• 30 Oct, 2026

রাজশাহীর বাঘা শাহী মসজিদ ভ্রমণ গাইড — ১৫২৩-২৪ সালে সুলতান নসরত শাহের নির্মাণ, দশ গম্বুজের টেরাকোটা স্থাপত্য, নারীদের মসজিদের হারানো ফলকের গল্প, শাহ দৌলার মাজার ও ঈদ মেলা।

রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের সবচেয়ে অলংকৃত মসজিদগুলোর একটি — বাঘা শাহী মসজিদ। ২০২৪ সালে এর বয়স পূর্ণ হয়েছে ৫০০ বছর। পুঠিয়ার হিন্দু মন্দির-স্থাপত্যের পর এই একই দিনভ্রমণে সুলতানি মুসলিম স্থাপত্যের সেরা নমুনা দেখার সুযোগ — রাজশাহী জেলার ভ্রমণে এমন যুগল খুব কম জায়গায় মেলে।

নসরত শাহের মসজিদ (১৫২৩–২৪)

মসজিদটি নির্মাণ করেন সুলতান নাসিরউদ্দিন নসরত শাহ১৫২৩–২৪ খ্রিস্টাব্দে (৯৩০ হিজরি) — তিনি হোসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র (ইংরেজি উইকিপিডিয়া/ডেইলি স্টার)। হোসেন শাহী আমলকে (১৪৯৪–১৫৩৮) বাংলার মুসলিম শাসনের স্বর্ণযুগ বলা হয় (যুগান্তর)। তখন বাঘা ছিল পদ্মা তীরের সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র। সমগ্র কমপ্লেক্সটি ২৫৬ বিঘা জমির ওপর (অবজারভার/যুগান্তর)। মসজিদের ছবি ছিল পুরোনো ৫০ টাকার নোটে, আছে ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটেও (যুগান্তর)। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে সব গম্বুজ ধসে পড়ে; পরে মূল নকশা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সংস্কার হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া/ডেইলি স্টার)।

টেরাকোটার অসাধারণ কারুকাজ

মসজিদটি দাঁড়িয়ে ৮–১০ ফুট উঁচু পাথর-বাঁধানো ভিতের ওপর: দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা ২৪ ফুট (ডেইলি স্টার)। ছাদে ১০টি অর্ধগোলাকার গম্বুজ, ভেতরে ৬টি কালো ব্যাসল্ট পাথরের স্তম্ভ, ৫টি প্রবেশ খিলান আর ৪টি কারুকার্যখচিত মেহরাব — যেগুলোকে ইসলামি টেরাকোটা অলংকরণের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ধরা হয় (ডেইলি স্টার)। ভেতর-বাইরের প্রতিটি দেয়ালজুড়ে ফুল-লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা, আমগাছ-শাপলার মোটিফ আর আরবি-ফারসি ক্যালিগ্রাফি; মাঝের দরজার ওপরে ফারসি শিলালিপি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পাশেই অভিজাত পরিবারের নারীদের জন্য তৈরি ছোট তিনগম্বুজ মসজিদ — স্থানীয়ভাবে পরিচিত "চুরি যাওয়া ফলকের মসজিদ" নামে: পরিচর্যাকারীর বয়ানে, এর কালো পাথরের শিলালিপি ফলকটি নব্বইয়ের দশকে চুরি হয়ে দিল্লির দোকানে বিক্রি হয়েছিল, পরে চোরেরাই তা ফেরত কিনে এনে দিয়ে যায় (ডেইলি স্টার)। এই টেরাকোটা-ঐতিহ্যের আরেক ধারক ঝিনাইদহের শৈলকূপা শাহী মসজিদ।

দীঘি, মাজার ও ঈদ মেলা

মসজিদের সামনে নসরত শাহের খনন করা বলে পরিচিত বিশাল দীঘি — পাড়জুড়ে নারকেল গাছের সারি (অবজারভার)। উত্তরে হজরত শাহ দৌলা ও তাঁর পাঁচ অনুসারীর মাজার, পাশে জহুর খাকী পীরের মাজার (অবজারভার)। প্রাঙ্গণে একটি ছোট জাদুঘরও গড়া হয়েছে (ডেইলি স্টার)। প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের সময় তিন দিনের মেলা বসে মসজিদ প্রাঙ্গণে — লোকমুখে এর ঐতিহ্য ৫০০ বছরের, ভিড় জমে লাখো মানুষের (অবজারভার/যুগান্তর)। তবে সতর্কতা: সংরক্ষণ-ঘাটতি ও সংস্কারের অভাবে মসজিদের জীর্ণ দশা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন আছে (অবজারভার ২০২০; যুগান্তর) — ঐতিহ্যের মর্যাদায় যত্নের দাবিটা এখানে চোখে পড়ার মতো।

যাতায়াত ও পরিকল্পনা

রাজশাহী শহর থেকে বাসে বাঘা উপজেলা সদর — মসজিদ সদরেই। পুঠিয়ার সঙ্গে একই দিনে জোড়া ভ্রমণ সবচেয়ে যুক্তিসংগত: সকালে পুঠিয়া, দুপুর পেরিয়ে বাঘা। মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণে; ভেতরে ঢোকার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে চলুন, নামাজের সময় পর্যটক ভিড় এড়িয়ে চলুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাঘা মসজিদ কে, কবে নির্মাণ করেন?

সুলতান নাসিরউদ্দিন নসরত শাহ, ১৫২৩–২৪ খ্রিস্টাব্দে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।

মসজিদে কটি গম্বুজ আছে?

১০টি গম্বুজ, ৬টি স্তম্ভ ও ৪টি মেহরাব (ডেইলি স্টার)।

কোন নোটে এর ছবি ছিল?

পুরোনো ৫০ টাকার নোটে; ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটেও (যুগান্তর)।

ঈদ মেলা কখন হয়?

ঈদুল ফিতরে তিন দিন ধরে — প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্য (অবজারভার)।

রাজশাহী থেকে দূরত্ব কত?

প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।

শেষকথা

বাঘা শাহী মসজিদ শুধু নামাজের জায়গা নয় — সুলতানি বাংলার শিল্পরুচির জীবন্ত দলিল। পাঁচশ বছর পেরিয়েও এর টেরাকোটার ফুলগুলো যখন চোখে পড়ে, হোসেন শাহী যুগের "স্বর্ণযুগ" ডাকটা আর অতিকথন মনে হয় না।