সিলেট সিরিজে আমরা আরেকটি জাতীয় উদ্যান দেখেছি — শহরঘেঁষা খাদিমনগর। এবারেরটির চরিত্র গভীর বনের: হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে রঘুনন্দন পাহাড়ের গায়ে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান — ভোরে বনে ঢুকলেই কানে আসবে উল্লুকের দূরাগত হুইহুই ডাক, আর মাটিতে ছড়িয়ে থাকবে সাতটি পাহাড়ি ছড়ার কলকল শব্দ।
পরিচিতি ও ইতিহাস
- ঘোষণা: ১৯৭৪-এর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতায় ২০০৫ সালের ১৫ অক্টোবর, ২৪৩ হেক্টর (৬০০ একর) এলাকা নিয়ে জাতীয় উদ্যান ঘোষিত (বাংলা উইকিপিডিয়া/শিক্ষক বাতায়ন-তথ্য)। আইইউসিএন শ্রেণি-২ জাতীয় উদ্যান।
- নাম: বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাতটি পাহাড়ি ছড়া থেকেই ‘সাতছড়ি’। আগের নাম ছিল রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট — ১৯১৪ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে তালিকাভুক্ত; তার আগে জুম চাষে বন প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল, বিংশ শতকের শুরু থেকে কাঠের জন্য পরিকল্পিত রোপণে বন আবার দাঁড়ায় (বিডিনিউজ)।
- বনের ধরন: ক্রান্তীয় মিশ্র চিরহরিৎ বন — ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইন্দো-চীন জীব-অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত বলে জীববৈচিত্র্যে বিশেষ সমৃদ্ধ (পর্যটন বোর্ড)।
বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ
- মোট প্রায় ১৯৭ প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান মিলেছে — এর মধ্যে পাখি ১৪৯ প্রজাতি, স্তন্যপায়ী ২৪, সরীসৃপ ১৮ ও উভচর ৬ প্রজাতি (বিডিনিউজ)। পাখির মধ্যে ফিঙে, কাঠঠোকরা, মথুরা, বনমোরগ, ধনেশ, লাল ট্রগন, বনপেঁচা উল্লেখযোগ্য।
- স্তন্যপায়ীদের তারকা উল্লুক (দেশে বিলুপ্তপ্রায় গিবন) — ভোরে এর ডাকই বনের সেরা অভিজ্ঞতা। আরও আছে মুখপোড়া হনুমান, চশমা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, কুলু বানর, মায়া হরিণ, বন্য শূকর, মেছো বাঘ, বনবিড়াল, গন্ধগোকুল (বিডিনিউজ)।
- গাছপালা ২০০-এর বেশি প্রজাতি — শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, কৃষ্ণচূড়া, ডুমুর, বাঁশ-বেতসহ (উইকিপিডিয়া)। প্রজাপতির জন্যও বনটি পরিচিত — জুয়েলড নবাবের মতো রঙিন প্রজাতি চোখে পড়ে।
ট্রেইল, টিপরা পাড়া ও চা বাগান
- তিনটি হাঁটা-পথ:আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার ট্রেইল (বিডিনিউজ)। বনের ভেতরে নির্দেশিকা প্রায় নেই — দীর্ঘ ট্রেইলে পথ ভুলের আশঙ্কা থাকে বলে তথ্য কেন্দ্র থেকে গাইড নেওয়া উচিত; গাইড ফি ট্রেইলভেদে ~২০০–৫০০ টাকা (আদার ব্যাপারী)।
- টিপরা পাড়া: উদ্যানের ভেতরেই তিপরা (ত্রিপুরা) জনগোষ্ঠীর গ্রাম — ২০০৭-এর হিসেবে ২৪টি পরিবার; তাঁদের জীবনযাপন বনের সঙ্গে বোনা। অনুমতি ও শ্রদ্ধা রেখে পাড়া ঘুরে দেখুন।
- চারদিকে চা বাগান: কাছাকাছি ৯টি চা বাগান — পশ্চিমে সাতছড়ি চা বাগান, পূর্বে চাকলাপুঞ্জি (উইকিপিডিয়া)। বন-ভ্রমণের পরের ঘণ্টাটা কোনো বাগানের সবুজ ঢালে বরাদ্দ রাখুন। সাতটি ছড়ার সবগুলোতে আগের মতো পানি থাকে না — কয়েকটি ধারা এখন কেবল বর্ষায় জাগে (বিডিনিউজ) — এই নামগল্পটা জানা থাকলে প্রত্যাশা ঠিক থাকে।
যাওয়া ও খরচ
- ঢাকা থেকে: সিলেটগামী বাসে মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া (মুক্তিযোদ্ধা চত্বর) নেমে ম্যাক্সি/সিএনজিতে সরাসরি সাতছড়ি — সবচেয়ে সুবিধাজনক পথ (ভ্রমণগাইড)। ট্রেনে এলে শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশন (পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী, উপবন এক্সপ্রেস) নেমে সিএনজিতে চুনারুঘাট হয়ে উদ্যান। বিকল্পে হবিগঞ্জ শহর হয়েও আসা যায়। ঢাকা থেকে শায়েস্তাগঞ্জ বাসভাড়া ~৫৩০–১,০০০ টাকা (ভ্রমণগাইডের তথ্য, যাত্রার আগে হালনাগাদ দেখুন)।
- দূরত্ব: ঢাকা থেকে সড়কে ~১৩০ কিমি; শ্রীমঙ্গল থেকে ~৬০ কিমি — মৌলভীবাজারের চা-সার্কিটের সঙ্গে একই ট্রিপে মেলানো যায় সহজে।
- প্রবেশ: বন বিভাগের নির্ধারিত টিকিটে প্রবেশ; সর্বশেষ ফি তথ্য কেন্দ্রে যাচাই করুন। উদ্যানের চারপাশের গ্রামগুলোর অনেক মানুষ বনসম্পদের ওপর নির্ভরশীল — আবর্জনা বনে ফেলবেন না, এটি শুধু নিয়ম নয়, দায়িত্বও।
কখন যাবেন
শীতকাল (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) ট্রেইল শুকনো ও বন্যপ্রাণী দেখার সম্ভাবনা বেশি; বর্ষায় বন সবচেয়ে সবুজ-জীবন্ত হলেও ছড়ার স্রোত, পিচ্ছিল পথ আর জোঁকের উপদ্রব মাথায় রাখতে হবে — লবণ/জোঁক-প্রতিরোধী প্রস্তুতি ও ট্রেকিং জুতা নিন। উল্লুকের ডাক শুনতে ভোরবেলায় পৌঁছানোই কৌশল।
একদিনের নমুনা সূচি
- ভোর ৬টা: প্রবেশ করে এক ঘণ্টার ট্রেইল — উল্লুকের ডাক ও পাখির ভোর।
- সকাল ৯টা: টিপরা পাড়া ঘুরে তিন ঘণ্টার ট্রেইলে আগ্রহীরা এগিয়ে যান; বাকিরা ছড়ার পাড়ে বিশ্রাম।
- বিকেল: পাশের চা বাগানে সূর্যাস্তের সবুজ; সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল/শায়েস্তাগঞ্জ ফেরা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
উল্লুক দেখা কি নিশ্চিত?
না — বন্যপ্রাণী দেখা ভাগ্যের ব্যাপার; তবে ভোরে বনে থাকলে ডাক শোনা প্রায় নিশ্চিত, দেখা মিলতেও পারে গাইডের দক্ষতায়।
গাইড ছাড়া যাওয়া যাবে?
ছোট ট্রেইল সম্ভব, কিন্তু ভেতরে নির্দেশিকা নেই বলে গাইড নেওয়াই নিরাপদ — ফিও সামান্য।
শিশুদের জন্য উপযুক্ত?
আধা ঘণ্টার ট্রেইল পরিবারের জন্য ঠিক আছে; দীর্ঘ ট্রেইল ছোটদের জন্য ক্লান্তিকর হতে পারে।
শেষকথা
সাতছড়ি প্রমাণ করে — ২৪৩ হেক্টরের ছোট্ট বনও রক্ষা পেলে গিবনের ডাক বাঁচিয়ে রাখতে পারে। হবিগঞ্জের পরের পোস্টে আরও বড় বনের গল্প (রেমা-কালেঙ্গা); চা-বাগানের ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে পড়ুন মালনীছড়া-লাক্কাতুরা।