বিরিশিরির চিনামাটির পাহাড়ের পায়ের কাছ দিয়েই বয়ে গেছে দুর্গাপুরের প্রাণ — সোমেশ্বরী নদী। বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে এটি ব্যতিক্রম: পলির ঘোলা জল নয়, পাহাড় থেকে নেমে আসা কাঁচের মতো স্বচ্ছ স্রোত, পায়ের নিচে বালু আর নুড়ি দেখা যায়। কিন্তু এই গাইড শুধু সৌন্দর্যের নয় — গত এক যুগে এই নদী বালু-লুণ্ঠনে প্রায় মরতে বসেছিল; এখন আদালতের নির্দেশে সে ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। দুটো গল্পই এখানে।
সীমসাং থেকে সোমেশ্বরী: নদীর পরিচয়
সোমেশ্বরীর জন্ম মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে — বিঞ্চুরীছড়া ও বাঙাছড়ার ঝরনাধারা আর পশ্চিম থেকে আসা রমফা নদীর স্রোত এক হয়ে এর সৃষ্টি (বাংলা উইকিপিডিয়া; প্রথম আলো)। আদি নাম ছিল 'সিমসাং'; প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী ৬৮৬ বঙ্গাব্দে সোমেশ্বর পাঠক নামের একজন এই অঞ্চল দখল করে নেওয়ার পর থেকে নদীর নাম হয় সোমেশ্বরী (প্রথম আলো)। বাঘমারা বাজার হয়ে রাণীখং পাহাড়ের পাশ দিয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে; বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য ৫০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১১৪ মিটার, পাউবোর নদী নম্বর ৮৫ (বাংলা উইকিপিডিয়া; রদ্দুরে)। দুর্গাপুর সদরের কাছে নদী দুটি শাখায় ভাগ হয় — মূল ধারা পূর্ব দিকে গিয়ে ভোগাই-কংসে মেশে, অন্য শাখা বাঁকহারা কলমাকান্দা হয়ে এগিয়ে যায় (রদ্দুরে)। ১৯৬২ সালের পাহাড়ি ঢলে নদী নতুন গতিপথ তৈরি করে — 'শিবগঞ্জ ঢালা' নামে পরিচিত সেই ধারাই আজকের মূল স্রোত (বাংলা উইকিপিডিয়া)। নদীটি বারোমাসি, তবে উৎসের দিকে মূলধারা বর্ষা ছাড়া প্রায় শুকনো থাকে।
স্বচ্ছ জল আর সিলিকা বালুর চর
শীতকালে সোমেশ্বরীর জল কমে এলে হাঁটু-পানিতে নেমে বালুচর ধরে হাঁটার অভিজ্ঞতাটাই এখানকার সেরা স্মৃতি (আদার ব্যাপারী)। বিরিশিরি সেতুতে দাঁড়ালে একদিকে গারো পাহাড়ের সারি, অন্যদিকে স্বচ্ছ স্রোত (প্রথম আলো)। বর্ষায় রূপ উল্টো: পাহাড়ি ঢলে নেমে আসে প্রবল স্রোত, সঙ্গে বয়ে আনে বালু, নুড়িপাথর আর কয়লা — এই বালুই এখানকার মানুষের জীবিকা, কারণ নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত উন্নতমানের সিলিকা বালু এটি (প্রথম আলো)। দুর্গাপুর বাজার থেকে রিকশা-মোটরসাইকেলে নদী পেরিয়ে গারো পাহাড়, গোলাপি পাহাড় আর লেক ঘোরার ব্যবস্থা আছে (আদার ব্যাপারী)। সতর্কতা: বর্ষায় হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামতে পারে — আবহাওয়া ও স্থানীয়দের পরামর্শ ছাড়া বর্ষায় নদীতে নামবেন না।
বালুর অভিশাপ: এক যুগের লুণ্ঠন
এই সিলিকা বালুই নদীর সর্বনাশ ডেকে আনে। বিজয়পুর-ভবানীপুর থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার ভাটিতে ঘোষিত পাঁচটি বালুমহালে নিয়ম ভেঙে এবং শত শত অবৈধ ড্রেজারে প্রায় এক যুগ ধরে যত্রতত্র বালু-পাথর তোলা হয়েছে (বণিক বার্তা; প্রথম আলো)। শাখা নদী আত্রাখালীর মুখ আটকে ট্রাকের রাস্তা বানানোয় ~২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সেই নদী এখন 'শুধু নামেই নদী', পরিণত হয়েছে মরুভূমিতে (বণিক বার্তা)। ভেজা বালির ট্রাক দিনরাত শহরের রাস্তা কাদা করে দিয়েছিল; ৩১৮ কোটি টাকায় বানানো দুর্গাপুর-শ্যামগঞ্জ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০ সালে বালুবাহী ট্রাকের চাপায় ৪৬ জন (অনেকেই শিক্ষার্থী) প্রাণ হারান। ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয়তে প্রশ্ন ওঠে — হাইকোর্ট নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' ঘোষণা করার পরও কীভাবে একজন সাবেক সাংসদের বিরুদ্ধে ১,০০০ ড্রেজার চালানোর অভিযোগ ওঠে, আর পরিবেশ অধিদপ্তর তা 'জানেই না' বলে।
আদালতের নির্দেশে ধীরে ফিরছে নদী — তবে বিপদ শেষ হয়নি
সুখবরটি সাম্প্রতিক: হাইকোর্টের নির্দেশে গত প্রায় দুই বছর ধরে পাঁচটি বালুমহালের ইজারাসহ উত্তোলন কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে; নদীতে আবার জেলেদের মাছ ধরতে দেখা যাচ্ছে, এমনকি প্রায় বিলুপ্ত মহাশোল মাছ ফিরে আসার দাবিও করছেন বাজারের বিক্রেতারা (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। তবে চিত্র পুরোপুরি পরিষ্কার নয় — বণিক বার্তার সরেজমিন প্রতিবেদনে এখনো কোথাও কোথাও নিয়মভাঙা উত্তোলন ও বালিবাহী ট্রাকের দৌরাত্ম্যের ছবি মিলেছে। আর হাতে বালু তোলার ঝুঁকি রয়েই গেছে: ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এ বিরিশিরি ঘাটে বালু তুলতে গিয়ে নৌকা ডুবে শ্রমিক এমদাদুল হক (৩৫) প্রাণ হারান — তাঁর মা সাঁতরে বেঁচে যান (ডেইলি বাংলাদেশ)। পর্যটকের জন্য শিক্ষা স্পষ্ট: ড্রেজারে খোঁড়া গভীর গর্তে কখনো নামবেন না — বাইরে থেকে অগভীর মনে হলেও নদীতলে অতল খাদ থাকতে পারে।
ভ্রমণ তথ্য
কখন: নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি — জল সবচেয়ে স্বচ্ছ, চরে হাঁটা নিরাপদ তুলনামূলকভাবে; বর্ষায় নদী উত্তাল ও ঢলের আশঙ্কা থাকে। কীভাবে: দুর্গাপুর শহর থেকেই নদীর পাড়ে পৌঁছানো যায়; বিজয়পুর-বিরিশিরির স্পটগুলোর সঙ্গে একই দিনে ঘুরুন (শহরকে ঘাঁটি করে সার্কিট সাজান)। নিরাপত্তা: নদীতে নামলে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করে অগভীর জায়গা বেছে নিন; গর্ত ও স্রোত এড়িয়ে চলুন; সীমান্ত কাছাকাছি — বিজিবির নির্দেশনা মানুন। সম্মান: তীরের গারো-হাজং গ্রামগুলো মানুষের বসতি — অনুমতি ছাড়া ছবি নয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সোমেশ্বরী নদীর উৎপত্তি কোথায়?
মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে — ঝরনাধারা ও রমফা নদীর মিলিত স্রোতে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
নামের ইতিহাস কী?
আদি নাম সিমসাং; সোমেশ্বর পাঠকের নামে সোমেশ্বরী — ৬৮৬ বঙ্গাব্দ থেকে প্রচলিত (প্রথম আলো)।
নদীটি কত লম্বা?
বাংলাদেশ অংশে ৫০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১১৪ মিটার (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
বালু উত্তোলনের বর্তমান অবস্থা কী?
হাইকোর্টের নির্দেশে পাঁচটি বালুমহালের ইজারা ~দুই বছর ধরে স্থগিত (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড); তবে স্থানীয় প্রতিবেদনে বিচ্ছিন্ন নিয়মভাঙার অভিযোগ আছে (বণিক বার্তা)।
নদীতে নামা কি নিরাপদ?
শীতে অগভীর চরে সতর্কভাবে হাঁটা যায়; ড্রেজারের গর্তে নামা বিপজ্জনক — সাম্প্রতিক প্রাণহানিও ঘটেছে (ডেইলি বাংলাদেশ, অক্টোবর ২০২৬)।
সেরা দৃশ্য কোথা থেকে?
বিরিশিরি সেতু থেকে — গারো পাহাড় ও স্বচ্ছ স্রোত একসঙ্গে (প্রথম আলো)।
শেষকথা
সোমেশ্বরী বাংলাদেশের নদী-সংকটের একটা পূর্ণাঙ্গ পাঠ: সৌন্দর্য, লোভ, ধ্বংস, আদালত আর ধীর প্রত্যাবর্তন — সবই এক নদীতে। স্থগিতাদেশ টিকে থাকলে এই স্বচ্ছ জল হয়তো আবার তার পুরোনো রূপ ফিরে পাবে; ভ্রমণকারী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সেই ফেরার পথে বাধা না হওয়া।