সিলেট বিভাগের ইসলামি ইতিহাসের গল্পে দুটি নাম প্রায়ই একসঙ্গে আসে — শাহজালাল ও তাঁর বাহিনীর প্রধান সেনাপতি সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন। প্রথমজনের মাজার সিলেট শহরে; দ্বিতীয়জনের ঠিকানা হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের মুড়ারবন্দ দরবার শরীফ — যেখানে তিনি সাত শতাব্দী ধরে শায়িত, আর যে ভূমিতে তিনি গড়েছিলেন এক প্রশাসনিক ঐতিহ্য।
বাগদাদ থেকে তরফ: জীবনপথ
- পরিচয় ও আগমন: বাগদাদের সৈয়দ পরিবারে জন্ম (পিতা হাসান আরাবী); জীবনীগ্রন্থের অনুমান অনুযায়ী জন্ম ~১২৫০ খ্রিস্টাব্দ। মোঙ্গল নেতা হালাকু খাঁর বাগদাদ ধ্বংসের (১২৫৮) পর তিনি দেশ ছেড়ে দিল্লি পৌঁছান (বাংলাপিডিয়া)। তিনি ছিলেন সুহরাওয়ার্দিয়া তরিকার অনুসারী।
- সিপাহসালার পদ: বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের বাহিনীর প্রধান সেনাপতি (সিপাহসালার) হন তিনি। ১৩০৩ সালে সিলেট (গৌড়) বিজয়ের অভিযানে সুলতানের ভ্রাতুষ্পুত্র সিকান্দার খান গাজী ও হযরত শাহজালালের সঙ্গে তাঁর ভূমিকাই তাঁকে ইতিহাসে স্থায়ী করে (বাংলাপিডিয়া/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
- তরফ অভিযান (১৩০৪): বিজয়ের পরপরই শাহজালালের নির্দেশে তিনি বারোজন আউলিয়া-সঙ্গী নিয়ে দক্ষিণের সামন্ত রাজ্য তুঙ্গাচলের (পরবর্তী নাম তরফ) রাজা আচক নারায়ণের বিরুদ্ধে অভিযানে যান। জনশ্রুতি-ইতিহাসে প্রেক্ষাপট হিসেবে বলা হয়, কাজী নুরুদ্দিন নামের এক ব্যক্তির গরু কোরবানিকে কেন্দ্র করে রাজকীয় প্রতিশোধের ঘটনা এই অভিযানের সূত্রপাত (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। নাসির উদ্দিন শিবির করেন ‘লস্করপুর’ নামে পরিচিত হওয়া জায়গায় (সৈন্যদের ‘লস্কর’ থেকেই নাম); রাজা পরাজিত হয়ে পরিবারসহ পলায়ন করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া ‘সিলেট বিজয়’)। বিজিত ভূমির নাম হয়ে যায় ‘বারো আউলিয়ার মুল্লুক’।
- শাসক ও উত্তরাধিকার: বিজয়ের পর তিনি তরফের প্রশাসক হন — জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদ ও ধানচাষের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন বলে বর্ণনা আছে (কাউন্টারপয়েন্টের প্রবন্ধ)। তাঁর ছেলে সৈয়দ সিরাজ উদ্দিনকে তিনি নিহত কাজীর কন্যার সঙ্গে বিবাহ দেন (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। তাঁর বংশধরেরা ১৫৮১ সালে ত্রিপুরা রাজার হাতে ক্ষমতা হারানোর আগ পর্যন্ত এলাকাটির শাসনভার ধরে রাখেন বলে একই প্রবন্ধে বলা হয়েছে। এই সৈয়দ ধারারই উত্তরপুরুষ মধ্যযুগের কবি সৈয়দ সুলতান — সুলতানসী হাবেলীর প্রতিষ্ঠাতা; হবিগঞ্জ শহরের নামের গল্পও শেষ পর্যন্ত এই বংশেরই একজনের কাছে পৌঁছায়।
- মৃত্যু: জীবনীগ্রন্থের মতে, শাহজালালের মৃত্যুর (১৩৪৬) আগেই তাঁর ইন্তেকাল হয়; সমাহিত হন মুড়ারবন্দেই। তাঁর বংশের ১৩০টি পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে উপজেলা-ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
তরফ রাজ্য: হারিয়ে যাওয়া ভূগোল
তরফ কোনো ছোট জমিদারি ছিল না — এর পরিধিতে ছিল বর্তমান হবিগঞ্জ সদর, মাধবপুর, লাখাই, বাহুবল, চুনারুঘাট, নবীগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ও নেত্রকোণার জোয়ানশাহী পরগনা (বাংলা উইকিপিডিয়া ‘সিলেটের ইতিহাস’)। বারো সঙ্গীর মধ্যে ছিলেন শাহ আরেফিন (তাহিরপুরে সমাহিত — সুনামগঞ্জের শাহ আরেফিনের মেলার কথা মনে পড়বে), শাহ তাজউদ্দিন কুরেশী ও শাহ রুকনুদ্দিন আসওয়ারী (সরাইলে সমাহিত) — অর্থাৎ এই অভিযানই সিলেট বিভাগের মাজার-ভূগোলের অনেকটাই বুনে দিয়েছিল।
দরবারে যা দেখবেন
- মাজার শরীফ: দরবার প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে সিপাহসালারের মাকবারা। দরবার-সংক্রান্ত বর্ণনায় একটি বিষয় আলাদা করে বলা হয় — তাঁর কবরটি পূর্ব-পশ্চিম দিকে অবস্থিত বলে প্রচলিত, যা সাধারণ কবর-বিন্যাসের তুলনায় ব্যতিক্রম; ভক্তদের মাঝে এর নানা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে (দরবারের জীবনী-ব্লগ)। জিয়ারতে গেলে নিজে দেখে তবেই ধারণা মিলিয়ে নিন — লোকবিশ্বাসকে তথ্য হিসেবে না নিয়ে ঐতিহ্য হিসেবে উপভোগ করাই ভালো।
- পরিবেশ: দরবার শরীফ সারা বছর জিয়ারতকারীদের পদচারণায় মুখর — উপজেলার ইতিহাস-বর্ণনায় দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন অগণিত দর্শনার্থীর আগমনের কথা বলা হয়েছে। বার্ষিক ওরস ও মাহফিলের সময় ভিড় বহুগুণ বাড়ে (নির্দিষ্ট তারিখ দরবার কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নিন)।
- আশপাশের চা-বলয়: মুড়ারবন্দ চুনারুঘাটের চা-বাগান বলয়ের মধ্যেই — জিয়ারত শেষে বাগানের সবুজ, অথবা একই দিনে সাতছড়ি/রেমা-কালেঙ্গা মেলানো যায়।
যাওয়া ও শিষ্টাচার
- রুট: হবিগঞ্জ শহর বা শায়েস্তাগঞ্জ থেকে বাসে চুনারুঘাট; সেখান থেকে সিএনজি/রিকশায় মুড়ারবন্দ দরবার শরীফ (চুনারুঘাট উপজেলা সদরের কাছাকাছি)। ঢাকা থেকে এলে শায়েস্তাগঞ্জ নেমে চুনারুঘাটের বাস ধরুন।
- শিষ্টাচার: এটি সক্রিয় দরবার ও জিয়ারতস্থল — ভেতরে প্রবেশের আগে জুতা খুলুন, মাজারের অভ্যন্তরের নিয়ম মেনে ছবি তুলুন, জিকির-মাহফিল চলাকালে নীরবতা বজায় রাখুন। নারীদের জন্য দরবারের নির্ধারিত ব্যবস্থা সম্পর্কে স্থানীয়দের কাছে জেনে নিন।
- সময়: সকাল বা বিকেলে গেলে ভিড় তুলনামূলক কম; বৃহস্পতিবার রাত ও শুক্রবারে জিয়ারতকারীদের চাপ বেশি থাকে — সাধারণ মাজার-রীতির অভিজ্ঞতা থেকে বলা, দরবারের নিজস্ব সময়সূচি যাচাই করে নিন।
অর্ধদিনের নমুনা সূচি
- সকাল: চুনারুঘাট থেকে মুড়ারবন্দ দরবার — জিয়ারত ও প্রাঙ্গণ ঘোরা।
- দুপুর: চুনারুঘাট বাজারে খাওয়া; পথে চা বাগানের ধারে বিরতি।
- বিকেল: সাতছড়ির ছোট ট্রেইল বা শায়েস্তাগঞ্জ ফেরা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নাসির উদ্দিনকে ‘সিপাহসালার’ বলা হয় কেন?
‘সিপাহসালার’ অর্থ প্রধান সেনাপতি — সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের বাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক পদে ছিলেন তিনি (বাংলাপিডিয়া)।
তরফ রাজ্য বলতে কোন এলাকা বোঝাত?
আজকের হবিগঞ্জ জেলার প্রায় পুরোটা, সঙ্গে শ্রীমঙ্গল, সরাইল ও জোয়ানশাহী — উপরে বিস্তারিত দেওয়া আছে।
অমুসলিমরা কি দরবারে যেতে পারেন?
মাজার-ভ্রমণে সাধারণত সবার প্রবেশ সন্মানজনক পোশাক-আচরণ সাপেক্ষে উন্মুক্ত থাকে; নির্দিষ্ট আচারে অংশগ্রহণের নিয়ম দরবার কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নেওয়াই উত্তম।
শেষকথা
সিলেটে শাহজালালের মাজার দেখে যাঁরা ফিরে যান, তাঁরা গল্পের অর্ধেকটাই মিস করেন — বাকি অর্ধেক শুয়ে আছে মুড়ারবন্দে। আর এই সৈয়দ ধারার সূত্র ধরেই হবিগঞ্জ শহরের নামের জন্ম হয়েছিল — দুটি পোস্ট মিলিয়ে পড়লে সাতশ বছরের মানচিত্রটা এক রেখায় এসে দাঁড়ায়। পরের পোস্টে হবিগঞ্জের শেষ গন্তব্য: শাহজীবাজারের রাবার বাগান ও শাহ সোলেমান ফতেহ গাজীর মাজার।