• 31 Oct, 2026

৫১ শক্তিপীঠের একটি যশোরেশ্বরী কালী মন্দির, বারো ভূঁইয়ার শ্রেষ্ঠ প্রতাপাদিত্যের শেষ রাজধানী ঈশ্বরীপুর, হাম্মামখানা, টেঙ্গা মসজিদ আর বাংলার প্রথম চার্চের গ্রাম — সাতক্ষীরার শ্যামনগরের এই ঐতিহ্য-গন্তব্যের পূর্ণ গাইড।

বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তে, সুন্দরবনের প্রায় গায়ে, একটি গ্রামে একই সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে হিন্দুদের ৫১ শক্তিপীঠের একটি, বারো ভূঁইয়াদের শ্রেষ্ঠ বীর প্রতাপাদিত্যের শেষ রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ, একটি মুঘল-আমলের হাম্মামখানা, আর বাংলার প্রথম ক্যাথলিক চার্চের স্মৃতি — সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর। জায়গাটি ছোট — প্রায় দেড় বর্গকিলোমিটার — কিন্তু এর প্রতিটি ইটে লেখা চার শ বছরের ইতিহাস। সুন্দরবন ভ্রমণের পথে মুন্সিগঞ্জ-কলাগাছিয়া রুটে এলে এই গ্রামটি কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না।

যশোরেশ্বরী: যশোরের দেবী ও শক্তিপীঠের বিশ্বাস

যশোরেশ্বরী নামের অর্থই "যশোরের দেবী"। পুরাণকথা অনুযায়ী দক্ষযজ্ঞের পর সতীর দেহত্যাগে শিবের প্রলয়নৃত্য থামাতে বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে দেহ খণ্ডিত করেন; খণ্ডগুলো যেখানে পড়ে সেখানেই গড়ে ওঠে শক্তিপীঠ। বিশ্বাস করা হয়, ঈশ্বরীপুরে পড়েছিল সতীর হাতের তালু — তাই যশোরেশ্বরী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে ৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম পবিত্র তীর্থ। মন্দিরের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসের চেয়ে কিংবদন্তিই শক্তিশালী: ধারণা করা হয় আনারি নামের এক ব্রাহ্মণ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন (তাঁর নামে ১০০টি দরজার গল্প প্রচলিত), তবে নির্মাণকাল নিশ্চিতভাবে জানা যায় না; পরবর্তীতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লক্ষ্মণ সেন মন্দির সংস্কার করে পাশে বিশাল নাটমন্দির গড়েন, এবং প্রতাপাদিত্যের আমলে মন্দির পুনরায় সংস্কার পায়। বেদীতে দেবীর বিগ্রহের মূলত মুখমণ্ডলই দৃশ্যমান — অবয়ব আবৃত থাকে মখমলে ও অলঙ্কারে। এখানে শনি ও মঙ্গলবারে নিত্য পুজো হয়, কালী পুজোয় হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে; উল্লেখযোগ্য হলো, মানত করতে হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম ভক্তরাও আসেন — মনোবাঞ্ছা পূরণ হলে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে জোড়া পায়রা উড়িয়ে দেওয়ার রীতি আছে।

প্রতাপাদিত্য, ধুমঘাট ও রাজধানী বদল

জনশ্রুতি বলে, প্রতাপাদিত্যের এক সেনাপতি জঙ্গলে আভা ছড়ানো একটি পাথরখণ্ড দেখতে পান — আকৃতি মানুষের হাতের তালুর মতো; সেই থেকে প্রতাপাদিত্য এখানে কালীপূজা শুরু করেন এবং মন্দিরটি তাঁর রাজকীয় মর্যাদা পায়। প্রতাপাদিত্যের প্রথম রাজধানী ছিল যমুনা ও ইছামতী নদীর সঙ্গমে কৌশলগত ধুমঘাট; মুঘলদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হলে তিনি রাজধানী সরিয়ে আনেন ঈশ্বরীপুরে — প্রায় ১৫৯০ থেকে ১৬১০ সাল পর্যন্ত এখান থেকেই চলত তাঁর যশোর রাজ্য, যার নামকরণ ঘিরেও এই মন্দির — "যশোরেশ্বরীপুর" সংক্ষেপেই ঈশ্বরীপুর। সেনাপতি মান সিংহ যশোরেশ্বরী দর্শনের ছলে এসে দুর্গের নকশা জেনে যান — এমন কাহিনিও লোকমুখে আছে; শেষে মুঘল আক্রমণে রাজ্যের পতন ঘটে, প্রতাপাদিত্য বন্দি হন। রাজধানীর জৌলুস আজ নেই, কিন্তু গ্রামের নাম, মন্দির আর ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ সেই যুগের সাক্ষ্য বহন করে।

মন্দিরের চারপাশে: এক গ্রামে পাঁচ শতাব্দী

ঈশ্বরীপুরের আসল বিস্ময় হলো এর ঘনত্ব। হাঁটা দূরত্বেই পাবেন: চণ্ডভৈরব মন্দির — ত্রিকোণাকার অস্বাভাবিক গড়নের মন্দির, সেন আমলের বলে মনে করা হয়; গোবিন্দ দেব মন্দির — প্রতাপাদিত্যের চাচা বসন্ত রায়ের নির্মাণ; জোড় শিব মন্দির — জমিদার হরিচরণ রায় চৌধুরীর প্রাসাদ-প্রাঙ্গণের যুগ্ম মন্দির; টেঙ্গা মসজিদ — পাঁচ গম্বুজের প্রাচীন মসজিদ; আর হাম্মামখানা — ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে প্রতাপাদিত্যের গড়া চারটি ছোট গম্বুজের স্নানাগার-ধাঁচের স্থাপনা, যা সেই যুগের দরবারি জীবনযাপনের বিরল নিদর্শন। আরেকটি অসাধারণ তথ্য: এই হিন্দু রাজার শাসনামলেই, পর্তুগিজ সৈন্যদের হাতে, এই গ্রামে গড়ে ওঠে বাংলার প্রথম ক্যাথলিক চার্চ — ধর্মীয় সহাবস্থানের এই চিত্র ঈশ্বরীপুরকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের মানচিত্রে অনন্য করে তুলেছে। অনেক স্থাপনাই আজ জীর্ণ; মন্দিরের দেবোত্তর জমি (এক সময় প্রায় ২০০ বিঘা দান করা হয়েছিল বলে জানা যায়) দখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে ওঠে — দেখতে গেলে এই বাস্তবতাটাও মাথায় রাখুন।

একটি নামের যাত্রা

মজার তথ্য হলো, এই অঞ্চলের মানুষের কাছে "যশোর" শব্দটি আজও আধুনিক যশোর জেলাকে বোঝায় না। ঐতিহাসিক রচনায় উল্লেখ আছে, দক্ষিণাঞ্চলের কোনো লোক ঈশ্বরীপুরের দিকে যাওয়ার সময় বলতেন "যশোর যাইতেছি" — কারণ প্রতাপাদিত্যের যশোর রাজ্যের কেন্দ্র এখানেই ছিল, এবং যশোরেশ্বরী দেবীর নামেই এই ভূখণ্ড তাঁদের কাছে "যশোর"। নামটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভ্রমণ করেছে শতাব্দী ধরে — কিন্তু এখানকার মানুষের মুখে তার সবচেয়ে পুরনো অর্থটি এখনো টিকে আছে। মন্দিরে গেলে এই ভাষার ঐতিহ্যটুকু নিজ কানে শুনতে পেলেও অবাক হবেন না।

সাম্প্রতিক অধ্যায়: মোদীর সফর ও মুকুট-চুরি

আন্তর্জাতিক আলোচনায় ঈশ্বরীপুর আসে ২০২১ সালের ২৭ মার্চ — বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যশোরেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন করেন এবং দেবীর মাথায় একটি স্বর্ণমুকুট পরিয়ে দেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর সেই মুকুটটি চুরি হয়ে যায় — খবরটি জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আসে এবং মন্দিরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মন্দিরে গেলে এই অধ্যায়ের কথাও স্থানীয়দের মুখে শুনতে পাবেন।

কীভাবে যাবেন

ঈশ্বরীপুর শ্যামনগর সদর থেকে অল্প দূরে — সাতক্ষীরা শহর থেকে শ্যামনগরগামী বাস/স্থানীয় যানে এসে সেখান থেকে ভ্যান-ইজিবাইকে পৌঁছানো যায়। সুন্দরবন ভ্রমণের সাতক্ষীরা-রেঞ্জ রুটের সঙ্গে মিলিয়ে এক দিনে কলাগাছিয়া-মুন্সিগঞ্জ ও ঈশ্বরীপুর ঘোরা যায়; শুধু ঐতিহ্য দেখতে এলেও শ্যামনগরে অবস্থান সুবিধাজনক। মন্দির দর্শনের উপযুক্ত সময় সকালের দিক — শনি-মঙ্গলবারে ভক্তসমাগম বেশি, কালী পুজোর সময় সবচেয়ে জমজমাট। ধর্মীয় স্থানে যাওয়ার সাধারণ শিষ্টাচার (নীরবতা, পোশাকের শালীনতা, ছবি তোলার অনুমতি) মেনে চলুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

যশোরেশ্বরী মন্দির কেন শক্তিপীঠ?

বিশ্বাস অনুযায়ী এখানে সতীর হাতের তালু পতিত হয়েছিল — তাই এটি হিন্দুধর্মের ৫১টি শক্তিপীঠের একটি।

প্রতাপাদিত্যের রাজধানী আসলে কোথায় ছিল?

প্রথমে ধুমঘাট (যমুনা-ইছামতী সঙ্গমে); মুঘল সংঘাতের পরিস্থিতিতে প্রায় ১৫৯০ সালে রাজধানী ঈশ্বরীপুরে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৬১০ সাল পর্যন্ত এখানেই থাকে।

ঈশ্বরীপুরে মন্দির ছাড়া আর কী দেখার আছে?

হাম্মামখানা, টেঙ্গা মসজিদ, চণ্ডভৈরব মন্দির, গোবিন্দ দেব মন্দির, জোড় শিব মন্দির — সবই হাঁটা দূরত্বে ছড়িয়ে আছে।

মোদীর দেওয়া স্বর্ণমুকুটটি কি এখনো আছে?

না — ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর মুকুটটি চুরি হয়ে যায় বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

কবে গেলে ভিড় বেশি পাব?

কালী পুজোর সময় সবচেয়ে বড় সমাগম হয়; সাপ্তাহিকভাবে শনি ও মঙ্গলবারে ভক্তের আনাগোনা বেশি।

শেষকথা

ঈশ্বরীপুর বাংলাদেশের সেই বিরল জায়গা, যেখানে তিন ধর্ম ঐতিহ্য আর একটি খাঁটি বাঙালি বীরের গৌরবগাথা একই গ্রামের মাটিতে জমা হয়েছে। অবকাঠামোর দিক থেকে এটি অবহেলিত হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের ওজনে ঈশ্বরীপুর দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য — সুন্দরবনের পথে এক বেলা এখানে থামলেই বোঝা যাবে কেন।