নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায়, ভারত সীমান্তের কোলঘেঁষে, শালবনের ঘন ছায়ায় লুকিয়ে আছে প্রায় সাড়ে চার ডজন একরের এক প্রাচীন জলাশয় — আলতাদীঘি। একে ঘিরেই ২৬৪.১২ হেক্টর বনভূমি নিয়ে গড়া আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান। তবে এই গাইড শুধু সৌন্দর্যের কথা বলবে না — সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উদ্যান নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটাও সমান গুরুত্বে থাকবে, কারণ ভ্রমণকারীর চোখে আজকের আলতাদীঘি বুঝতে হলে দুটোই জানা দরকার। পাহাড়পুরের সঙ্গে একই জেলায় থাকায় দুটো মিলে নওগাঁর প্রকৃতি-ইতিহাস যুগল ভ্রমণ হয়।
উদ্যান ও দীঘি
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে; পাশের আরও ১৭.৩৪ হেক্টর বনভূমি ২০১৬ সালের ৯ জুন পায় "বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা"-র মর্যাদা (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বনের ঠিক মাঝখানে প্রায় ৪৩ একর আয়তনের দীঘি — লম্বায় প্রায় ১.১ কিলোমিটার, উঁচু পাড়ের দক্ষিণ ধার শালবনে ঢাকা (উইকিভ্রমণ)। ধারণা করা হয়, এটি বাংলাদেশের প্রাচীন দীঘিগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ "সচল" দীঘিগুলোর একটি (উইকিভ্রমণ)। অবস্থান ধামইরহাট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তরে (টিবিএস)।
কত পুরনো এই দীঘি?
সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে দীঘিটির খননকাল নিশ্চিত নয়। ধারণা করা হয় এটি হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের — একই উপজেলার পাল-আমলের জগদ্দল মহাবিহারের সমসাময়িকও হতে পারে (উইকিভ্রমণ)। লোককাহিনীতে খননের কৃতিত্ব রাজা রামপালের আমলকে (১০৭৭–১১৩০) দেওয়া হয়, আবার রাজকন্যা "আলতা"-র নামে দীঘির নামকরণের গল্পও প্রচলিত (ডেইলি স্টার/লোকাল গাইডস) — এগুলো লোককথা হিসেবেই উপভোগ করা ভালো। নিশ্চিত কথা এটুকুই: জলাশয়টি বহু শতাব্দী ধরে এই বনের প্রাণ।
বনের জীবন
শাল ছাড়াও করই, গামারি, জলপাইসহ নানা প্রজাতির গাছের এই বনে পাওয়া যায় মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, শিয়াল, অজগর ও বানর; নানা প্রজাতির পাখির ডাকে ভোরে মুখরিত হয় বন (উইকিভ্রমণ)। সবচেয়ে অনন্য আকর্ষণ — শালগাছকে আলিঙ্গন করে গড়ে ওঠা উঁচু উইপোকার ঢিবি, যা এই বনের প্রতীক হয়ে উঠেছে (উইকিভ্রমণ)। শীতে একসময় পরিযায়ী পাখির ভিড় জমত — যদিও সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে তাদের সংখ্যা কমেছে বলে জানা যায় (লোকাল গাইডস)। দেশের অন্য শালবন-উদ্যান হিসেবে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সঙ্গে এর চরিত্রগত মিল আছে।
সতর্ক গল্প: "পুনরুদ্ধারের" নামে গাছ কাটা
এই পোস্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ এটাই। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের অর্থায়নে বন বিভাগের "আলতাদীঘি পুনঃখননের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ" প্রকল্পে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান নিয়ে কোনো প্রাক-সমীক্ষা ছাড়াই দীঘির পাড়ের এক হাজারের বেশি গাছ কেটে ফেলা হয় বলে কর্মকর্তাদের বরাতে পত্রিকা জানিয়েছে (ডেইলি স্টার)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাবরিনা নাজের মন্তব্য ছিল — "ইতিহাসের সাক্ষী ছিল আলতাদীঘি, যা এখন আর নেই" (ডেইলি স্টার)। টিবিএস-এর প্রতিবেদনেও "উন্নয়নের দোহাইয়ে নির্বিচারে গাছ কাটা"-র অভিযোগ উঠেছে; বন বিভাগের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে পুনরুদ্ধার ও পর্যটন-সুবিধা বাড়ানোর। অর্থাৎ আজ গিয়ে যে দীঘিপাড় দেখবেন, তা কয়েক বছর আগের ছায়াঘেরা পাড়ের চেয়ে অনেকটাই খোলা — এই বাস্তবতা জেনে যাওয়াই সৎ ভ্রমণ।
ভ্রমণ তথ্য
নওগাঁ শহর থেকে ধামইরহাট পর্যন্ত বাসে এসে সেখান থেকে স্থানীয় যানে উদ্যানে পৌঁছানো যায়। সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকা বলে স্থানীয় নিয়ম ও বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলুন; বনে প্লাস্টিক ফেলবেন না, বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। পাখির জন্য শীতকাল, সবুজের জন্য বর্ষা-পরবর্তী সময় ভালো। টিকিট ও সময়সূচি স্থানভেদে বদলায় — গেটে যাচাই করে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান কবে ঘোষিত হয়?
২০১১ সালে; ২০১৬ সালে পাশের ১৭.৩৪ হেক্টর বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
দীঘিটির আয়তন কত?
প্রায় ৪৩ একর, লম্বায় প্রায় ১.১ কিলোমিটার (উইকিভ্রমণ)।
বনে কী প্রাণী পাওয়া যায়?
মেছোবাঘ, গন্ধগোকুল, শিয়াল, অজগর, বানর ও নানা পাখি (উইকিভ্রমণ)।
গাছ কাটার ঘটনাটা কী?
পুনর্খনন প্রকল্পে সমীক্ষা ছাড়া ১,০০০+ গাছ কাটার কথা পত্রিকায় এসেছে (ডেইলি স্টার/টিবিএস)।
ধামইরহাট থেকে কত দূর?
প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তরে, সীমান্তের কাছে (টিবিএস)।
শেষকথা
আলতাদীঘি আজ এক জটিল জায়গা — প্রাচীন দীঘি আর শালবনের সৌন্দর্য এখনো আছে, কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অব্যবস্থাপনার ছাপও। হয়তো এটাই এখানে আসার সেরা কারণ: প্রকৃতি সংরক্ষণ মানে কী, আর নামে-কাজে ফারাক কোথায় — আলতাদীঘি তার জীবন্ত পাঠ।