কুয়াকাটা মানেই শুধু সৈকত নয় — এই সৈকত-শহরের গোড়াপত্তনই একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত। রাখাইনদের খনন করা কুয়া, তাঁদের বৌদ্ধ বিহার আর তাঁতের পল্লী না দেখলে কুয়াকাটার অর্ধেক গল্পই অধরা থেকে যায়।
কুয়া থেকে কুয়াকাটা: ১৭৮৪-এর সেই যাত্রা
স্থানীয় রাখাইনদের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই ইতিহাস: ১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজা বোদোপয়া আরাকান রাজ্য জয় করলে আতঙ্কে বিপুল সংখ্যক রাখাইন পালিয়ে বাংলাদেশের দিকে আসেন; আরাকান থেকে ৫০টি পরিবার ৫০টি নৌকায় বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে প্রায় এক মাস পর বর্তমান বরগুনা-পটুয়াখালী উপকূলে পৌঁছান। সাগরের নোনা পানি পান করা যায় না বলে বসতি গড়তে গিয়ে তাঁরা প্রথমেই খনন করেন গভীর কুয়া (কূপ) — সুপেয় পানির সেই কুয়া থেকেই জায়গাটির নাম হয়ে যায় "কুয়াকাটা" (জাগো নিউজ)। সেই প্রাচীন কূপটি আজও আছে — সৈকতের কাছে রাখাইন পল্লী কেরানীপাড়ার শুরুতে, একটি বৌদ্ধ বিহারের পাশে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কুয়াকাটা ভ্রমণে এই কুয়াটি দেখে আসা মানে জায়গাটির নামের উৎসের সামনে দাঁড়ানো।
কেরানীপাড়া: সীমা বৌদ্ধ বিহার ও তাঁতের পল্লী
কুয়ার ঠিক সামনেই প্রাচীন সীমা বৌদ্ধ বিহার — কয়েক শত বছরের পুরনো বলে ধারণা করা হয়; পুরনো কাঠামো ভেঙে বর্তমানে নতুন দালান তৈরি হয়েছে (ভ্রমণট্রিপস)। বিহারের ভেতরে রয়েছে অষ্টধাতুর তৈরি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মূর্তি, যার ওজন প্রায় ৩৭ মণ বলে বাংলা উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ আছে। বিহারের সামনে থেকেই শুরু রাখাইনদের পল্লী কেরানীপাড়া — এখানে ঘরে ঘরে দেখা যাবে রাখাইন নারীদের তাঁতে কাপড় বোনা; তাঁদের হাতে তৈরি শীতের চাদরসহ নানা বুনন সামগ্রী কেনাও যায় (ভ্রমণট্রিপস)। পল্লীতে রাখাইন জাদুঘরও রয়েছে — ভ্রমণট্রিপসের তথ্য অনুযায়ী সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে, প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। পল্লীতে ঘোরার সময় মনে রাখুন, এটি পর্যটনকেন্দ্রের চেয়ে বেশি একটি জীবন্ত গ্রাম — ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত না ঘটানোই শিষ্টাচার। বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা দেখতে কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধ ঐতিহ্যের গাইডটিও পড়তে পারেন।
মিশ্রিপাড়া সীমা বিহার: শতবর্ষী বিহার ও সাম্প্রতিক বন্ধের খবর
সৈকত থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে রাখাইন গ্রাম মিশ্রিপাড়ায় আরেকটি সীমা বৌদ্ধ বিহার — সময়ের আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় একশ বছর আগে মিশ্রি তালুকদার ও আসামের উনারদা মহাথেরোর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত; বার্মা থেকে আসা পাঁচজন ভাস্কর প্রায় আড়াই বছর ধরে এর নির্মাণ শেষ করেন, বিহারটি ৩২ ফুট উঁচু। এখানকার বিশাল বুদ্ধমূর্তিকে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মূর্তিগুলোর একটি বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কিন্তু একটি জরুরি হালনাগাদ: সারাবাংলার ১৫ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে মারধরের একটি ঘটনার প্রতিবাদে রাখাইন সম্প্রদায় অনির্দিষ্টকালের জন্য এই বিহারে দর্শনার্থী পরিদর্শন বন্ধ রেখেছে — অভিযুক্তদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত বিহার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন বিহারের মহাথেরো, আর এতে ১৪ অক্টোবর থেকে পর্যটকদের ফিরে আসতে হচ্ছে। তাই মিশ্রিপাড়া যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে আগেই স্থানীয়ভাবে (হোটেল/স্থানীয় গাইড মারফত) জেনে নিন বিহার খুলেছে কি না; বন্ধ থাকলে বাইরে থেকেই ফিরতে হবে, তখন কেরানীপাড়ার বিহার ও পল্লীই হবে মূল অভিজ্ঞতা। উল্লেখ্য, সারাবাংলার প্রতিবেদনে এই বিহারের মূর্তিটিকেই অষ্টধাতুর তৈরি ৩৭ মণ ওজনের ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে — দুই বিহারের মূর্তি নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনায় মিল-অমিল আছে।
কীভাবে যাবেন ও টিপস
কেরানীপাড়া ও কুয়া সৈকত এলাকা থেকে হাঁটা বা রিকশা-অটোতে সহজেই যাওয়া যায় — সকালে সূর্যোদয়ের পর বা বিকেলের দিকে গেলেই পল্লীর তাঁতের কাজ চোখে পড়ে বেশি। মিশ্রিপাড়া প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে — স্থানীয় অটো/মোটরসাইকেল ভাড়া করে যেতে হয়; উপরোক্ত বন্ধের খবরের কারণে আগে খোঁজ নেওয়া বাধ্যতামূলক ধরে নিন। আশেপাশে সময় থাকলে কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার উত্তরে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় মৎস্য বাণিজ্যকেন্দ্র আলীপুর-মহিপুর বন্দর ঘুরে আসা যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া) — ভোরের মাছ নিলাম দেখার অভিজ্ঞতা অন্যরকম।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কুয়াকাটা নামটি এলো কীভাবে?
১৭৮৪ সালে আরাকান থেকে আসা রাখাইনরা সুপেয় পানির জন্য গভীর কুয়া খনন করেছিলেন; সেই "কুয়া" শব্দ থেকেই নাম কুয়াকাটা (জাগো নিউজ, স্থানীয় রাখাইনদের বক্তব্য)।
সীমা বৌদ্ধ বিহার কয়টি?
দুটি উল্লেখযোগ্য — সৈকতের কাছে কেরানীপাড়ায় কুয়ার সামনের বিহার, আর প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে মিশ্রিপাড়ার শতবর্ষী বিহার। দুটোতেই বিশাল ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি রয়েছে।
মিশ্রিপাড়া বিহারে এখন যাওয়া যাবে কি?
না, আপাতত নয় — সারাবাংলার প্রতিবেদন (১৫ অক্টোবর ২০২৬) অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য দর্শনার্থী পরিদর্শন বন্ধ আছে। যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে হালনাগাদ জেনে নিন।
রাখাইন পল্লীতে কী কেনা যায়?
কেরানীপাড়ায় রাখাইন নারীদের হাতে বোনা কাপড় ও শীতের চাদর কেনা যায় (ভ্রমণট্রিপস); রাখাইন জাদুঘরও দেখা যায় (সকাল ৭টা–সন্ধ্যা ৭টা, প্রবেশ ১০ টাকা — একই সূত্র)।
কেরানীপাড়া দেখতে কত সময় লাগবে?
কুয়া, বিহার ও পল্লী মিলিয়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা যথেষ্ট; মিশ্রিপাড়া যোগ করলে (খোলা থাকলে) আরও দুই ঘণ্টা ধরে রাখুন।
শেষকথা
সমুদ্রের গল্প সবাই জানে, কিন্তু কুয়াকাটার আসল গল্প শুরু হয় একখানা কুয়ার ধারে — বেঁচে থাকার জন্য খনন করা সেই কূপই আজ একটি শহরের নাম। বিহারের ঘণ্টাধ্বনি আর তাঁতের খটখট শব্দে ভরা এই পাড়াগুলোই সাগরকন্যার প্রাণ; শ্রদ্ধা নিয়ে গেলে অভিজ্ঞতাটা সৈকতের চেয়ে কম গভীর হবে না।