• 29 Oct, 2026

মোহনপুর, মতলব উত্তর: মেঘনার পাড়ে ‘মিনি কক্সবাজার’ পর্যটন কেন্দ্র

মোহনপুর, মতলব উত্তর: মেঘনার পাড়ে ‘মিনি কক্সবাজার’ পর্যটন কেন্দ্র

চাঁদপুরের মতলব উত্তরের মোহনপুর পর্যটন কেন্দ্রের গাইড — মেঘনার পাড়ে ৬০ একরের কৃত্রিম বালুকাবেলা ‘মিনি কক্সবাজার’, রিসোর্ট-থিম পার্ক-রিভার ক্রুজ, প্রবেশ ফি ও সময়, চরের আসল ‘মিনি কক্সবাজারের’ সঙ্গে পার্থক্য আর নিরাপত্তা পরামর্শসহ।

সমুদ্র নয়, নদী — তবু বালুর বিচ, বিচ বেড, সূর্যাস্ত। চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার মোহনপুরে মেঘনার পাড়ে গড়ে উঠেছে এমনই এক পরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্র, যার ডাকনাম ‘মিনি কক্সবাজার’। তিন নদীর মোহনা যেখানে নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্য, মোহনপুর সেখানে সাজানো-গোছানো রিসোর্ট-অভিজ্ঞতা — দুটোই চাঁদপুরে, চরিত্রে সম্পূর্ণ আলাদা।

জায়গাটা কেমন

মোহনপুর পর্যটন কেন্দ্র বিস্তৃত প্রায় ৬০ একর জায়গাজুড়ে (ভ্রমণগাইড/আইসিটি ওয়ার্ল্ড নিউজ)। মেঘনার পাড়কে কৃত্রিমভাবে সৈকতের আদলে সাজানো হয়েছে — বালুকাবেলা, সারিবদ্ধ বিচ বেড, ঝাউ-বনায়ন আর সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জা। পরিচালনায় মোহনপুর পারজাতান লিমিটেড; প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের দাবি করে দেশের একমাত্র মিঠা পানির বিচ ও প্রথম মেঘনা-মুখী রিভার-ভিউ রিসোর্ট হিসেবে (প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা)। মূল ফটকে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ইলিশের ভাস্কর্য — ‘ইলিশের বাড়ি’ চাঁদপুরের পরিচয় জানান দিয়ে। এখানকার বড় সুবিধা: একই বিচ থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়, আর পাড়ে বসে চোখে পড়ে সদরঘাট থেকে ছেড়ে আসা বরিশালগামী লঞ্চের যাতায়াত।

কী কী আছে

  • রিসোর্ট ও থাকা: ~৩০টি কক্ষসহ রিসোর্ট ভবন, কটেজ, রেস্টুরেন্ট ও বিবিকিউ কর্নার, কনফারেন্স/ব্যাংকোয়েট সুবিধা (ট্রিপঅ্যাডভাইজর তালিকা) — রাত কাটিয়ে ভোরের নদী দেখার সুযোগ।
  • থিম পার্ক: ফ্যামিলি ট্রেন, ওয়ান্ডার হুইলসহ নানা রাইড, কিডস জোন — শিশুদের জন্য দিনের বড় অংশ কেটে যায় এখানেই (ভ্রমণগাইড)।
  • পানি ও নদী: সুইমিং পুল, স্পিডবোট ও নৌকাভ্রমণ, বিচ ভলিবল।
  • রিভার ক্রুজ প্যাকেজ: গ্রুপ অনুযায়ী কাস্টমাইজ করা যায়; প্রচারিত তালিকায় ইকোনমি ১,৫০০ টাকা থেকে ভিআইপি কেবিন ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত প্যাকেজ আছে (আইসিটি ওয়ার্ল্ড নিউজ) — দাম সিজনভেদে বদলায়, যাওয়ার আগে হটলাইনে নিশ্চিত হোন।
  • খাওয়া: কেন্দ্রের রেস্টুরেন্ট ছাড়াও পাড়ে ভ্রাম্যমাণ ফুচকা-চটপটি আর চা-মুড়ির দোকান — সন্ধ্যার আড্ডার আসল স্বাদ সেখানেই।

সময়, ফি ও বর্তমান অবস্থা

গাইড-তথ্য অনুযায়ী কেন্দ্রটি প্রতিদিন সকাল ৯টা–রাত ৮টা খোলা থাকে, প্রবেশ ফি ১০০ টাকা; বিচ বেড ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া মেলে (সূত্রে ~৩০ টাকা উল্লেখ আছে — বদলাতে পারে)। সম্প্রসারণের কাজ — রাস্তা, বনায়ন, রেস্টুরেন্ট — ধাপে ধাপে চলছে; এক সাম্প্রতিক গাইডের ভাষ্যে কেন্দ্রের কিছু কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ থাকার কথাও আছে (ভ্রমণগাইড), তাই কোন কোন সুবিধা চলছে, যাওয়ার আগে ফোনে জেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

‘দুটো মিনি কক্সবাজার’ — বিভ্রান্তি দূর করি

চাঁদপুরে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে দুটো আলাদা জায়গা পরিচিত, গুলিয়ে ফেলবেন না:

  • মোহনপুর (এই লেখার জায়গা): মতলব উত্তরে, মূল ভূখণ্ডের পাড়ে পরিকল্পিত রিসোর্ট-বিচ — সড়কপথে সরাসরি পৌঁছানো যায়।
  • রাজরাজেশ্বর/বালুর চর: চাঁদপুর শহরের কাছে মোহনায় ওঠা প্রাকৃতিক বালুর চর (উইকিপিডিয়ায় ‘মিনি কক্সবাজার, চাঁদপুর’ নামে তালিকাভুক্ত) — মোলহেড থেকে ট্রলারে ~১.৫ কিলোমিটার; ঈদের ছুটিতে সেখানে দিনে হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের খবর পত্রিকায় এসেছে।

দুটো অভিজ্ঞতা আলাদা — সাজানো সুবিধা চাইলে মোহনপুর, খাঁটি চরের অনুভূতি চাইলে বালুর চর।

নিরাপত্তা: নদী মানেই সতর্কতা

এটা মিঠা পানির নদী হলেও মেঘনা বিশাল ও স্রোতস্বিনী। স্থানীয় গাইডদের সতর্কতা সোজা: জোয়ারের সময় ও ঝড়ো আবহাওয়ায় পানিতে নামবেন না, পাড়ের কাছাকাছি থাকুন, চ্যালেঞ্জ করে গভীরে যাবেন না, নৌকায় লাইফ জ্যাকেট ছাড়া উঠবেন না, আর বড় ঢেউ এলে পাড়ে উঠে আসুন (কুহুডাক—মেঘনা গাইড)। শিশুদের ক্ষেত্রে তদারকি অপরিহার্য।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে দূরত্ব ~১০৮ কিলোমিটার। সড়কপথ: ঢাকা–দাউদকান্দি হয়ে মতলব; চাঁদপুর শহর থেকেও মতলব হয়ে সিএনজি/অটোরিকশায় মোহনপুর পর্যটন কেন্দ্র — সংলগ্ন মোহনপুর লঞ্চঘাট, তাই লঞ্চপথেও (চাঁদপুর/ঢাকা রুটের নির্দিষ্ট লঞ্চ থামে কিনা আগে যাচাই করুন) আসা সম্ভব। সেরা পরিকল্পনা: দুপুরে পৌঁছে থিম পার্ক ও পাড়ের আড্ডা, বিকেলে বিচে সূর্যাস্ত, চাইলে রিসোর্টে রাত কাটিয়ে ভোরের সূর্যোদয়।

একদিনের নমুনা ভ্রমণসূচি

  • সকাল: ঢাকা বা চাঁদপুর থেকে রওনা দিয়ে দুপুরের আগেই পৌঁছান; ঢুকেই ফটকের ইলিশ-ভাস্কর্যের সামনে ছবি, তারপর পাড় ধরে হেঁটে পুরো কেন্দ্রটা চেনা।
  • দুপুর: কেন্দ্রের রেস্টুরেন্টে খাওয়া (ইলিশের পদ থাকলে অবশ্যই চেখে দেখুন) — খানিক বিশ্রাম বিচ বেডে, শিশুরা থিম পার্কে।
  • বিকেল: স্পিডবোট/নৌকায় মেঘনার বুকে ছোট্ট ভ্রমণ (জোয়ারের অবস্থা জেনে), পাড়ে ফুচকা-চটপটি, আর দিনের সেরা মুহূর্ত — বালুকাবেলা থেকে সূর্যাস্ত।
  • সন্ধ্যার পর: আলোকসজ্জিত বিচে আড্ডা; রাত কাটালে ভোরে উঠে সূর্যোদয় দেখে তবেই ফেরার পথ।

আশপাশের স্বাদ: মতলবের ক্ষীর

মতলব এলাকায় এলে মিষ্টিপ্রেমীদের জন্য বাড়তি টান স্থানীয় বিখ্যাত ক্ষীর — জেলা পরিচিতিতে মতলবের ক্ষীরের নাম আসে চাঁদপুরের বিখ্যাত খাবারের তালিকায় (শিক্ষক বাতায়ন)। মোহনপুর থেকে ফেরার পথে মতলব বাজারের মিষ্টির দোকানে খোঁজ করলেই মিলবে — ঘন, সর-ভরা এই ক্ষীর নদীভ্রমণের মিষ্টি সমাপ্তি।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

প্রবেশ ফি কত?

গাইড-তথ্যে ১০০ টাকা; রাইড, বেড ও ক্রুজের খরচ আলাদা — যাওয়ার আগে নিশ্চিত হোন।

রাত কাটানো যায়?

হ্যাঁ, রিসোর্টে ~৩০টি কক্ষ আছে (ট্রিপঅ্যাডভাইজর) — ছুটির দিনে আগে বুকিং করুন।

সাঁতার/গোসল করা যাবে?

বিচে নদীর পানিতে নামার চল আছে, তবে স্রোত-জোয়ার সম্পর্কে স্থানীয়দের পরামর্শ মেনে, পাড়ের কাছেই থাকুন; পুলও আছে।

মোহনপুর আর বালুর চর কি একই জায়গা?

না — মোহনপুর মতলব উত্তরের রিসোর্ট-বিচ; বালুর চর চাঁদপুর শহরের কাছের প্রাকৃতিক চর।

শেষকথা

চাঁদপুর ভ্রমণ মানে এখন শুধু মোহনা আর ইলিশ নয় — মোহনপুরে নদীতীরের সাজানো বিচ-ছুটিও তার অংশ। আর আসল সাগর-সৈকতের টানে মন ছুটলে পরের গন্তব্য হোক কক্সবাজারের সেরা ৫ জায়গা — নামটা যার থেকে ধার করা, সেই আসল ঠিকানা।