• 30 Oct, 2026

কুসুম্বা মসজিদ ভ্রমণ গাইড — ১৫৫৮–৫৯ সালে সুলায়মানের নির্মিত পাথর-আচ্ছাদিত মসজিদ, কালো বেসল্টের মিহরাব-কারুকাজ, ছয় গম্বুজ, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের ইতিহাস ও মান্দা-নওগাঁ ভ্রমণ তথ্য।

নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায়, আত্রাই নদীর পশ্চিম তীরে কুসুম্বা গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে গাঢ় কালো পাথরে মোড়া ছোট্ট এক মসজিদ — কুসুম্বা মসজিদ। আকারে বিনয়ী, কিন্তু কারুকাজে এতটাই সমৃদ্ধ যে এর ডাকনাম জুটেছে "বাংলার কালো রত্ন" (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। ছবি ছাপা হয়েছে দেশের ৫ টাকার নোটে (প্রথম আলো) — ঠিক যেমন রাজশাহীর বাঘা মসজিদের ছবি ছিল পুরোনো ৫০ টাকার নোটে। উত্তরবঙ্গের মসজিদ-ভ্রমণে এই দুটি একই রুটের জুটি।

১৫৫৮–৫৯: সুলায়মানের মসজিদ

পূর্বদিকের কেন্দ্রীয় প্রবেশদ্বারের ওপরে বসানো শিলালিপি (মূলত আরবি, শুধু "নির্মাণ করেন" অংশটুকু ফারসি) অনুযায়ী মসজিদটি নির্মিত হয় ৯৬৬ হিজরিতে, অর্থাৎ ১৫৫৮–৫৯ খ্রিস্টাব্দে (বাংলাপিডিয়া)। নির্মাতা সুলায়মান — সম্ভবত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা; সময়টা বাংলায় আফগান শাসনের, সুরি বংশের শেষ দিকের শাসক গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ-এর রাজত্বকাল (বাংলাপিডিয়া)। মজার বিষয়, সুরি আমলে তৈরি হলেও মসজিদটিতে উত্তর ভারতের সুরি স্থাপত্যের প্রভাব নেই বললেই চলে — এটি পুরোপুরি বাংলার নিজস্ব রীতিতে: ইটের গাঁথুনি, সামান্য বক্র কার্নিশ আর গায়ে লাগানো অষ্টভুজ কোণ-বুরুজ (বাংলাপিডিয়া)।

কালো পাথরের কারুকাজ

মূল কাঠামো ইটের হলেও বাইরের পুরো দেয়াল ও ভেতরে খিলানের ভিত পর্যন্ত পাথরের আস্তরণ; স্তম্ভ, মেঝে, জালি-পর্দা — সবই পাথরের (বাংলাপিডিয়া)। পাথর এসেছিল জলপথে বহু দূর থেকে — বিহারের রাজমহল পাহাড়ের কালো বেসল্ট (দি ইন্ডিপেনডেন্ট)। মসজিদটি আয়তাকার, তিন "বে" ও দুই "আইলে" ভাগ করা — ছাদে ছয়টি গম্বুজ; পূর্বে তিনটি, উত্তর-দক্ষিণে দুটি করে প্রবেশপথ (বাংলাপিডিয়া)। সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন মিহরাবগুলো: বহুখাঁজ খিলান, কলস-মোটিফের মুকুট, আর শিকলে ঝুলন্ত ট্যাসেল-অলংকরণসহ সূক্ষ্ম খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ (বাংলাপিডিয়া)। পূর্ব পাশে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা একটি উঁচু মঞ্চও আছে — অভিজাতদের জন্য আলাদা নামাজের জায়গা হিসেবে এর ব্যবহার ছিল বলে ধারণা (দি ইন্ডিপেনডেন্ট)। মসজিদ ঘিরে প্রাচীরবেষ্টিত প্রাঙ্গণ, প্রহরীদের দাঁড়ানোর জায়গাসহ স্মারক প্রবেশদ্বার, আর সামনে মুসল্লিদের অজুর জন্য বড় দীঘি (বাংলাপিডিয়া/দি ইন্ডিপেনডেন্ট)।

ভূমিকম্প, সংরক্ষণ ও বর্তমান

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মসজিদটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় — চারদিকের প্রাচীর প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, গম্বুজেরও ক্ষতি হয় (বাংলাপিডিয়া/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কার করে এটিকে সংরক্ষণে নেয় — আজ এটি দেশের সুরক্ষিত প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা অবস্থায় থাকা নিদর্শন (দি ইন্ডিপেনডেন্ট)। এখনও এখানে নিয়মিত নামাজ হয়; মসজিদের পবিত্রতা ও নিয়ম মেনে ঘুরে দেখুন।

যাতায়াত ও পরিকল্পনা

রাজশাহী থেকে দূরত্ব প্রায় ৪৬ কিলোমিটার — রাজশাহী–নওগাঁ মহাসড়কে মান্দার কুসুম্বা মোড় থেকে মাত্র ৪০০ মিটার পশ্চিমে গ্রামটি (প্রথম আলো)। নওগাঁ শহর থেকেও সহজে আসা যায়। একই জেলার পাহাড়পুরের সঙ্গে জুড়ে নিলে একদিনে বৌদ্ধ-বিশ্ববিদ্যালয় আর সুরি-মসজিদ — হাজার বছরের দুই অধ্যায়। সকালের নরম আলোয় কালো পাথরের কারুকাজ সবচেয়ে ভালো ধরা পড়ে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

কুসুম্বা মসজিদ কে, কবে নির্মাণ করেন?

সুলায়মান নামের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ১৫৫৮–৫৯ খ্রিস্টাব্দে (৯৬৬ হিজরি) — শিলালিপি অনুযায়ী (বাংলাপিডিয়া)।

মসজিদে কটি গম্বুজ আছে?

ছয়টি — তিন বে ও দুই আইলের বিন্যাসে (দি ইন্ডিপেনডেন্ট)।

কোন নোটে এর ছবি আছে?

বাংলাদেশের ৫ টাকার নোটে (প্রথম আলো)।

"কালো রত্ন" বলা হয় কেন?

রাজমহল থেকে আনা কালো বেসল্ট পাথরের আস্তরণের জন্য (দি ইন্ডিপেনডেন্ট)।

রাজশাহী থেকে দূরত্ব কত?

প্রায় ৪৬ কিলোমিটার (প্রথম আলো)।

শেষকথা

কুসুম্বা ছোট মসজিদ, কিন্তু এর পাথরের গায়ে লেখা আছে সাড়ে চারশো বছরের ইতিহাস — সুরি শাসন, বাঙালি কারিগরের হাত আর ভূমিকম্প পেরিয়ে টিকে থাকা। দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে মিহরাবের খোদাইগুলো কাছ থেকে দেখলেই "কালো রত্ন" নামটা সার্থক মনে হবে।