বাংলাদেশে খুব কম জাদুঘরই আছে, যা শিল্পী নিজে তাঁর জন্মভূমির টানে গড়ে গেছেন। ময়মনসিংহ শহরের সাহেব কোয়ার্টার এলাকায়, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা — পাশে বাঁধঘেরা সবুজ জয়নুল উদ্যান। শহরের দুই প্রাসাদ — শশী লজ ও আলেকজান্ডার ক্যাসল — দেখার পর এই জুটি ময়মনসিংহ ভ্রমণের সবচেয়ে অর্থবহ অধ্যায়।
ব্রহ্মপুত্রের চরে ছবি আঁকা ছেলেটি
জয়নুল আবেদিনের জন্ম ১৯১৪ সালে; শৈশব-কৈশোর কেটেছে ময়মনসিংহে। স্থানীয় মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের ছাত্র অবস্থায় তিনি বসতেন পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের চরে, আঁকতেন নদী আর গ্রামবাংলা; স্কুলে পড়াকালীনই বম্বে ক্রনিকলের চিত্রপ্রতিযোগিতায় পান প্রথম পুরস্কার (ডেইলি স্টার)। ১৯৩৩ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি; খ্যাতি আসে ১৯৪৩ সালের মহাদুর্ভিক্ষের কালি-কলমের স্কেচ-সিরিজে — ক্ষুধার্ত মানুষের সেই সাদা-কালো ছবিগুলোই তাঁকে পৌঁছে দেয় আন্তর্জাতিক পরিচিতিতে। ১৯৪৭-এর পর ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন (ডেইলি স্টার)। সারা জীবন বিশ্বজুড়ে ঘুরলেও জন্মভূমির টান তাঁর কাটেনি — মৃত্যুর (১৯৭৬) মাত্র বছরখানেক আগে নিজের উদ্যোগেই গড়েন এই সংগ্রহশালা।
সংগ্রহশালা: ১৯৭৫ থেকে জাতীয় জাদুঘরের শাখা
১৯৭৫ সালের ১৫ এপ্রিল তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম সংগ্রহশালাটির উদ্বোধন করেন — বার্ডেন সাহেবের বাড়ি নামে পরিচিত ভবনটিতে, শিল্পীর বিদেশ ভ্রমণের তৈলচিত্র ও স্কেচ মিলিয়ে প্রায় ৭০টি শিল্পকর্ম নিয়ে যাত্রা শুরু (ডেইলি স্টার)। শুরুর দিনগুলোতে সংগ্রহে ছিল ৭৭টি চিত্রকর্ম। দুঃখজনক অধ্যায়: একবার এখান থেকে ১৭টি শিল্পকর্ম চুরি যায় — তার ১০টি পরে উদ্ধার হয় (চুরির বছর নিয়ে সূত্রে ভিন্নতা আছে — ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে ১৯৮২, অন্যটিতে ১৯৯২)। শুরুতে স্থানীয় কমিটির পরিচালনায় চললেও ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এর দায়িত্ব নেয়; ১৯৯৭ সালে শুরু হওয়া সংস্কার শেষ হয় ২০০৪ সালে — সাড়ে তিন একরের বেশি (৩.২ একর) এলাকাজুড়ে আজ এটি জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা (ডেইলি স্টার; এশিয়ান এজ)। ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে শিল্পাচার্যের আরও প্রায় ৮০০ শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে।
গ্যালারিতে যা দেখবেন
বর্তমান সংগ্রহে মূল শিল্পকর্ম পঞ্চাশের বেশি (সূত্রভেদে ৫৩–৫৮টি তৈলচিত্র), সঙ্গে ১৬টি রেপ্লিকা আর শিল্পীর জীবন-কর্মের ৭৫টি আলোকচিত্র (ডেইলি স্টার; এশিয়ান এজ)। প্রদর্শিত বিখ্যাত কাজের মধ্যে আছে দুর্ভিক্ষ-সিরিজের ছবি, ফেরিঘাটে অপেক্ষা, মায়ের কোলে অপুষ্ট শিশু, কলসি-কাঁখে গ্রাম্য নারী, কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিকৃতি, স্নানশেষে নারী, মেক্সিকান নারী, আর ১৯৭০ সালের ভোলার ঘূর্ণিঝড় নিয়ে আঁকা মর্মস্পর্শী "মনপুরা '৭০" (ডেইলি স্টার)। গ্যালারির মাঝখানে কাঁচের বাক্সে রাখা শিল্পীর ৬৯টি ব্যবহার্য স্মৃতিচিহ্ন — তুলি, কালির দোয়াত, প্যালেট, রঙের টিউব, ইজেল, নলখাগড়ার কলম আর তাঁর চশমা; ছবির পাশাপাশি এই ছোট জিনিসগুলোই শিল্পীকে সবচেয়ে কাছ থেকে চেনায়। প্রতি ডিসেম্বরে শিল্পাচার্যের জন্মবার্ষিকী (২৯ ডিসেম্বর) উপলক্ষে এখানে আলোচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ অনুষ্ঠানমালা হয় (ডেইলি স্টার; সরকারি পর্যটন পোর্টাল)।
পাশেই জয়নুল উদ্যান: নদীপাড়ের বিকেল
সংগ্রহশালা এলাকাজুড়ে, সার্কিট হাউসের পাশে ব্রহ্মপুত্রের বাঁধ দিয়ে গড়া শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন উদ্যান — শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পার্ক। ভেতরে ফোয়ারা, দোলনা, ছোটদের ট্রেন, ম্যাজিক নৌকা, মিনি চিড়িয়াখানা, বৈশাখী মঞ্চ, ঘোড়ার গাড়ি, চরকি আর খাবারের দোকান; নদীতে ঘোরার জন্য সারি সারি নৌকা (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পার্কে প্রবেশ ফ্রি; ছুটির দিনে ভিড় বেশি থাকে। সেরা পরিকল্পনা: দুপুর গড়িয়ে সংগ্রহশালা দেখে বেরিয়ে উদ্যানে বসুন — নদীর হাওয়া আর সূর্যাস্ত মিলে ময়মনসিংহের একটি পূর্ণ বিকেল।
ভ্রমণ তথ্য
অবস্থান: সাহেব কোয়ার্টার, সার্কিট হাউস সংলগ্ন; মাসকান্দা বাস টার্মিনাল বা ব্রিজ এলাকা থেকে রিকশা/অটো। টিকিট (ভ্রমণ-সূত্রে): সংগ্রহশালায় প্রাপ্তবয়স্ক ২০ টাকা, শিশু ১০ টাকা (বিদেশিদের জন্য আলাদা হার); পার্কে প্রবেশ ফ্রি। সময়সূচি (ভ্রমণ-সূত্রে): শনিবার–বুধবার — এপ্রিল–সেপ্টেম্বর সকাল ১০:৩০–বিকেল ৫:৩০, অক্টোবর–মার্চ সকাল ১০টা–বিকেল ৪:৩০; শুক্রবার বিকেল ৩টা–রাত ৮টা; বৃহস্পতিবার বন্ধ। সময় বদলাতে পারে — জাতীয় জাদুঘরের শাখা হিসেবে যাওয়ার আগে যাচাই করে নিন। টিপস: গ্যালারির ভেতরে ছবি তোলা সীমিত থাকতে পারে; শিল্পীর স্মৃতিচিহ্নের গ্যালারিটি তাড়াহুড়ো করবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সংগ্রহশালা কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন নিজে; উদ্বোধন ১৫ এপ্রিল ১৯৭৫, সৈয়দ নজরুল ইসলামের হাতে (ডেইলি স্টার)।
এখানে কতগুলো ছবি আছে?
মূল শিল্পকর্ম পঞ্চাশের বেশি (সূত্রভেদে ৫৩–৫৮টি), সঙ্গে ১৬টি রেপ্লিকা ও ৭৫টি আলোকচিত্র।
চুরি যাওয়া ছবিগুলোর কী হয়েছিল?
১৭টি শিল্পকর্ম চুরি গিয়েছিল; ১০টি পরে উদ্ধার হয় (চুরির বছরে সূত্রভেদ আছে)।
সংগ্রহশালা কে পরিচালনা করে?
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর — ১৯৯৯ সাল থেকে এটি তার শাখা।
পার্কে প্রবেশ ফি কত?
জয়নুল উদ্যানে প্রবেশ ফ্রি; ফি শুধু সংগ্রহশালার টিকিটে (ভ্রমণ-সূত্রে বড়দের ২০ টাকা)।
সাপ্তাহিক বন্ধ কবে?
বৃহস্পতিবার (ভ্রমণ-সূত্রে)।
শেষকথা
জয়নুল আবেদিন চাইতেন, তাঁর ছবি থাকুক সেই মাটিতেই যেখান থেকে ছবিগুলো এসেছে — ব্রহ্মপুত্রের চরে বসে আঁকা ছেলেটির এই সিদ্ধান্তই সংগ্রহশালাটিকে করে তুলেছে দেশের অন্যতম অর্থবহ শিল্প-ঠিকানা। পাশের উদ্যানের সবুজ আর নদীর হাওয়া মিলিয়ে এটি ময়মনসিংহ ভ্রমণের অনিবার্য বিরতি।