পদ্মার পাড়ের এক গ্রামের নাম হয়েছে একজন মানুষের গলার সুর থেকে — শরীয়তপুরের নড়িয়ার সুরেশ্বর দরবার শরীফের গল্প শুরু এমনিভাবেই। দেশজুড়ে লাখো ভক্তের এই দরবার শুধু আধ্যাত্মিক কেন্দ্র নয়, পদ্মাবিধৌত এক শান্ত গ্রাম্য পরিবেশে সুফি ঐতিহ্য ছোঁয়ার ঠিকানাও। হবিগঞ্জের মুড়ারবন্দ দরবারের মতো এখানেও ভ্রমণ মানে ইতিহাস আর ভক্তির মেলবন্ধন দেখা।
জান শরীফ শাহ সুরেশ্বরী ও নামের গল্প
দরবারের প্রতিষ্ঠাতা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ আলী, যিনি পরিচিত জান শরীফ শাহ সুরেশ্বরী নামে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। তিনি ছিলেন অসাধারণ সুরপ্রেমী — আল্লাহ ও রাসুলের প্রেমের সাধনায় তিনি গান-গজলকে বিশেষভাবে ব্যবহার করতেন, আর তাঁর কণ্ঠ ছিল মাধুর্যপূর্ণ। "সুরেশ্বর" শব্দটির গঠনই সুর + ঈশ্বর (বাংলা উইকিপিডিয়া)। নামটি গ্রামের পরিচয় পায় এক ঔপনিবেশিক পর্বে: ১৯০৭–১০ সালের সি.এস. জরিপের সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তা জে.সি.জেক এলাকা পরিদর্শনে এসে জান শরীফের গান ও মাহাত্ম্য শুনে তাঁর সম্মানে গ্রামের নাম রাখেন "সুরেশ্বর" — জরিপে এটি "সুরেশ্বর মৌজা" (জে.এল. নং ৪৪৯) হিসেবে লিপিবদ্ধ হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। দরবারটি সুরেশ্বর গ্রামে, পদ্মা নদীর পাড়ে — একসময় নদী ছিল প্রায় এক কিলোমিটার দূরে, এখন ভাঙন-গড়ায় দরবারের প্রায় গা ঘেঁষেছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
ধারা ও বর্তমান
জান শরীফ শাহ সুরেশ্বরী ১৯১৯ সালে ইন্তেকাল করেন (১৩২৬ বঙ্গাব্দ); পরে দায়িত্ব নেন জ্যেষ্ঠ পুত্র সুফি সৈয়দ নূরী শাহ (মৃ. ১৯৫৪), তাঁর পর জালাল নূরী দীর্ঘ ৪৪ বছর দরবার পরিচালনা করেন; বর্তমানে সেই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম দায়িত্বে আছেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। এনটিভির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দরবারের প্রধান ঈদ জামাতে ইমামতি করেন শাহ সুফি সৈয়দ বেলাল নূরী আল সুরেশ্বরী। বছরজুড়ে এখানে উরস, খোশরোজ ও মিলাদ মাহফিলে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ভক্তদের সমাগম হয়। প্রতিবেশী জেলার মাদারীপুর থেকেও এখানে আসা সহজ।
শতবর্ষী এক ব্যতিক্রমী রীতি
সুরেশ্বরের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য: এই দরবারের ভক্তরা ১৯২৮ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশের সাধারণ সময়ের একদিন আগে রোজা শুরু করেন ও ঈদ উদযাপন করেন (এনটিভি, মে ২০২৬)। শরীয়তপুরের সুরেশ্বর, কেদারপুর, চাকধ, চন্ডিপুরসহ প্রায় ৫০টি গ্রামের অন্তত ২০ হাজার মানুষ এই রীতিতে ঈদ পালন করেন; ঈদের প্রধান জামাত হয় সুরেশ্বর দরবার শরীফেই। আরেকটি স্বতন্ত্র নিয়ম — দরবারের রীতি অনুযায়ী এখানে পশু কোরবানি করা হয় না (এনটিভি)। ভ্রমণকারীর জন্য এসব ধর্মীয় অনুশীলন পর্যবেক্ষণের বিষয় — শ্রদ্ধা রেখে দূর থেকে দেখুন, বিতর্কে জড়াবেন না।
যাতায়াত ও ভ্রমণ-শিষ্টাচার
দরবারটি নড়িয়া উপজেলা সদর থেকে সহজে পৌঁছানো যায়; ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে শরীয়তপুর-নড়িয়া সড়কপথে যাওয়াই এখন স্বস্তিদায়ক। এটি একটি সক্রিয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান — পোশাকে শালীনতা রাখুন, রওজা ও প্রার্থনা এলাকায় নীরবতা বজায় রাখুন, ছবি তোলার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিন। উরসের সময় ভিড় অত্যন্ত বেশি থাকে — সেই অভিজ্ঞতা চাইলে আগে থেকে খোঁজ নিয়ে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সুরেশ্বর দরবার কে প্রতিষ্ঠা করেন?
শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ আলী, অর্থাৎ জান শরীফ শাহ সুরেশ্বরী (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
"সুরেশ্বর" নাম এলো কীভাবে?
১৯০৭–১০ সালের জরিপে ব্রিটিশ কর্মকর্তা জে.সি.জেক জান শরীফের গানে মুগ্ধ হয়ে গ্রামের নাম দেন সুরেশ্বর (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
দরবারটি কোথায়?
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর গ্রামে, পদ্মা নদীর পাড়ে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
এখানকার ঈদ কেন আলোচিত?
ভক্তরা ১৯২৮ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিলিয়ে একদিন আগে ঈদ পালন করেন; প্রধান জামাত হয় এই দরবারে (এনটিভি)।
সাধারণ দর্শনার্থী কি যেতে পারেন?
পারেন — শালীন পোশাক ও নীরবতা বজায় রেখে, অনুমতি নিয়ে ঘুরে দেখা যায়।
শেষকথা
যে দরবার একজন সাধকের গানের সুর থেকে গ্রামের নাম উপহার পেয়েছে, সেই জায়গায় সন্ধ্যা নামলে পদ্মার হাওয়ায় সুরেরই একটা আবহ থেকে যায়। বিশ্বাস যার যার — কিন্তু বাংলার সুফি ঐতিহ্যের এই জীবন্ত অধ্যায়টি একবার দেখে আসা যায় স্বচ্ছন্দেই।