু সতর্ক ঘণ্টা আগেই বাজিয়ে রাখি: এই পোস্টের ছবিটার মতো লাল দৃশ্য পাবেন শুধু বসন্তের নির্দিষ্ট কয়েক সপ্তাহেই; বছরের বাকি সময় এটি একটি সাজানো সবুজ বাগান — সুন্দর, কিন্তু লাল নয়।

এক মানুষের বাগান

  • প্রতিষ্ঠাতা: বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবসায়ী, বৃক্ষপ্রেমী জয়নাল আবেদীন (বাসস)। নদীতীরের যে জমিতে ফসল তেমন হতো না, সেখানেই তিনি শখের বশে গাছ লাগাতে শুরু করেন।
  • সময় ও আকার:২০০২–০৩ সালের দিকে প্রায় ১০০ বিঘা (বাসসের হিসেবে ~৩০ একর) জমিতে ~৩,০০০ শিমুল চারা রোপণ — প্রতিটি গাছ নিখুঁত সারিতে, গাছে-গাছে দূরত্ব প্রায় সমান (আউটডোর্স বিডি)। স্থানীয় সূত্রগুলো বাগানটিকে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শিমুল বাগান বলে বর্ণনা করে (ইউএনবি)।
  • বর্তমান: জয়নাল আবেদীন আজ বেঁচে নেই; তার উত্তরসূরীরা বাগানটির নাম দিয়েছেন ‘জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান’। ভেতরে ক্যান্টিন ও বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে, উপজেলা প্রশাসনের একটি গেস্টহাউসও তৈরি হয়েছে; পিক দিনগুলোতে বাগানে পুলিশের টহল থাকে (বাসস)।

কখন যাবেন — ক্যালেন্ডার হাতে করে

  • ফুল ফোটে: ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে ধীরে ধীরে; শীর্ষ সময় মাঝ-ফেব্রুয়ারি (১৫–২৫ ফেব্রুয়ারি) — এই সময়ে ~২,০০০ গাছ একসঙ্গে ফুলে ঢেকে যায় (টাঙ্গুয়ার হাওর ডট কম)। মাসজুড়ে ফুল থাকে কমবেশি, তারপর ঝরে গিয়ে গজায় নতুন পাতা (বাসস)।
  • মার্চের প্রথম সপ্তাহের পর গেলে লাল পাবেন ছিটেফোঁটা — অনেকেই ‘শুকনো বাগান’ দেখে হতাশ হন; ফাল্গুন-চৈত্রই (ফেব্রুয়ারি–মার্চ) শিমুলের ঋতু (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
  • দিনের সেরা সময়: ভোর ৬–৯টা — আলো নরম, ফুল সবচেয়ে টাটকা দেখায়, ভিড় কম। প্রথম ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসে (দুটো একই তারিখে পড়লে) ভিড় উৎসবের রূপ নেয় (ইউএনবি) — ভিড় এড়াতে সপ্তাহের মাঝামাঝি দিন বেছে নিন।
  • ভিড়ের বাস্তবতা: পিক মৌসুমে ঘাটে লম্বা লাইন, সরু রাস্তায় যানজট ও অতিরিক্ত ভিড়ের অভিযোগ এসেছে (ইউএনবি) — ধৈর্য আর সময় হাতে রেখে আসুন।

বাগানে কী করবেন

মাটিতে ঝরে পড়া ফুলের লাল গালিচায় হাঁটা, গাছের সারির ফাঁকে ছবি তোলা, ঘোড়ায় চড়ে বাগান ঘোরা (ইউএনবি), নদীর পাড়ে বসে ওপারের পাহাড় দেখা — এই সফর মূলত ‘ধীরে উপভোগের’। বাগানের পাশে একটি লেবু বাগানও আছে। ফুল ছিঁড়বেন না, ডাল ভাঙবেন না — বাগানটি একটি পরিবারের দুই দশকের যত্নের ফসল।

ঝুঁকি: নদীভাঙনের হুমকি

বাগানটি জাদুকাটার পাড়ে — আর আগের পোস্টে বলা বালু-উত্তোলনের সংকট এখানেও ছায়া ফেলেছে: বিডিনিউজের বিশ্লেষণে শিমুল বাগানকে ভাঙনের হুমকিতে থাকা সম্পদের তালিকায় রাখা হয়েছে। এই লাল রাজ্য কত দিন থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে নদীটা বাঁচে কিনা তার ওপর।

যাওয়া, টিকিট, খরচ

  • প্রবেশ ফি: জনপ্রতি ৫০ টাকা (ভ্রমণগাইড; বাগান-কর্তৃপক্ষ সংগ্রহ করে)।
  • রুট: সুনামগঞ্জ শহর থেকে সারাদিনের বাইক রিজার্ভ ১,০০০–১,৫০০ টাকা (দুজন চড়া যায়) — এতে বাগানসহ আশেপাশের স্পটগুলো একসঙ্গে ঘোরা যায় (ভ্রমণগাইড)। সিএনজি রিজার্ভ ~১,৭০০–২,২০০ টাকা। বাজেট রুট: বাইকে লাউড়ের গড় (~১৫০–২০০ টাকা) → খেয়ায় জাদুকাটা পার (৫ টাকা) → হেঁটে বা ছোট ভাড়ায় বাগান (আদার ব্যাপারী/এভেন্ডো)।
  • বর্ষার বিকল্প: টাঙ্গুয়ার হাওর সফরের নৌপথেও বাগানের পাশ দিয়ে যাওয়া যায় — যদিও বর্ষায় ফুল থাকে না, তখন এটি সবুজ বাগান-দর্শন। শুকনো মৌসুমে ফেব্রুয়ারির সফরটি মূলত স্থলপথের।
  • খাওয়া-থাকা: বাগানের ভেতরে ক্যান্টিন; রাতে থাকার জন্য সুনামগঞ্জ শহর বা প্রশাসনের গেস্টহাউস (বাদাঘাট) — বেশিরভাগ দর্শনার্থী দিনে দিনে শহরে ফিরে যান।

একদিনের নমুনা সূচি (সুনামগঞ্জ থেকে)

  • সকাল ৬টা: বাইক রিজার্ভে রওনা — লাউড়ের গড়, খেয়া পেরিয়ে সকাল ৮টার আগেই বাগানে।
  • সকাল: লাল বাগানে ২–৩ ঘণ্টা; ঘোড়া-রাইড, নদীতীরে চা।
  • দুপুর-বিকেল: বারেক টিলার ভিউ পয়েন্ট হয়ে টেকেরঘাট ও নীলাদ্রি লেক — সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জ।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ফুল না ফুটলে বাগানে যাওয়া কি বৃথা?

একেবারে নয় — সারিবদ্ধ সবুজ বাগানটাও দেখার মতো, তবে ‘লাল বাগান’ দেখতেই হলে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিই একমাত্র সময়। যাওয়ার আগে স্থানীয়/সোশ্যাল পেজে ফোটার খবর যাচাই করুন — প্রতিবছর ফোটার সময় আবহাওয়ায় কদিন এগোপিছু হয়।

শিশুদের নিয়ে যাওয়া যায়?

যায় — তবে পিক দিনে ভিড় ও নদীপারের ঝুঁকি মাথায় রেখে; খেয়া পারাপারে সাবধান।

একদিনে টাঙ্গুয়ারও দেখা যাবে?

ফেব্রুয়ারিতে হাওরে পানি কম — টাঙ্গুয়ার তখন পাখি-সফরের; একই ট্রিপে দুটো রাখলে সময় ভাগ করে নিন: সকালে বাগান, পরে হাওরের পাখিবিন্দুগুলো।

শেষকথা

একজন মানুষ শখ করে গাছ লাগিয়েছিলেন — দুই দশকে তা হয়ে উঠল জাতীয় ঋতু-উৎসবের ঠিকানা। ফেব্রুয়ারি এলে মানিগাঁওয়ের টিকিট কেটে ফেলুন; সার্কিটের তৃতীয় রত্ন নীলাদ্রি লেক ডাকছে। পরের পোস্টে হাসন রাজার সুনামগঞ্জ।