সিআরবি শিরিষতলা ভ্রমণ গাইড: ১৮৭২ সালের রেল ভবন আর বন্দরনগরীর ‘ফুসফুস’
চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকার সম্পূর্ণ গাইড — ১৮৭২ সালে নির্মিত সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং, শতবর্ষী শিরিষ-গর্জনের ছায়ায় শিরিষতলা, পয়লা বৈশাখের বলী খেলা আর শহরের প্রিয় আড্ডার চত্বর।

মেঘনা মোহনার নিঝুম দ্বীপের পূর্ণ গাইড — ২০০১ সালে ঘোষিত জাতীয় উদ্যান, চার জোড়া থেকে হাজার হাজার চিত্রা হরিণের অভয়ারণ্য, সুন্দরবনের পর দেশের অন্যতম বড় ম্যানগ্রোভ বন, শীতের অতিথি পাখি আর নামার বাজারের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত; লঞ্চ ও সড়কপথে যাতায়াত, ভাড়া ও থাকার তথ্যসহ।
নামটাই কথা বলে — নিঝুম, অর্থাৎ নীরব, নির্জন। মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এই দ্বীপে গেলেই বুঝবেন, নামটা শুধু কাব্য নয়, বাস্তব। একসঙ্গে সমুদ্রসৈকত আর ম্যানগ্রোভ বনের দ্বৈত রূপ দেশে খুব কম জায়গাতেই মেলে; মোহনার আরেক দ্বীপ সন্দ্বীপের সঙ্গে এর পার্থক্য এখানেই — নিঝুম দ্বীপ মূলত বন্য, বনময় আর হরিণের।
Table of contents [Show]
নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার সর্বদক্ষিণে এই দ্বীপটির জেগে ওঠা শুরু ১৯৪০-এর দশক থেকে; জনবসতি গড়ে ওঠে ১৯৭৩ সালের দিকে। আগেকার নাম চর ওসমান, বাল্লারচর বা বাইল্যার ডেইল — জেলেদের মুখে আজও পুরনো নামগুলো শোনা যায়। মূল ভূখণ্ডের আয়তন প্রায় ৯১ বর্গকিলোমিটার (উইকিপিডিয়া); চর ওসমান, চর কমলা, চর মুরি, বেলার চরসহ আশপাশের চরাঞ্চল মিলে ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল পুরো এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে সরকার — উদ্যানের আয়তন ১৬,৩৫২ হেক্টর। দ্বীপে রয়েছে ৯টি গুচ্ছ গ্রাম। ২০১৯ সালে আশপাশের জলরাশিকে ‘নিঝুম দ্বীপ সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় (টেলিটক, রবি, গ্রামীণফোন), তবে দ্বীপে গ্রিড বিদ্যুৎ নেই — চলতে হয় সোলার আর জেনারেটরে।
নিঝুম দ্বীপের প্রাণকেন্দ্র এর চিত্রা হরিণ। সত্তরের দশকে বন বিভাগ পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র চার জোড়া হরিণ ছেড়েছিল এই কেওড়া বনে — আজ তা থেকে গড়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় হরিণের অভয়ারণ্য। ১৯৯৬ সালের শুমারিতে সংখ্যা ছিল প্রায় ২২,০০০; সাম্প্রতিক আনুমানিক হিসেবে তা আরও বেড়েছে বলে স্থানীয়ভাবে বলা হয় (হালনাগাদ সরকারি শুমারি নেই — সংখ্যাটা আনুমানিকই ধরুন)। ভোর আর গোধূলিতে বনের ধারে, খালের পাড়ে কিংবা গ্রামের ফাঁকা মাঠে পাল বেঁধে হরিণ দেখা এখানে খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য — নামার বাজার থেকে বনের দিকে হাঁটলেই সুযোগ মিলবে। হরিণের পাশাপাশি বনে আছে বানর, বনবিড়াল, বনমোরগ, কাঠবিড়াল, নানা প্রজাতির সাপ ও কচ্ছপ। সন্ধ্যা নামলেই শেয়ালের ডাক এই দ্বীপের চেনা সাউন্ডট্র্যাক।
নোনা পানিতে ঘেরা এই দ্বীপ কেওড়া গাছের অভয়ারণ্য — সুন্দরবনের পর এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বলে অনেকে দাবি করেন। বাইনসহ অন্যান্য ম্যানগ্রোভ প্রজাতি মিলিয়ে বন বিভাগ সত্তরের দশক থেকে এখানে বনায়ন করে আসছে; বনের ফল-ফুল থেকে প্রতি বছর সংগ্রহ হয় শত শত লিটার মধু। শীতকালে দ্বীপ ভরে ওঠে লাখো অতিথি পাখির কলরবে — খাল-বিল আর চরের খাঁড়িগুলোতে হাঁসজাতীয় পাখির ঝাঁক পাখিপ্রেমীদের জন্য প্রধান আকর্ষণ। জাতীয় উদ্যানে শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; পাখি দেখুন দূর থেকে, বাইনোকুলার সঙ্গে রাখলে অভিজ্ঞতাটা দ্বিগুণ হবে।
দ্বীপের প্রধান জনপদ নামার বাজার — হোটেল-রেস্তোরাঁ, বাজার আর থাকার জায়গাগুলোর বেশিরভাগ এখানেই। নামার বাজার সৈকত থেকে একই জায়গা থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায় — দেশে এমন সৈকত হাতে গোনা। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বালুচর-ঘাসভূমির এই উপকূলে জোয়ার-ভাটার ছন্দে সৈকতের চরিত্র বদলায় ঘণ্টায় ঘণ্টায়; ভাটায় হেঁটে যাওয়া যায় অনেকটা ভেতরে, তবে জোয়ারের সময় মাথায় রেখে ফিরতে হবে। সৈকতে একা দূরে যাবেন না, আর সাঁতারের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের পরামর্শ নিন — মোহনার স্রোতে ঝুঁকি থাকে।
অক্টোবর থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি — এই সময়টাই সেরা: সাগর শান্ত, পাখি থাকে, হরিণ দেখার সুযোগ সবচেয়ে বেশি। বর্ষায় (জুন–সেপ্টেম্বর) মোহনা-সাগর উত্তাল থাকে — লঞ্চ ও ট্রলার চলাচল ব্যাহত হতে পারে, ওই সময় গেলে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা দেখে রওনা হোন, না হলে পরিকল্পনা বদলান। শীতের ছুটির দিনগুলোতে দ্বীপে ভিড় বাড়ে — সম্ভব হলে সপ্তাহের মাঝামাঝি দিন বেছে নিন।
নিঝুম দ্বীপে পৌঁছাতে হাতিয়া হয়ে যেতেই হয় — দুইটা প্রধান রুট:
নামার বাজারকেন্দ্রিক থাকার ব্যবস্থা: নিঝুম রিসোর্ট (রুমভেদে ~১,৫০০–৩,০০০ টাকা; অফ-সিজনে ছাড় মেলে বলে গাইডগুলোতে উল্লেখ আছে), হোটেল দ্বীপ সম্পদসহ সাধারণ মানের হোটেল, আর সবচেয়ে সাশ্রয়ীতে মসজিদ বোর্ডিংয়ের রুম (২০০–৪০০ টাকা)। ক্যাম্পিংয়ের জন্যও দ্বীপটি জনপ্রিয় — তাঁবু নিজে নিয়ে যাওয়া ভালো, আর বনের ধারে ক্যাম্প করলে স্থানীয় প্রশাসন/গাইডের মাধ্যমে ব্যবস্থা করুন। খাবারে পাবেন সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি আর মোটা চালের ভাত; রিসোর্টে অনুরোধে বারবিকিউয়ের ব্যবস্থা হয়। পাওয়ার ব্যাংক, টর্চ, নগদ টাকা (এটিএম/বিকাশ সুবিধা সীমিত ধরে নিন) আর পানীয় জলের ব্যবস্থা আগেই নিশ্চিত করুন।
আগের সন্ধ্যা: সদরঘাট থেকে ৫:৩০-এর লঞ্চে রাত যাপন নদীতে। প্রথম দিন: সকালে তমরুদ্দি নেমে মোক্তারিয়া হয়ে দ্বীপে পৌঁছে নামার বাজারে চেক-ইন; দুপুরে বিশ্রাম ও বাজারের খাবার; বিকেলে সৈকতে সূর্যাস্ত আর সন্ধ্যার পর শেয়ালের ডাক শুনতে শুনতে বনের ধারে ঘোরাঘুরি (গাইডসহ)। দ্বিতীয় দিন: ভোরে উঠে হরিণ দেখার সেরা সময় — সূর্যোদয়ের আলোয় বনের পথ ও খালপাড়; নাস্তা সেরে নামার বাজার সৈকতে সূর্যোদয়ের ছবি বাকি থাকলে এই বেলায়; সকাল ৯–১০টার মধ্যে রওনা — বন্দরটিলা থেকে মোক্তারিয়া, তারপর তমরুদ্দি গিয়ে দুপুরের ফিরতি লঞ্চ ধরা। হাতে আরেক দিন থাকলে দ্বিতীয় দিনটা রাখুন পাখি দেখা আর দ্বীপের গ্রামগুলো ঘুরে দেখার জন্য।
জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ ফি লাগে?
বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ ফি প্রযোজ্য হতে পারে — ঘাট/স্থানীয় বন কার্যালয়ে যাওয়ার সময় যাচাই করে নিন; হরিণ দেখার জন্য স্থানীয় গাইড নেওয়া অভিজ্ঞতাকে নিরাপদ ও ফলপ্রসূ করে।
কত দিন থাকা উচিত?
অন্তত ১ রাত ২ দিন — এক সকালে হরিণ ও বন, এক সন্ধ্যায় সৈকতের সূর্যাস্ত; তাড়াহুড়োর ডে-ট্রিপে দ্বীপের আসল মেজাজটা ধরা দেয় না। পৌঁছানোর দীর্ঘ পথটাও হিসেবে রাখুন।
মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট পাওয়া যায়?
টেলিটক, রবি ও গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় বলে গাইডসূত্রে জানা যায়, তবে দ্বীপের অনেক জায়গায় সিগন্যাল দুর্বল — জরুরি যোগাযোগের পরিকল্পনা আগেই সেরে রাখুন।
সৈকত, বন আর হরিণ — তিনটে জগত যেখানে এক ছোট্ট দ্বীপে গলে মিশেছে, নিঝুম দ্বীপ সেই বিরল জায়গা। মোহনার দ্বীপ-জীবনের আরেক রূপ দেখতে চাইলে পড়ুন কুতুবদিয়া দ্বীপ ভ্রমণ গাইড — বাতিঘর আর বায়ুকলের দ্বীপ অপেক্ষা করছে।
চট্টগ্রামের সিআরবি এলাকার সম্পূর্ণ গাইড — ১৮৭২ সালে নির্মিত সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং, শতবর্ষী শিরিষ-গর্জনের ছায়ায় শিরিষতলা, পয়লা বৈশাখের বলী খেলা আর শহরের প্রিয় আড্ডার চত্বর।
কালুরঘাটের পূর্ণ গাইড — ১৯৩০ সালের রেল সেতুর ইতিহাস, গঠন ও বর্তমান অবস্থা, আর ১৯৭১-এর ২৬–৩০ মার্চের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহাসিক ভূমিকা; যাতায়াত ও দর্শনের বাস্তব টিপসসহ।
কর্ণফুলীতে নৌকা ভ্রমণের ব্যবহারিক গাইড — কোন ঘাট থেকে সাম্পান ভাড়া করবেন, কোন দিকে যাবেন (মোহনা বা কালুরঘাট), ভাড়া ঠিক করার কৌশল, সেরা সময় ও নিরাপত্তা টিপস।


