ঢাকা থেকে মাত্র ঘণ্টাখানেকের পথে যে ঘন সবুজ শালবনটা রাজধানীবাসীর সাপ্তাহিক ছুটির প্রিয় ঠিকানা, সেটি গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান — দেশের সবচেয়ে সহজে পৌঁছানো জাতীয় উদ্যানগুলোর একটি। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ঠিক পাশে বলেই পিকনিক দল, পরিবার আর প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড় এখানে সারা বছর। শহরের ভেতরের রমনা পার্ক যদি হয় ঢাকার ফুসফুস, ভাওয়াল তাহলে তার বিস্তৃত বন্য সংস্করণ।
ভাওয়াল রাজার বন থেকে জাতীয় উদ্যান
এই বন একসময় ছিল ঐতিহাসিক মধুপুর গড়ের অংশ — ভাওয়াল এস্টেটের (জমিদার পরিবারের) শাল ও গজারি গাছের প্রাকৃতিক বনভূমি (এরমাকভাগুস)। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। স্বাধীনতার পর সংরক্ষণের তাগিদে ১৯৭৪ সালে এলাকাটিকে সংরক্ষিত ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১৯৮২ সালে বন্যপ্রাণী আইনের অধীনে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান ঘোষিত হয় (ট্রাভেল.কম/ইভেন্ডো/এরমাকভাগুস)। আজকের উদ্যানের মোট আয়তন ৫,০২২ হেক্টর, যার মধ্যে প্রায় ৯৪০ হেক্টর ঘন কোর জোন; বাকিটা বাফার এলাকার বন, পুকুর-লেক আর খোলা পরিসর (এরমাকভাগুস)। এখানকার বৈশিষ্ট্য কপিস (কাটা গুঁড়ি থেকে পুনরুৎপন্ন) শালবন-বাস্তুতন্ত্র; উদ্ভিদ প্রজাতি তিন শতাধিক (ট্রাভেল.কম)। তবে সতর্ক থাকা ভালো: অবৈধ দখল ও গাছ কাটার চাপে মূল বনের অনেকখানি হারিয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে আসে — উদ্যানটি তাই আনন্দের পাশাপাশি সংরক্ষণের গুরুত্বটাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।
কী দেখবেন, কী করবেন
প্রধান টেরাকোটা-খচিত গেট (৩ নম্বর গেট) দিয়ে ঢুকলেই ছড়িয়ে আছে পিকনিক স্পট, শিশু পার্ক, মিনি চিড়িয়াখানা, ওয়াচ টাওয়ার আর পদ্ম পুকুরসহ একাধিক কৃত্রিম লেক (গুফলাই২৪)। বনের পথে হাঁটলে চোখে পড়তে পারে হরিণ, বানর আর নানা প্রজাতির পাখি — ভোরবেলা ও পড়ন্ত বিকেলে পশুপাখির আনাগোনা সবচেয়ে বেশি; বন বিভাগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ময়ূর ও হরিণ পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে (এরমাকভাগুস)। পুরো ৫,০২২ হেক্টর একদিনে ঘোরা সম্ভব নয় — মূল আকর্ষণ এলাকাটুকুই আরামে দেখুন। সিলেটের খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের মতো পাহাড়ি বন না হলেও সমতলের শালবনের নিজস্ব একটা শান্ত চরিত্র আছে এখানে।
যাতায়াত ও ব্যবহারিক তথ্য
অবস্থান: রাজেন্দ্রপুর, গাজীপুর — ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে; জয়দেবপুর চৌরাস্তা পেরিয়ে ডানদিকে প্রধান গেট (ইভেন্ডো/এরমাকভাগুস)। যাওয়া: মহাখালী বা গুলিস্তান থেকে ময়মনসিংহগামী যেকোনো বাসে উঠে কন্ডাক্টরকে বললেই ন্যাশনাল পার্কের মেইন গেটে নামিয়ে দেবে (গুফলাই২৪); নিজের গাড়িতে গেলে গেটে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। উদ্যান সাধারণত সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খোলা থাকে; প্রবেশ ফি নামমাত্র (হালনাগাদ ফি গেটেই জেনে নিন — অনলাইন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক পাওয়া যায়)। সেরা সময়: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় হাঁটা ও পিকনিক সবচেয়ে আরামদায়ক; বর্ষায় (জুন–সেপ্টেম্বর) পথ কাদামাটি হয়ে যায় (ট্রাভেল.কম/ইভেন্ডো)। সঙ্গে পানি ও পোকা-তাড়ানো স্প্রে রাখুন, নির্ধারিত পথেই থাকুন, আর পিকনিকের আবর্জনা নিজে ফেলে আসবেন না — বনটা আমাদের সবার।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান কত বড়?
মোট ৫,০২২ হেক্টর, কোর জোন প্রায় ৯৪০ হেক্টর (এরমাকভাগুস)।
কবে জাতীয় উদ্যান ঘোষিত হয়?
১৯৭৪ সালে সংরক্ষণ-প্রক্রিয়া শুরু, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ১৯৮২ সালে (ট্রাভেল.কম/ইভেন্ডো)।
ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন?
ময়মনসিংহগামী বাসে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পেরিয়ে রাজেন্দ্রপুরে পার্কের প্রধান গেটে নামুন (গুফলাই২৪)।
এখানে কী কী আছে?
শালবন, পিকনিক স্পট, মিনি চিড়িয়াখানা, ওয়াচ টাওয়ার, শিশু পার্ক ও পদ্ম পুকুর (গুফলাই২৪)।
কোন সময় যাওয়া ভালো?
নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে আরামদায়ক; বর্ষায় পথ কাদা হয় (ট্রাভেল.কম)।
শেষকথা
রাজধানীর এত কাছে এমন বিস্তৃত শালবন থাকাটা ঢাকার সৌভাগ্য — আর তা টিকিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। একদিনের পিকনিক হোক বা শুধু গাছের ছায়ায় দুপুর কাটানো, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান শহুরে জীবনের সবচেয়ে সহজ প্রকৃতি-বিরতি।