• 30 Oct, 2026

বলিহার রাজবাড়ি ও নওগাঁ শহর ভ্রমণ গাইড — মুঘল আমলের জায়গিরের ইতিহাস, ১৮২৩ সালের রাজরাজেশ্বরী মন্দির, নাটমন্দির ও জোড়া শিব মন্দির, ৩৩০টি দীঘি-পুকুরের গল্প এবং বর্তমান পরিত্যক্ত অবস্থা।

নওগাঁ শহর থেকে পশ্চিমে নওগাঁ–রাজশাহী সড়ক ধরে প্রায় ১৮ কিলোমিটার গেলেই কুড়মইল গ্রামে দেখা মেলে জেলার প্রাচীনতম রাজবাড়িগুলোর একটির — বলিহার রাজবাড়ি। মুঘল যুগের জায়গির থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের শিক্ষিত রাজাদের আসর — এই প্রাসাদের গল্পে জমিদারি বাংলার তিন শতকের ছাপ। আজ ভবনগুলো অর্ধধ্বংস, তবু তোরণ আর মন্দিরগুলো দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। নওগাঁ ভ্রমণে পাহাড়পুর আর কুসুম্বার মাঝে বলিহার হলো জমিদারি-যুগের অধ্যায়।

আওরঙ্গজেবের সনদ থেকে রাজবাড়ি

বলিহার জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা নৃসিংহ চক্রবর্তী — মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সনদে তিনি এই এলাকার জায়গির লাভ করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। জায়গিরদার বংশধরেরা পর্যায়ক্রমে গড়ে তোলেন প্রাসাদ, মন্দির আর অসংখ্য দীঘি। ১৮২৩ সালে জমিদার রাজেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করেন রাজ-রাজেশ্বরী মন্দির — তাতে স্থাপন করেন দেবীর খ্যাতনামা পিতলের মূর্তি (বাংলা উইকিপিডিয়া/আদার ব্যাপারী)। বলিহারের রাজাদের অনেকে ছিলেন উচ্চশিক্ষিত: রাজা কৃষ্ণেন্দ্রনাথ রায় বাহাদুর ছিলেন লেখকও ("কৃষ্ণেন্দ্র গ্রন্থাবলী"-র রচয়িতা), শখে প্রাসাদে ছোট একটি চিড়িয়াখানাও রেখেছিলেন — বাঘ, ভালুক, হরিণসহ নানা প্রাণীর সংগ্রহ ছিল তাতে (স্থানীয় পোর্টাল)। এই অঞ্চলে বলিহারের নয় চাকার রথ ছিল প্রসিদ্ধ (আদার ব্যাপারী)। দেশভাগের সময় শেষ রাজা বিমেলেন্দু রায় ভারতে চলে গেলে জমিদারির অবসান ঘটে; ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজবাড়ির মূল্যবান নিদর্শন, আসবাবপত্র, জানালা-দরজা পর্যন্ত লুট হয়ে যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

প্রাঙ্গণে যা দেখবেন

প্রবেশেই প্রকাণ্ড তোরণ (সিংহদুয়ার) — আজও অনেকটাই অটল শক্তিতে দাঁড়িয়ে (আদার ব্যাপারী)। ভেতরে দোতলা জমিদার বাড়ি, নাটমন্দির, রাজরাজেশ্বরী মন্দির আর জোড়া শিব মন্দির — মন্দিরগুলোর দেয়ালের সূক্ষ্ম কারুকাজ ও রিলিফ এখন অনেকটাই অস্পষ্ট ও ভাঙা হলেও গড়ন বোঝা যায় (ভ্রমণপ্রিয়/আদার ব্যাপারী)। প্রাসাদের পেছনে মালিপাড়ায় পাশাপাশি দুটি বিশাল শিবলিঙ্গও আছে। কিংবদন্তির আরেক অধ্যায় জমিদারির ৩৩০টি দীঘি ও পুকুর — নামগুলোই কবিতার মতো: মালাহার, সীতাহার, বলিহার, অন্তাহার; হাতে গোনা কয়েকটি আজও টিকে আছে (ভ্রমণপ্রিয়)।

বর্তমান অবস্থা — সৎ ছবি

স্পষ্ট করে বলা ভালো: রাজবাড়ির প্রধান ভবনগুলো এখন পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ — কিছুদিন আগ পর্যন্ত একটি ভবন স্থানীয় স্কুলের শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন সম্পূর্ণ অব্যবহৃত (ভ্রমণপ্রিয়)। তবে দেবালয়ে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নিয়মিত পূজা-অর্চনা চলে, আর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরদারিতে এটি একটি সংরক্ষিত প্রত্নস্থল (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পাশের দুবলহাটি জমিদার বাড়ির তুলনায় বলিহারের অবস্থা তুলনামূলক ভালো বলা যায় (স্থানীয় পোর্টাল) — তবু জৌলুস আশা করে নয়, ইতিহাসের টানে যাওয়ার জায়গা এটি।

নওগাঁ শহর: ভ্রমণের ভিত্তি

জেলা শহর নওগাঁ এই অঞ্চলের যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার কেন্দ্র — বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে সবদিকের বাস মেলে, শহরে আবাসিক হোটেল ও খাবারের দোকান পর্যাপ্ত (ভ্রমণপ্রিয়)। জেলাটি আজ ধান ও আমের উৎপাদনে দেশের অগ্রণী সারিতে — আমের মৌসুমে মহাদেবপুর-পোরশার বাজারে জমজমাট ভিড় হয় (ভিডিও প্রতিবেদন)। শহরের কাছেই আরেক ধ্বংসপ্রায় জমিদারবাড়ি দুবলহাটি — সময় থাকলে সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যায়।

যাতায়াত ও পরিকল্পনা

ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে নওগাঁ; বালুডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে রাজশাহীগামী বাসে বা স্থানীয় যানে বলিহার (বলিহার কলেজের উত্তর পাশে রাজবাড়ি, ভ্রমণপ্রিয়)। অর্ধদিনের পরিকল্পনা: সকালে বলিহার, দুপুরে শহরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া; অন্য অর্ধে কুসুম্বা বা পরের দিন পাহাড়পুর। প্রাঙ্গণে কাঁটা-ঝোপ ও ভাঙা ইটের স্তূপ আছে — সাবধানে হাঁটুন, দুর্বল ছাদ-বারান্দায় উঠবেন না।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বলিহার জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা কে?

নৃসিংহ চক্রবর্তী — আওরঙ্গজেবের সনদে জায়গির পান (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

রাজরাজেশ্বরী মন্দির কবে প্রতিষ্ঠিত?

১৮২৩ সালে, জমিদার রাজেন্দ্রনাথ কর্তৃক (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

জমিদারিতে কটি পুকুর ছিল?

জনশ্রুতি ও লেখ্য সূত্রে ৩৩০টি — মালাহার, সীতাহার প্রভৃতি নামে (ভ্রমণপ্রিয়)।

রাজবাড়ির বর্তমান অবস্থা কেমন?

ভবনগুলো পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ; তবে মন্দিরে পূজা চলে এবং স্থলটি সংরক্ষিত।

নওগাঁ শহর থেকে দূরত্ব কত?

প্রায় ১৮ কিলোমিটার পশ্চিমে, নওগাঁ–রাজশাহী সড়কের পাশে (আদার ব্যাপারী)।

শেষকথা

বলিহার রাজবাড়ি দেখতে গিয়ে হতাশ হবেন না — কারণ এর মূল্য জৌলুসে নয়, গল্পে: আওরঙ্গজেবের সনদ, পিতলের রাজেশ্বরী, লেখক-রাজার গ্রন্থ আর ৩৩০ পুকুরের নামকাব্য। ধ্বংসাবশেষের ভিড়ে এই গল্পগুলোই প্রাসাদটাকে আবার জীবন্ত করে তোলে।