ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে মাত্র ~১৫ কিলোমিটার উত্তরে সরাইল — বাইরে থেকে শান্ত জনপদ, কিন্তু বাংলার ইতিহাসের একটা ভাঁজ এখানেই লুকিয়ে আছে। ষোড়শ শতকে বারো ভূঁইয়ার সর্দার ঈসা খাঁ তাঁর প্রথম ও সাময়িক রাজধানী করেছিলেন এই সরাইলকে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া—সরাইল উপজেলা); মুঘল আমলে সরাইল ছিল সিলেট সরকারের একটি মহাল। সেই গর্বিত অতীতের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ, পুল আর এক জোড়া অদ্ভুত প্রাণীর খ্যাতি।
আড়িফাইল মসজিদ (১৬৬২)
সরাইল সদর থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে, আরিফাইল গ্রামে বিশাল সাগরদিঘীর দক্ষিণ পাড়ে — দীর্ঘায়ত এই মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত সংরক্ষিত স্থাপনা। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী ১৬৬২ সালে দরবেশ শাহ আরিফ এটি নির্মাণ করেন, নাম তাঁর নাম থেকেই; স্থানীয়রা ডাকেন ‘আইড়ল মসজিদ’ (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
স্থাপত্যের বিবরণ (প্রত্নতত্ত্ব-ভিত্তিক উৎস):
- আয়তন ২৪.৩৮ × ৯.৩০ মিটার (~৮০ × ৩১ ফুট), দেয়াল ~১.৬ মিটার পুরু; উচ্চতা ~৮ মিটার।
- ছাদে তিনটি গম্বুজ — গম্বুজে পদ্ম-অলংকরণ; চার কোণে অষ্টভুজ বুরুজ (মিনার-আকৃতির টাওয়ার) যার চূড়ায় পাঁজরযুক্ত গম্বুজ।
- প্রবেশপথ মোট পাঁচটি — পূর্বে তিনটি, উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে; বাইরের দেয়ালে চারকোণা খোপের কারুকাজ।
- ভেতরের পালিশ করা মেঝে-দেয়াল-গম্বুজে শব্দের এক অসাধারণ প্রতিধ্বনি-ব্যবস্থা কাজ করে বলে বর্ণনা আছে — এক কোণে কথা বললে অন্য কোণে সমান স্পষ্ট শোনা যেত।
- মসজিদের কাছেই কয়েকটি অজ্ঞাত সমাধি — জনশ্রুতিতে সেগুলো ঈসা খাঁর স্ত্রীদের বলে ধারণা করা হয় (সরাইল উপজেলা নিবন্ধ)।
মসজিদটি এখনো সক্রিয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংস্কার হয়েছে (আদার ব্যাপারী)। সাগরদিঘীর পাড়ে বসে বিকেলের হাওয়া আর পাশে সাড়ে তিনশ বছরের মসজিদ — সময়যাপনের জন্য এর চেয়ে ভালো মিশ্রণ কমই আছে। দর্শনবিধি আগেরগুলোর মতোই: পরিমিত পোশাক, নামাজের সময় নীরবতা, অনুমতি ছাড়া ভেতরে ছবি নয়।
হাতিরপুল, বারিউড়া: হাতি পারাপারের পুল
সরাইলের আরেক মুঘল সাক্ষী হাতিরপুল (বারিউড়া পুরনো পুল)। ১৬৫০ সালে দেওয়ান শাহবাজ খানের দেওয়ানি আমলে খালের ওপর নির্মিত এই পুল দিয়ে চলাচল করত হাতি — মুঘল দেওয়ানরা এই পথে হাতিতে যাতায়াত করতেন এবং পুলের কাছে বিশ্রাম নিতেন (সরাইল উপজেলা নিবন্ধ)। জরাজীর্ণ হলেও পুলটি আজও এলাকার সবচেয়ে উদ্ধৃত ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর একটি; পাশেই দেওয়ান শাহবাজের ঐতিহাসিক কূপের কথাও তালিকায় আছে (বাংলা উইকিভ্রমণ)।
সরাইল হাউন্ড: হাতির বদলে আনা কুকুর
সরাইলের সবচেয়ে বিখ্যাত ‘বাসিন্দা’ কোনো মানুষ নয় — একজাতের কুকুর। সরাইল হাউন্ড দেশের একমাত্র নিজস্ব গ্রে-হাউন্ড ধাঁচের শিকারি কুকুর; লম্বাটে, ক্ষীণকায় কিন্তু অসাধারণ ক্ষিপ্র এই কুকুর লাফিয়ে উড়ন্ত পাখি পর্যন্ত ধরতে পারে বলে ডেইলি স্টারের বিখ্যাত ফিচার (‘প্রাইড অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া’) লিখেছে। উৎপত্তির কিংবদন্তিটা সিনেমার মতো: সরাইলের এক দেওয়ান হাতির কাফেলা নিয়ে কলকাতা যাওয়ার পথে এক ইংরেজের অসাধারণ কুকুর দেখে একটি হাতির বিনিময়ে কুকুরটি নেন; সেই মাদী কুকুর শিকারে বনে হারিয়ে ফিরে আসে গর্ভবতী হয়ে — বাচ্চাগুলোই নাকি সরাইল হাউন্ডের পূর্বপুরুষ (শিয়াল/নেকড়ের সঙ্গে মিলনের জনশ্রুতিসহ)। গবেষকদের মতে জাতটি আরবি শিকারি কুকুর, ইংরেজ গ্রে-হাউন্ড ও দেশি বন্য কুকুরের সংমিশ্রণ (বাংলা উইকিভ্রমণ)। জেনারেল ওসমানীর দুটি সরাইল হাউন্ড ছিল; পরবর্তীতে র্যাব-পুলিশের ডগ স্কোয়াডেও জাতটি নেওয়া হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। দুঃখের খবর — সংরক্ষণের একাধিক উদ্যোগ (২০০১ ও ২০০৬-এর প্রচেষ্টা) ব্যর্থ হওয়ায় জাতটি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে; গ্রামে ঘুরলে কদাচিৎ দু-একটি খাঁটি হাউন্ড দেখা সৌভাগ্য হিসেবে ধরুন।
আসিল (হাসলি) মোরগ: ৪০০ বছরের শখ
আরেক জীবন্ত ঐতিহ্য — লড়াকু আসিল/হাসলি মোরগ। জনশ্রুতি বলছে, ষোড়শ শতকে (মতান্তরে ~৪০০ বছর আগে) সরাইল পরগনার জমিদার পরিবার ইরান থেকে এই জাত আনেন (টিবিএস); আরেক মতে মুঘল আমলে আসে রায় বেরেলি থেকে। লম্বা পা-গলা, সাড়ে পাঁচ-ছয় কেজি পর্যন্ত ওজনের এই ‘যুদ্ধবাজ’ মোরগগুলোর দাম পাঁচ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে; জেলায় প্রায় একশ পরিবার — বেশিরভাগই সরাইলের — এগুলো পালন করেন। লড়াইয়ের ভরা মৌসুম জানুয়ারি–এপ্রিল (টিবিএস) — এই সময়ে সরাইলে গেলে ঐতিহ্যের আসল রূপরেখাটা চোখে পড়বে। শখের এই সংস্কৃতিকে দেখুন স্থানীয় ঐতিহ্যের নথি হিসেবেই — দর্শনার্থী হিসেবে দূর থেকে দেখা ও গল্প শোনাটাই এখানে যথেষ্ট।
আরও যা আছে ও কীভাবে যাবেন
সরাইল সদরের আশপাশে আরও আছে সরাইল শাহী জামে মসজিদ, হাটখোলা (আরফান নেছা) মসজিদ, ১৯৭১-এ শহীদ ৭১ জন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিসৌধ এবং কালিকচ্ছের দয়াময় আনন্দধাম (বাংলা উইকিভ্রমণ-তালিকা) — একদিনের ভ্রমণে সবগুলো মিলিয়ে নেওয়া যায়। সরাইল বসে আছে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের গায়ে: ঢাকা থেকে ~৮০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে (ডেইলি স্টার), ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে বাস/সিএনজিতে সহজ। যাতায়াতের সুবিধায় সরাইল-আখাউড়া-জেলা শহর — তিনটি মিলে সাজান দুই দিনের ইতিহাস-ভ্রমণ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঈসা খাঁর রাজধানী কি সত্যিই সরাইলে ছিল?
ইতিহাস-সূত্রে সরাইলকে তাঁর ‘প্রথম ও সাময়িক রাজধানী’ বলা হয়েছে; মূখ্য কেন্দ্র পরে সোনারগাঁও অঞ্চলে সরে যায়।
আড়িফাইল মসজিদে নামাজ হয়?
হ্যাঁ, এটি সক্রিয় মসজিদ এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনাও।
সরাইল হাউন্ড কিনতে/দেখতে পাওয়া যাবে?
খাঁটি জাত এখন দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায়; বিক্রির উদ্দেশ্যে নয় — স্থানীয়দের কাছে খোঁজ নিলে কদাচিৎ দেখা মিলতে পারে।
শেষকথা
রাজধানীর গৌরব, মুঘল স্থাপত্য আর দুটি বিরল প্রাণীর কিংবদন্তি — সরাইল ছোট শহর হলেও গল্পে বিশাল। জেলার বাকি দুই অধ্যায় মিলিয়ে পড়ুন — আখাউড়া: বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতি ও গঙ্গাসাগর — তাহলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ত্রিভুজ পূর্ণ হবে।