• 31 Oct, 2026

গাইবান্ধা শহর ও বালাসী ঘাট ভ্রমণ গাইড — ১৯৩৮ সালের তিস্তামুখ–বাহাদুরাবাদ রেল ফেরির ইতিহাস, ১৯৯০-এ বালাসীতে স্থানান্তর, যমুনা সেতুর পর ফেরি বন্ধ, মরিচা ধরা জাহাজ এবং ১৪৫ কোটি টাকার অচল টার্মিনালের গল্পসহ যাওয়ার তথ্য।

গাইবান্ধা শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার পূর্বে, ফুলছড়ির কঞ্চিপাড়ায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার তীরে বালাসী ঘাট — একসময় উত্তরবঙ্গের আট জেলার মানুষের ঢাকা যাওয়ার প্রাণরেখা। এখানে ফেরি শুধু যাত্রী নয়, আস্ত ট্রেনের ওয়াগন পার করে দিত নদী। আজ সেই ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে মরিচা ধরা জাহাজ আর ফেরিহীন এক আধুনিক টার্মিনাল।

১৯৩৮: রেল ফেরির যুগ শুরু

ব্রিটিশ আমলে, ১৯৩৮ সালে চালু হয় ফুলছড়ির তিস্তামুখ ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত রেল ফেরি সার্ভিস (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড/উইকিভ্রমণ)। ব্যবস্থাটা ছিল এমন: উত্তরের আট জেলার যাত্রী ট্রেনে তিস্তামুখ ঘাটে এসে ফেরিতে নদী পার হতেন, বাহাদুরাবাদ থেকে আবার ট্রেনে চড়ে ঢাকা পৌঁছাতেন; পণ্যের ক্ষেত্রে রেলওয়ে ওয়াগনই ফেরিতে উঠে যেত (ভোরের কাগজ/ঢাকা পোস্ট)। সস্তায় ও নিরাপদে রাজধানী যাওয়ার এই পথ ছিল উত্তরাঞ্চলের প্রধান ভরসা; রেলওয়ের আলাদা মেরিন বিভাগ এই সার্ভিস পরিচালনা করত (ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। ঈশ্বরদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ যেমন রেল-নদীর ইতিহাসের এক অধ্যায়, বালাসী-বাহাদুরাবাদ তার আরেকটি।

১৯৯০: তিস্তামুখ থেকে বালাসীতে

১৯৯০ সালে নদীর নাব্য সংকটে ঘাট স্থানান্তরিত হয় তিস্তামুখ থেকে বালাসীতে; তখনো রেলওয়ের অন্তত ৩০টি নৌযান নিয়মিত চলত, বালাসী থেকে সরাসরি জামালপুর-ময়মনসিংহ যাওয়া যেত (ভোরের কাগজ/ঢাকা পোস্ট)। কিন্তু নদীর প্রবাহ বদল ও চর জমে ওঠায় ধীরে ধীরে স্তব্ধ হতে থাকে বন্দর। যাত্রী ফেরি বন্ধ হয়ে যায় যমুনা সেতু (বঙ্গবন্ধু সেতু) চালুর (জুন ১৯৯৮) পরপরই; ওয়াগন ফেরি আরও কিছুকাল চললেও তাও বন্ধ হয়ে যায় (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।

মরিচা ধরা জাহাজের ঘাট

বন্ধের পর থেকে দুই দশকের বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ আমলের ফেরিগুলো ঘাটেই পড়ে থেকে মরিচা ধরেছে; ২০১৫ সালসহ বিভিন্ন সময়ে অনেকগুলো জাহাজ নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়, তবু কয়েকটি আজও তীরে দাঁড়িয়ে (ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস/বিডিনিউজ)। রেলওয়ের পুরনো স্থাপনা, পরিত্যক্ত ওয়াগন আর বিশাল নদীরক্ষা বাঁধ মিলে বালাসী আজ এক অদ্ভুত উন্মুক্ত জাদুঘর — আর বিস্তীর্ণ বালুচর ও নদীর দিগন্তের জন্য জায়গাটি এখন স্থানীয় পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয় (ভ্রমণ ব্লগ)। কুড়িগ্রামের চিলমারীতে যেমন ফেরি উঠে গেছে, এখানেও নদীর মর্জিই শেষ কথা বলেছে।

১৪৫ কোটির টার্মিনাল, কিন্তু ফেরি নেই (সাম্প্রতিক চিত্র)

বঙ্গবন্ধু সেতুর চাপ কমাতে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে ফেরি ফেরানোর উদ্যোগে ২০১৭ সালে শুরু হয় ঘাট-টার্মিনাল প্রকল্প; দুই দফা সংশোধনে ব্যয় দাঁড়ায় ১৪৫ কোটি ২ লাখ টাকা (ঢাকা পোস্ট)। আধুনিক টার্মিনাল ভবন, বিশাল প্রবেশদ্বার, ব্যারাক — সব নির্মিত হয়েছে; কিন্তু নাব্য সংকট ও ব্যর্থ ড্রেজিংয়ের কারণে কোনো ফেরি চলেনি, টার্মিনালটি এখন "নীরব ব্যর্থতার প্রতীক" (ভোরের কাগজ/ঢাকা পোস্ট)। বছরে মাত্র কয়েক মাস নৌকায় যাত্রী পারাপার হয়। স্থানীয়দের দাবি এখন ঘুরে গেছে অন্যদিকে — অন্তত আট জেলার মানুষ চায় এই পথে দ্বিতীয় যমুনা সেতু (ভোরের কাগজ)।

গাইবান্ধা শহর: ঘাঁটি

জেলাশহর গাইবান্ধা এই সার্কিটের থাকা-খাওয়ার ঘাঁটি; শহর থেকেই অটো-সিএনজিতে বালাসী যাওয়া যায় (উইকিভ্রমণ)। রেলে আসা যায় গাইবান্ধা স্টেশনে নেমে। ছন্দ: সকালে বালাসী ঘাট — নদীর বাঁধ ধরে হাঁটা, পুরনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ, চরের দিগন্ত; বিকেলে শহর। বর্ষায় নদী পূর্ণ থাকলেও শীতে চর জেগে ওঠে — দুই ঋতুর দুই রূপ।

ভ্রমণ তথ্য

ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি গাইবান্ধা; সেখান থেকে বালাসী ~১২ কিমি। পরিত্যক্ত জাহাজ/স্থাপনার গায়ে ওঠা বা ভেতরে ঢোকা থেকে বিরত থাকুন — মরিচা ধরা লোহা ঝুঁকিপূর্ণ। নৌকা পারাপারের সময় ও অবস্থা ঋতুভেদে বদলায় — ঘাটে গিয়ে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বালাসী ঘাট কীসের জন্য বিখ্যাত?

১৯৩৮ সালে শুরু হওয়া তিস্তামুখ–বাহাদুরাবাদ রেল ফেরির উত্তরসূরি ঘাট — এখানে ট্রেনের ওয়াগনও ফেরিতে পার হতো (উইকিভ্রমণ/ঢাকা পোস্ট)।

ঘাটটি বালাসীতে এলো কবে?

১৯৯০ সালে, নাব্য সংকটে তিস্তামুখ ঘাট থেকে স্থানান্তর হয়ে (ভোরের কাগজ)।

ফেরি বন্ধ হলো কেন?

নাব্য সংকট, আর যাত্রী ফেরির ক্ষেত্রে ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু চালু (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।

নতুন টার্মিনালের অবস্থা কী?

১৪৫ কোটি টাকায় নির্মিত হলেও ফেরি না থাকায় অচল (ঢাকা পোস্ট/ভোরের কাগজ)।

গাইবান্ধা শহর থেকে দূরত্ব কত?

প্রায় ১২ কিলোমিটার পূর্বে, ফুলছড়ি উপজেলায়।

শেষকথা

যে ঘাট দিয়ে এক প্রজন্ম ট্রেনে-ফেরিতে ঢাকা যেত, সেখানে এখন নীরব টার্মিনাল আর মরিচা ধরা জাহাজ — বালাসী বাংলাদেশের যোগাযোগ-ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী স্মারকগুলোর একটি।