পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীতে পদ্মা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার রেল-ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায় — লাল রঙের স্টিল ট্রাসের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ১৯১৫ সাল থেকে ট্রেন চলছে এই সেতু দিয়ে; পাশেই সড়কের লালন শাহ সেতু, আর দূরে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের কুলিং টাওয়ার — এক ফ্রেমে তিন যুগের তিন প্রকৌশল। পদ্মাপাড়ের এই ভ্রমণ বাংলাদেশের সেতু-ঐতিহ্যের সেরা পাঠগুলোর একটি।
নির্মাণ: কলকাতা থেকে আসামের স্বপ্ন
ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল কলকাতার সঙ্গে আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও উত্তরবঙ্গের রেল-যোগাযোগ সহজ করা (পাকশী বিভাগীয় সেতু কার্যালয়, প্রথম আলো/নিউ নেশন)। ১৯০৯ সালে জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ১৯১০–১১ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়, শেষ হয় ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরে (নিউ নেশন)। ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ সেতুটি উদ্বোধন করেন — তাঁর নামেই নামকরণ (প্রথম আলো)। নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা (প্রথম আলো)। সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৮ কিলোমিটার; মূল কাঠামোয় ১৫টি স্টিল গার্ডার স্প্যান, দুই প্রান্তে আরও ছয়টি স্থল-স্প্যান; প্রতিটি প্রধান স্প্যানের ওজন প্রায় ১,২৫০ টন (নিউ নেশন)। সেতুতে দুটি ব্রডগেজ রেললাইনের পাশাপাশি পায়ে হাঁটার পথও আছে (প্রথম আলো)। পদ্মাকে সেতুর নিচ দিয়ে স্থায়ীভাবে বইয়ে দিতে দুই পাশে তৈরি হয় বিশাল গাইড বাঁধ — এই নদী-প্রশিক্ষণই ছিল নির্মাণের সবচেয়ে কঠিন অংশ (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। সেতুটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম রেলসেতু (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
১৯৭১: বোমায় ভাঙা স্প্যান
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সেতুটি হয়ে ওঠে কৌশলগত লক্ষ্য। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনীর উত্তর–দক্ষিণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে মিত্রবাহিনীর বিমান হামলায় সেতুর একটি স্প্যান ধ্বংস হয় (নিউ নেশন/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। যুদ্ধের পর জাপান সরকারের সহায়তায় একই নকশায় স্প্যানটি পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং সেতুটি যান চলাচলের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয় ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
শতবর্ষ পেরিয়ে: এখন কেমন আছে সেতু
সেতুর নকশা-আয়ু ছিল ১০০ বছর; তবে ২০১৫ সালের ধাতব পরীক্ষা ও গবেষণায় দেখা গেছে যত্ন নিলে এটি ২০৪০ সাল পর্যন্ত চলতে পারবে (নিউ নেশন)। বর্তমানে ট্রেনের গতিসীমা ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার (আগে ছিল ৬০) এবং পাশে নতুন রেলসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা এগোচ্ছে (নিউ নেশন/ফ্রি লাইব্রেরি)। রেলওয়ে প্রকৌশলীদের ভাষ্যে নিয়মিত পরিদর্শনে সেতুর কাঠামোগত অবস্থা এখনো সন্তোষজনক (নিউ নেশন)। অর্থাৎ শতবর্ষী এই সেতু এখনো শুধু স্মৃতি নয় — প্রতিদিনের কর্মী।
পাকশী: সেতু ঘিরে গড়া রেলশহর
সেতুটির পরিচয়েই পাকশীর পরিচয় — সেতু নির্মাণের পর থেকেই এটি দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ও একটি রেলশহর হিসেবে গড়ে ওঠে (প্রথম আলো)। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় সদর এই শহর থেকে সেতুর সবচেয়ে ভালো দৃশ্য মেলে পদ্মার পাড় ও লালন শাহ সেতুর দিক থেকে। পাশেই ২০০৪ সালে সম্পন্ন সড়ক সেতু লালন শাহ সেতু — দুই সেতু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পদ্মার ওপর দুই শতকের প্রকৌশলের তুলনা দেখায় (নিউ নেশন)। নদীর পাড়ে সূর্যাস্ত, চরের বিস্তার আর সেতু দিয়ে ট্রেন যাওয়ার মুহূর্ত — এই তিনেই পাকশী ভ্রমণের প্রাণ। পদ্মার অন্য পাড়ের গল্পের জন্য গোয়ালন্দ ঘাট আর রাজশাহীর চারঘাট-সারদার পদ্মাপাড় আমাদের আগের পোস্টে আছে।
ভ্রমণ তথ্য
ঈশ্বরদী রেলস্টেশন থেকে পাকশী কাছেই — ট্রেনে এসে সেতু দেখা সবচেয়ে সুবিধাজনক; সড়কপথে পাবনা বা কুষ্টিয়া (ভেড়ামারা) দিক থেকেও আসা যায় (সেতুর অন্য প্রান্ত কুষ্টিয়ায়)। সেতুর ওপর পর্যটকদের হাঁটা নিরাপত্তার কারণে সীমিত থাকতে পারে — রেলওয়ে এলাকার নিয়ম মেনে পাড় ও ভিউ পয়েন্ট থেকেই দেখুন। ছবির জন্য সকাল ও গোধূলি সেরা; ট্রেন পারাপারের সময় জানতে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কবে উদ্বোধন হয়?
১৯১৫ সালের ৪ মার্চ, ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ কর্তৃক (প্রথম আলো)।
সেতুর দৈর্ঘ্য ও স্প্যান কত?
প্রায় ১.৮ কিলোমিটার; ১৫টি প্রধান স্টিল স্প্যান (নিউ নেশন)।
১৯৭১ সালে কী হয়েছিল?
ডিসেম্বরে মিত্রবাহিনীর বিমান হামলায় একটি স্প্যান ধ্বংস হয়; জাপানি সহায়তায় পুনর্নির্মাণের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর পুনরায় খোলে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
লালন শাহ সেতু কোনটি?
পাশের সড়ক সেতু, সম্পন্ন হয় ২০০৪ সালে (নিউ নেশন)।
সেতুটি কি এখনো চলাচলযোগ্য?
হ্যাঁ — ২০১৫ সালের পরীক্ষায় ২০৪০ পর্যন্ত চলাচলের উপযোগী বলা হয়েছে (নিউ নেশন)।
শেষকথা
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কেবল ইস্পাতের কাঠামো নয় — এটি ঔপনিবেশিক রেল-স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত আর মেরামতের জেদের একসঙ্গে বহন করা সেতু। পাকশীর পদ্মাপাড়ে দাঁড়িয়ে ট্রেনের শব্দ শুনলে বোঝা যায়, কেন শতবর্ষ পেরিয়েও এই সেতু এলাকার মানুষের গর্ব।