শত বছর ধরে পূর্ব বাংলায় ঢোকার দরজা ছিল একটি ঘাট — গোয়ালন্দ। পদ্মা ও যমুনার সঙ্গমে দাঁড়িয়ে এই ঘাট দেখেছে স্টিমারের সোনালি যুগ, দেশভাগ, আর আজকের ফেরির ভিড়। যমুনার ওপারের তেওতা জমিদার বাড়ির মতো এপারেও ইতিহাসটা নদীই লিখেছে।
১৮৭১: যেখানে রেলপথ শেষ হতো
ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ১৮৭১ সালে কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেললাইন চালু করে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। কলকাতা থেকে রাতের মেল ট্রেন ভোরে যাত্রী নামিয়ে দিত পদ্মার দক্ষিণ পাড়ের এই শেষ স্টেশনে; সেখান থেকে স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা। স্টিমার চলত চাঁদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, সিলেট-কাছাড়ের দিকে; পদ্মা বেয়ে পাটনা-বক্সার, ব্রহ্মপুত্র বেয়ে ডিব্রুগড় পর্যন্ত (ঔপনিবেশিক বিবরণ, ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। পাট, ধান, চা — পূর্ব বাংলার পণ্য কলকাতা যেত এই ঘাট দিয়েই। দেশভাগের পরও ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত চলেছে — সেটাই ছিল কলকাতার সঙ্গে শেষ সরাসরি রেল-সংযোগ (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
গোয়ালন্দ স্টিমার কারি: এক কিংবদন্তি খাবার
রাতভর স্টিমার যাত্রার সবচেয়ে স্মরণীয় অংশ ছিল খাবার — খালাসি-মাল্লাদের রান্না করা সাধারণ মুরগির ঝোল, যা ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে গোয়ালন্দ স্টিমার চিকেন কারি নামে। সরিষার তেল, পেঁয়াজ, রসুন, শুকনো মরিচ — হাতের কাছে থাকা অল্প উপকরণে রান্না; যাত্রীরা গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ভাগ চাইতে শুরু করেন, পরে তা বিক্রিই হতে থাকে (আউটলুক ট্রাভেলার)। প্রথম আলোর (২০২৪) রেসিপি-অনুসন্ধান অনুযায়ী এর "গোপন উপকরণ" ছিল চিংড়ির শুঁটকিবাটা — বার্মা-চট্টগ্রাম সীমান্তের মগ রান্নার প্রভাব। সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর লেখায় এই স্টিমারের মুরগির ঝোলের কথা উল্লেখ করেছেন (আউটলুক ট্রাভেলার)। আসল রেসিপি আজ আর কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না — তবে নামটা বাঙালির খাদ্য-ঐতিহ্যে টিকে আছে।
আজকের ঘাট
আজ যাতায়াতে সড়কপথই প্রধান: গোয়ালন্দের পাশের দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন দূরপাল্লার বাসসহ অগণিত যান পদ্মা পেরোয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। গোয়ালন্দঘাট আজ ছোট পৌর শহর — রেলস্টেশন (ঘাট ও বাজার দুটি স্টপ), লঞ্চঘাট আর সঙ্গমের বিস্তীর্ণ পাড় নিয়ে। ভ্রমণকারীর আসল পাওনা এখানে দৃশ্য: দুই মহানদীর মিলনে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত, চরের সারি, আর ঘাটের চিরচেনা হৈচৈ। পাশের জেলা ফরিদপুরের সঙ্গেও সড়কপথে সহজে যুক্ত হওয়া যায়।
যাতায়াত ও টিপস
ঢাকা থেকে দৌলতদিয়া ফেরি হয়ে বাসে গোয়ালন্দ যাওয়া যায়; রাজবাড়ী সদর থেকে গোয়ালন্দঘাট কাছেই, রেলপথেও যুক্ত। ফেরিতে যানজট মৌসুমভেদে বদলায় — হাতে সময় রাখুন। ঘাট এলাকা কর্মব্যস্ত পরিবহন-কেন্দ্র: ভিড়ে সতর্ক থাকুন, নদীর ধারে বসার জায়গা বেছে নিন পাড়ের নিরাপদ অংশে, বর্ষায় স্রোতের ধারে যাবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গোয়ালন্দ ঘাট কেন বিখ্যাত ছিল?
১৮৭১ সাল থেকে এটি ছিল কলকাতাগামী রেলপথের শেষ স্টেশন ও পূর্ব বাংলার প্রধান স্টিমার ঘাট (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
ঘাটটি কোন নদীর সঙ্গমে?
পদ্মা ও যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) নদীর সঙ্গমে, রাজবাড়ী জেলায় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
গোয়ালন্দ স্টিমার কারি কী?
স্টিমারের খালাসিদের রান্না করা কিংবদন্তি মুরগির ঝোল; গোপন স্বাদ চিংড়ির শুঁটকিবাটায় (প্রথম আলো)।
এখন কীভাবে যাওয়া যায়?
সড়কপথে দৌলতদিয়া ফেরি হয়ে, অথবা রেলে রাজবাড়ী-গোয়ালন্দ পথে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
ঘাটে এখন কী দেখার আছে?
দুই নদীর সঙ্গম, লঞ্চ-ফেরির কর্মব্যস্ত ঘাট আর পদ্মার চর-সূর্যাস্ত।
শেষকথা
গোয়ালন্দ আজ আর মহাঘাট নয় — কিন্তু সঙ্গমে দাঁড়ালে বোঝা যায়, কেন একসময় গোটা পূর্ব বাংলার যাত্রা শুরু হতো এই এক ঘাট থেকে। ইতিহাসের সেই ভোরের স্টিমারের হুইসেল হয়তো আর শোনা যায় না, পদ্মার হাওয়া কিন্তু একই আছে।