• 30 Oct, 2026

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে আতিয়া জামে মসজিদ — সাঈদ খান পন্নীর নির্মিত ১৬০৯ সালের চার গম্বুজ মসজিদ, শাহান শাহ বাবা আদম কাশ্মীরির স্মৃতি, টেরাকোটা অলংকরণ, দশ টাকার নোটের ছবি ও ভ্রমণ গাইড।

একসময় বাংলাদেশের প্রায় সবার পকেটে ঘুরত এই মসজিদের ছবি — ১৯৭৮ ও ১৯৮২ সালের দশ টাকার নোটে ছাপা হয়েছিল টাঙ্গাইলের আতিয়া জামে মসজিদের ছবি, তাই এর ডাকনামই হয়ে গেছে "দশ টাকার মসজিদ" (ডেইলি মেসেঞ্জার)। চারশ বছরের বেশি পুরনো, লাল ইটের গায়ে টেরাকোটার অসাধারণ কারুকাজওয়ালা এই ছোট্ট মসজিদটি দেশের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত মোঘল-যুগের নিদর্শন — আর টাঙ্গাইল ভ্রমণে ২০১ গম্বুজ মসজিদের আধুনিক বিশালত্বের ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতা, চারশ বছরের পুরনো নীরব সৌন্দর্য।

"আতিয়া" নাম আর বাবা আদম কাশ্মীরি

আরবি "আতা" (অর্থ: দান) শব্দ থেকে "আতিয়া" নামের উৎপত্তি বলে জানা যায়। কিংবদন্তি ও ইতিহাস মিলে গল্পটি এমন: সুফি সাধক আলি শাহান শাহ বাবা আদম কাশ্মীরি সুলতানি আমলে এই অঞ্চলে এসে ইসলাম প্রচার শুরু করেন এবং এলাকাটি দান (ওয়াকফ) হিসেবে পান — সেই দান থেকেই জায়গার নাম আতিয়া (বাংলা উইকিপিডিয়া)। তাঁর মাজার মসজিদের কাছেই। পরে সম্রাট জাহাঙ্গীর বাবা আদম কাশ্মীরির ভক্ত সাঈদ খান পন্নীকে আতিয়া পরগনার শাসক নিয়োগ দেন — এই পন্নীই করটিয়া জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা (বাংলাপিডিয়া)। গুরুর স্মৃতিতে পন্নী তখনকার সেরা কারিগরদের দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করান; পরিকল্পনায় ছিলেন স্থপতি মুহাম্মদ খাঁ (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

দুই শিলালিপি, দুই তারিখ

মসজিদের নির্মাণসাল নিয়ে মজার এক অসংগতি আছে। জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত শিলালিপি অনুযায়ী নির্মাণকাল ১০১৯ হিজরি (১৬১০–১১ খ্রি.), কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ওপরের শিলালিপিতে লেখা ১০১৮ হিজরি (১৬০৮–৯ খ্রি.) (বাংলা উইকিপিডিয়া/বাংলাপিডিয়া)। অর্থাৎ চারশ বছরের পুরনো এই প্রশ্নের উত্তর দুটি শিলালিপি দুইভাবে দিয়েছে — যেকোনো একটিকে ধরলেও মসজিদটি জাহাঙ্গীরের আমলের, অর্থাৎ ১৬০৯ সালের আশপাশের তৈরি।

স্থাপত্য: ছোট মসজিদে সুলতানি-মোঘল মিশেল

মসজিদটি লৌহজং নদীর পূর্ব তীরে; বাইরের মাপ মাত্র ১৮.২৯ × ১২.১৯ মিটার, দেয়াল ২.২৩ মিটার পুরু (বাংলাপিডিয়া)। কাঠামো: বর্গাকার প্রধান নামাজঘরের ওপর একটি বড় গম্বুজ, পূর্বদিকে বারান্দার ওপর তিনটি ছোট গম্বুজ — মোট চার গম্বুজ। চার কোণে অষ্টভুজ মিনার-আকৃতির টাওয়ার, যার চূড়ায় পদ্ম-কলস অলংকরণ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় পূর্ব ও উত্তর দেয়ালের টেরাকোটা ও খোদাই-ইটের প্যানেল — ফুলেল নকশা, রোজেট আর জ্যামিতিক কারুকাজে ভরা, যা গৌড়ের ষোড়শ শতকের মসজিদগুলোর ঐতিহ্য বহন করে (বাংলাপিডিয়া)। বাঁকানো কার্নিসে বাংলার চালাঘরের ছাপ স্পষ্ট; মোট মিলিয়ে এটি সুলতানি ও মোঘল রীতির সফল সংমিশ্রণ। পশ্চিমে নির্মাতার খনন করা বড় পুকুর আজও আছে। পরের শতাব্দীতে নোয়াখালীর বজরা শাহী মসজিদের মতো মসজিদগুলো এই ধারারই উত্তরাধিকার। উল্লেখ্য, প্রধান গম্বুজটি কোনো এক সময় ধসে পড়েছিল — পরবর্তীতে তা পুনর্নির্মিত হয়েছে (বাংলাপিডিয়া)।

সংস্কার ও বর্তমান অবস্থা

ঊনবিংশ শতকের শুরুতে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদটি ১৮৩৭ সালে সংস্কার করেন দিল্লির নারী বণিক রওশন খাতুন চৌধুরাণী; ১৯০৯ সালে আবার সংস্কার করেন দেলদুয়ারের জমিদার আবুল আহমেদ খান গজনবী, করটিয়ার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর সহযোগিতায় (বাংলা/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি (১৯৭৮ সাল থেকে বিভাগের তত্ত্বাবধানে — ডেইলি মেসেঞ্জার) — এবং সবচেয়ে বড় কথা, চারশ বছর পরেও এখানে নিয়মিত জামাতে নামাজ হয়; এটি শুধু জাদুঘর-নিদর্শন নয়, জীবন্ত মসজিদ।

যাতায়াত

মসজিদটি টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে, দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া গ্রামে (বাংলাপিডিয়া)। টাঙ্গাইল শহর থেকে অটো/সিএনজিতে সহজেই যাওয়া যায়; একই সফরে পাশে বাবা আদম কাশ্মীরির মাজারটিও দেখে নিন। সক্রিয় মসজিদ বলে নামাজের সময়ে ভেতরে ভিড় এড়িয়ে চলুন, দেয়ালের টেরাকোটা প্যানেলে হাত দেবেন না বা খোঁচাবেন না — এগুলো চারশ বছর টিকে আছে আমাদের সযত্ন আচরণেই।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

আতিয়া মসজিদকে "দশ টাকার মসজিদ" বলা হয় কেন?

১৯৭৮ ও ১৯৮২ সালের দশ টাকার নোটের প্রচ্ছদে এর ছবি ছাপা হয়েছিল বলে (ডেইলি মেসেঞ্জার)।

মসজিদটি কে, কখন নির্মাণ করেন?

সাঈদ খান পন্নী, ১৬০৮–১৬১১ সালের মধ্যে — দুটি শিলালিপিতে দুটি তারিখ পাওয়া যায় (বাংলাপিডিয়া)।

কয়টি গম্বুজ আছে?

মোট চারটি — নামাজঘরে একটি বড়, বারান্দায় তিনটি ছোট (বাংলাপিডিয়া)।

মসজিদে কি এখনো নামাজ হয়?

হ্যাঁ, নিয়মিত জামাত হয়; পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত নিদর্শন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

টাঙ্গাইল শহর থেকে দূরত্ব কত?

প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে, দেলদুয়ার উপজেলায় (বাংলাপিডিয়া)।

শেষকথা

চারটি গম্বুজ, এক দেয়ালজোড়া টেরাকোটা আর নোটের পাতা থেকে উঠে আসা পরিচিতি — আতিয়া জামে মসজিদ প্রমাণ করে, মহিমা মাপে নয়, কারুকাজে। টাঙ্গাইলে গেলে শহর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চারশ বছরের এই নীরব সৌন্দর্য দেখে আসুন।