• 29 Oct, 2026

ময়নামতী ওয়ার সেমেট্রি ও লালমাই পাহাড়: যুদ্ধের স্মৃতি আর লাল মাটির পাহাড়শ্রেণি

ময়নামতী ওয়ার সেমেট্রি ও লালমাই পাহাড়: যুদ্ধের স্মৃতি আর লাল মাটির পাহাড়শ্রেণি

কুমিল্লার দুই বিপরীতমুখী দর্শনীয় স্থানের গাইড — কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭৩৬ সৈনিকের সমাধি আর নীরব শ্রদ্ধার পরিবেশ, এবং লাল মাটির প্রাচীন লালমাই পাহাড়শ্রেণি, চণ্ডীমুড়া মন্দির ও জীবাশ্ম কাঠের গল্প।

কুমিল্লা ভ্রমণ মানেই শুধু প্রাচীন বিহার নয় — একই দিনে আপনি দাঁড়াতে পারেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শহীদদের নীরব সমাধিক্ষেত্রে, আবার হাঁটতে পারেন আড়াই মিলিয়ন বছরের পুরনো লাল মাটির পাহাড়ে। এই লেখায় রইল সেই দুই বিপরীত অথচ পরিপূরক অভিজ্ঞতার পূর্ণ গাইড — ময়নামতী ওয়ার সেমেট্রি ও লালমাই পাহাড়।

ওয়ার সেমেট্রি: বার্মা ফ্রন্টের নীরব সাক্ষী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বঙ্গ-বার্মা ফ্রন্টের অন্যতম ঘাঁটি ছিল কুমিল্লা — এখানে ছিল মিত্রবাহিনীর বড় সেনাছাউনি, যুদ্ধ-সরবরাহ ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি ও একাধিক সামরিক হাসপাতাল। যুদ্ধে নিহত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া সৈনিকদের জন্যই গড়ে ওঠে এই সমাধিক্ষেত্র, যা পরিচালনা করে কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন (CWGC)। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী এখানে ৭৩৬টি কমনওয়েলথ যুদ্ধসমাধি রয়েছে; সব মিলিয়ে শায়িত আছেন ৭৩৭ জন — এর মধ্যে ছিলেন ২৪ জন জাপানি যুদ্ধবন্দি ও একজন বেসামরিক ব্যক্তিও। বাহিনীভেদে আছেন ৩ জন নাবিক, ৫৬৭ জন সৈনিক ও ১৬৬ জন বৈমানিক; দেশভেদে যুক্তরাজ্যের ৩৫৭ জন, অবিভক্ত ভারতের ১৭৮ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬ জন, পূর্ব আফ্রিকার ৫৬ জন ছাড়াও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, রোডেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের সৈনিকেরা। স্থানীয়দের কাছে ‘ইংরেজ কবরস্থান’ নামে পরিচিত হলেও এখানে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি ও বৌদ্ধ — সব ধর্মের সৈনিকের সমাধি রয়েছে; সাধারণ সৈনিক থেকে ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার কর্মকর্তা পর্যন্ত। ঢাকা, ফরিদপুর, পাকশী, সৈয়দপুর, সান্তাহার ও সিরাজগঞ্জের ছোট সমাধিক্ষেত্রগুলো রক্ষণাবেক্ষণ-অযোগ্য হয়ে পড়লে সেখানকার কবরও পরে এখানে স্থানান্তর করা হয়।

ভেতরে যা দেখবেন

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়, কুমিল্লা-সিলেট সড়কের পাশে প্রায় সাড়ে চার একর পাহাড়ি ভূমিতে সযত্নে সাজানো এই ক্ষেত্র। প্রবেশমুখ থেকে সামান্য উঁচু টিলার ধাপে দাঁড়িয়ে আছে ক্রস অব স্যাক্রিফাইস — কমনওয়েলথ সমাধিক্ষেত্রগুলোর চেনা প্রতীক। সারিবদ্ধ সাদা সমাধিফলকে প্রত্যেকের নাম, পদবি, রেজিমেন্ট ও বয়স খোদাই করা; অনেক ফলকে পরিবারের লেখা এক লাইনের ব্যক্তিগত বার্তা — সেগুলো পড়তে পড়তেই সময় থেমে যায়। প্রবেশপথ ও টিলার মাঝে খ্রিস্টান সৈনিকদের কবর, টিলার ওপাশে মুসলিম সৈনিকদের অংশ — ধর্মভেদে সাজানো হলেও পুরো ক্ষেত্রজুড়ে একই নীরব শ্রদ্ধার আবহ। সবুজ লন, সারিবদ্ধ গাছ আর পাখির ডাক মিলিয়ে জায়গাটা কবরস্থানের চেয়ে বেশি মনে হয় একটা স্মৃতি-উদ্যান।

জাপানি সৈনিকদের শেষ প্রত্যাবর্তন (২০২৪)

এই সমাধিক্ষেত্রের সাম্প্রতিকতম অধ্যায়টি আবেগঘন: ২০২৪ সালের নভেম্বরে এখানে শায়িত ২৪ জন জাপানি সৈনিকের দেহাবশেষ জাপানে ফিরিয়ে নেওয়া হয় — একটি কবর খালি পাওয়া গিয়েছিল, বাকি ২৩ জনের দেহাবশেষ প্রত্যাবাসন করা হয় (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন)। যুদ্ধের আশি বছর পর শত্রুপক্ষের সৈনিকদেরও নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ স্থানটিকে মানবিক স্মৃতিচারণার আরেক মাত্রা দিয়েছে। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে এখানে সব ধর্মের ধর্মগুরুদের অংশগ্রহণে বার্ষিক স্মরণ ও প্রার্থনাসভা হয়; কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর হাইকমিশনার-রাষ্ট্রদূতেরা শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।

পরিদর্শনের সময় ও নিয়ম

ওয়ার সেমেট্রি বিনামূল্যে সবার জন্য উন্মুক্ত — ঈদের দুই দিন ছাড়া বছরের প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা (মাঝখানে দুপুর ১২টার পর প্রায় এক ঘণ্টার বিরতি থাকে; বিরতির সঠিক সময় গেটে জেনে নিন)। এটি একটি সমাধিক্ষেত্র — ভেতরে নীরবতা বজায় রাখুন, মর্যাদাপূর্ণ পোশাক পরুন, সমাধিফলকে হাত দেওয়া বা লনে বসে আড্ডা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ক্যান্টনমেন্ট-সংলগ্ন এলাকা বলে গেটে পরিচয় নিশ্চিত করতে হতে পারে — জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন।

লালমাই পাহাড়: লাল মাটির প্রাচীন শ্রেণি

ওয়ার সেমেট্রি থেকে ফিরে এবার পাহাড়ের দিকে। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত লালমাই-ময়নামতী পাহাড়শ্রেণি — বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার, প্রস্থ ১–২.৪ কিলোমিটার, আয়তন প্রায় ৩৩ বর্গকিলোমিটার। শ্রেণির উত্তরাংশ ময়নামতী, দক্ষিণাংশ লালমাই নামে পরিচিত; উত্তর প্রান্ত রানীর বাংলো, দক্ষিণ প্রান্ত চণ্ডীমুড়ায় শেষ। পাহাড়গুলো নিচু — গড় উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার, সর্বোচ্চ চূড়া প্রায় ৪৬ মিটার। এই পাহাড়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর লালচে-বাদামি মাটি — প্লাইস্টোসিন যুগের (প্রায় ২৫ লক্ষ বছর আগের) মধুপুর ফরমেশনের এই লাল মাটি থেকেই ‘লালমাই’ নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয় (কারো মতে ঔষধি গাছের ‘লালাম্বি’ বন থেকে)। পাহাড়ের দুপি টিলা স্তরে পাওয়া গেছে জীবাশ্ম কাঠ (শিলীভূত কাঠ) — ভূতাত্ত্বিকদের চোখে এই শ্রেণি আরাকান ইয়োমা পর্বতমালার বিচ্ছিন্ন বিস্তার। প্রাচীনকালে এই টিলাগুলোর চূড়াতেই গড়ে উঠেছিল ময়নামতীর বিহার-মন্দিরগুলো — তাই ময়নামতী ঘোরার দিনে এই পাহাড় আপনারা আসলে পায়ের নিচেই পাবেন (আগের পর্বে দেখুন ময়নামতী ভ্রমণ গাইড)।

চণ্ডীমুড়া ও পাহাড়ে আজকের জীবন

শ্রেণির দক্ষিণ প্রান্তের উঁচু টিলায় চণ্ডীমুড়া মন্দির — দেবী চণ্ডীর প্রাচীন তীর্থস্থান; কিংবদন্তি অনুযায়ী সপ্তম শতকে খড়্গ বংশের রানীর ইচ্ছায় এখানে মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল (এটি লোকবিশ্বাস হিসেবেই পড়ুন)। সিঁড়ি বেয়ে চূড়ায় উঠলে চারপাশের সমতল আর দূরের পাহাড়শ্রেণির দৃশ্য মন ভরিয়ে দেয়; উৎসবের সময় এখানে মেলা বসে। আজকের লালমাই শুধু ইতিহাস নয় — পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে আছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও বার্ডের মতো প্রতিষ্ঠান, আর গত দুই দশকে গড়ে উঠেছে ম্যাজিক প্যারাডাইস, ডাইনোসর পার্ক, ব্লু ওয়াটার পার্কের মতো পারিবারিক বিনোদন কেন্দ্রও। তবে সতর্কবার্তাটাও জরুরি: মাটি কেটে পাহাড় ধ্বংসের কারণে ঐতিহাসিক এই শ্রেণি অস্তিত্ব-সংকটে — পরিবেশবিদ ও প্রশাসনের নজরদারি সত্ত্বেও পাহাড় কাটা পুরোপুরি থামেনি। ভ্রমণকারী হিসেবে আমরা অন্তত নিয়ম মেনে, পাহাড়ের গায়ে ক্ষত না করে ঘুরে আসতে পারি।

কীভাবে যাবেন

ওয়ার সেমেট্রি: কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার — জাঙ্গালিয়া বা শাসনগাছা বাসস্ট্যান্ড থেকে ক্যান্টনমেন্টগামী বাসে ১০–২০ টাকা (সূত্র: ভ্রমণ-গাইড); সিএনজি রিজার্ভে গেলে ১৫০–৩০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, ২০–৩০ মিনিটের পথ। ক্যান্টনমেন্ট মিলিটারি হাসপাতালের কাছেই সড়কের পাশে CWGC-র দিকনির্দেশক সাইন দেখতে পাবেন।

লালমাই: শহর থেকে কোটবাড়ি হয়ে লালমাই বাজার/চণ্ডীমুড়ার দিকে সিএনজি-অটো চলে; ময়নামতী-কোটবাড়ি দিয়েই যেহেতু আসবেন, একই সিএনজি রিজার্ভ করে রাখলে ওয়ার সেমেট্রি, ময়নামতী ও লালমাই — তিনটে এক রুটে শেষ করা যায়।

একদিনে তিন অভিজ্ঞতা

সকালে প্রথমে ওয়ার সেমেট্রি (বিরতির আগেই, ১–১.৫ ঘণ্টা) → তারপর কোটবাড়িতে ময়নামতী জাদুঘর ও শালবন বিহার → বিকেলে লালমাইয়ের চণ্ডীমুড়া চূড়া থেকে সূর্যাস্ত। রবিবার গেলে জাদুঘর-বিহার বন্ধ পাবেন, তাই দিন বাছাইয়ে খেয়াল রাখুন।

থাকা ও খাওয়া

এই দুটি স্থানই কুমিল্লা শহরভিত্তিক দিনের ভ্রমণে সহজে হয়ে যায় — আলাদা রাত্রিযাপনের দরকার পড়ে না। তবে চাইলে কুমিল্লা শহরে বিভিন্ন বাজেটের হোটেল আছে; ক্যান্টনমেন্ট ও কোটবাড়ি এলাকায় সাধারণ খাবারের দোকান মিললেও ভালো রেস্তোরাঁর জন্য শহরই ভরসা। দিনের ভ্রমণে সঙ্গে পানি রাখুন — ওয়ার সেমেট্রির ভেতরে খাবার-দাবারের ব্যবস্থা নেই এবং সমাধিক্ষেত্রে খাওয়া-দাওয়া করাও শোভন নয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ওয়ার সেমেট্রিতে প্রবেশ ফি কত?

কোনো ফি নেই — সবার জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত (ঈদের দুই দিন বন্ধ)।

ভেতরে ছবি তোলা যায়?

শ্রদ্ধা বজায় রেখে সাধারণ ছবি তোলা যায়; এটি পিকনিক বা আড্ডার জায়গা নয় — নীরবতা ও মর্যাদা রক্ষা করুন।

চট্টগ্রামেও কি এমন সমাধিক্ষেত্র আছে?

হ্যাঁ — চট্টগ্রাম ওয়ার সেমেট্রিতে ৭৫৫ জন সৈনিক শায়িত; দুটোই CWGC পরিচালিত ও প্রতি নভেম্বরে স্মরণসভা হয় দুই জায়গাতেই।

শেষকথা

একদিকে যুদ্ধের মূল্য মনে করিয়ে দেওয়া নীরব সমাধিসারি, অন্যদিকে আড়াই মিলিয়ন বছরের লাল পাহাড় — কুমিল্লার এই দুই মুখ ইতিহাসের দুই ভিন্ন অধ্যায়। চট্টগ্রামে গেলে যুদ্ধ-স্মৃতির অন্য অধ্যায়টি দেখতে পড়ুন চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্য ভ্রমণ।