• 30 Oct, 2026

রাজশাহীর পুঠিয়া ভ্রমণ গাইড — ১৮৯৫ সালের রাজবাড়ি, ভুবনেশ্বর শিব মন্দির (১৮২৩), পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দিরের পোড়ামাটি, দোল মন্দির, জগন্নাথ মন্দির ও রাজশাহী শহর থেকে যাওয়ার উপায়।

রাজশাহী শহর থেকে মাত্র ২৩ কিলোমিটার পূর্বে এমন এক জনপদ, যেখানে এক বর্গকিলোমিটারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে দেশের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ঐতিহাসিক মন্দির — পুঠিয়া। রাজশাহী শহর ভ্রমণের সবচেয়ে বড় দিন-বেড়ানো এই মন্দির-নগরী: পরিখাঘেরা রাজপ্রাসাদ, হ্রদ, আর পোড়ামাটির গল্প বলা মন্দিরের সারি।

রাজবাড়ি: হেমন্ত কুমারীর প্রাসাদ

বর্তমান প্রাসাদটি তৈরি ১৮৯৫ সালে — মহারানী হেমন্ত কুমারী তাঁর শাশুড়ির স্মরণে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত পুরনো প্রাসাদ সংস্কার-পুনর্নির্মাণ করেন (বাসস/টিবিএস)। দ্বিতল প্রাসাদটি ইন্দো-সারাসেনিক রিভাইভাল ঘরানার — গ্রিক-রোমান স্তম্ভের ছাপ স্পষ্ট; চারদিকে পরিখা, সামনে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। জমিদারির গোড়া আরও পুরনো: প্রথম জমিদার লস্কর খান নীলাম্বর — লোকমতে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে তিনি "রাজা" উপাধি পান; ব্রিটিশ আমলে পুঠিয়া এস্টেট ছিল বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারিগুলোর একটি (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। বর্তমানে প্রাঙ্গণের অংশে কলেজসহ নানা প্রতিষ্ঠান বসেছে, তবু প্রাসাদের মহিমা অটুট।

ভুবনেশ্বর শিব মন্দির: দেশের সবচেয়ে বড়

শিবসাগর হ্রদের পাড়ে ভুবনেশ্বর শিব মন্দির (বড় শিব মন্দির) — নির্মাণ ১৮২৩ সালে, রাজা জগত নারায়ণ রায়ের বিধবা রানী ভুবনময়ী দেবীর হাতে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। পঞ্চরত্ন ঘরানার এই মন্দির বাংলাদেশের বৃহত্তম শিবমন্দির; উচ্চতা প্রায় ১০৫ ফুট (টিবিএস)। ভেতরে রয়েছে দেশের বৃহত্তম কালো ব্যাসল্ট পাথরের শিবলিঙ্গ। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই লিঙ্গটি সরানোর চেষ্টা ও ক্ষতির কাহিনি স্থানীয়রা আজও বলেন (বাসস) — ইতিহাসের সেই ক্ষত মন্দিরের গর্বেরই অংশ। প্রাচীন এই মন্দিরের মর্যাদায় দেশের আরেক প্রান্তের তুলনা যশোরেশ্বরী মন্দির।

পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির ও পোড়ামাটির জগৎ

প্রাসাদের পাশেই কমপ্লেক্সের রত্ন — পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির (ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ)। পাঁচ চূড়ার এই মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির ফলকে খোদাই করা রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, রাধা-কৃষ্ণের লীলা, স্থানীয় জীবন, নৃত্য, শিকার আর জীবজন্তু — বাঘ, হরিণ, উট, পাখির ভিড়ে একটি বিলুপ্তপ্রায় গণ্ডারের আকৃতিও চেনা যায় বলে গবেষকদের ধারণা (টিবিএস/বাসস)। অনেকে এর গড়নে দিনাজপুরের কান্তজীউ মন্দিরের ছোট সংস্করণের ছাপ দেখেন (টিবিএস)। পাশাপাশি আরও আছে দোল মন্দির — পিরামিডঘরানার চারতলা দোলমঞ্চ, উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার (প্রথম আলো); দ্বিতল অষ্টভুজ জগন্নাথ (রথ) মন্দির; বড় ও ছোট আহ্নিক মন্দির, চৌচালা ছোট গোবিন্দ, আর প্রাসাদের পেছনের ক্ষুদ্র একবাংলা মন্দির — টেরাকোটা-বিশেষজ্ঞ ডেভিড ম্যাকাচ্চিয়নের মতে যা ছিল তাঁর দেখা সবচেয়ে প্রিয় অলংকৃত মন্দির (টিবিএস)। হ্রদ দুটো — শ্যামসাগর ও শিবসাগর (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। তবে সতর্কতা: কিছু মন্দিরে ক্ষয় ও পোড়ামাটি হারানোর চিহ্ন চোখে পড়ে (টিবিএস) — হাত দেবেন না, ছবিতে সীমাবদ্ধ থাকুন।

যাতায়াত ও পরিকল্পনা

রাজশাহী শহর থেকে বাস/সিএনজিতে পুঠিয়া বাজার; মহাসড়ক থেকে প্রাসাদ হাঁটাপথে বা সংক্ষিপ্ত রিকশায় (প্রথম আলো)। পুরো কমপ্লেক্স দেখতে কমপক্ষে দুই-তিন ঘণ্টা রাখুন — সকালে গেলে মন্দিরগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতিতে জীবন্ত রূপ দেখা যায়। সক্রিয় মন্দিরে প্রবেশে শালীনতা বজায় রাখুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

পুঠিয়া রাজবাড়ি কে তৈরি করেন?

মহারানী হেমন্ত কুমারী, ১৮৯৫ সালে (বাসস)।

দেশের বৃহত্তম শিবমন্দির কোনটি?

পুঠিয়ার ভুবনেশ্বর শিব মন্দির, নির্মাণ ১৮২৩ সালে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।

গোবিন্দ মন্দিরের বিশেষত্ব কী?

পঞ্চরত্ন স্থাপত্য আর রামায়ণ-মহাভারত খোদাই করা পোড়ামাটির ফলক (টিবিএস)।

রাজশাহী থেকে দূরত্ব কত?

প্রায় ২৩ কিলোমিটার পূর্বে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।

কমপ্লেক্সে কতগুলো মন্দির আছে?

দশের বেশি ঐতিহাসিক মন্দির — দেশে সর্বাধিক (ইংরেজি উইকিপিডিয়া/টিবিএস)।

শেষকথা

পুঠিয়া বাংলার মন্দির-স্থাপত্যের একটি সম্পূর্ণ পাঠশালা — এক প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে পঞ্চরত্ন, চৌচালা, দোচালা আর পিরামিড-মঞ্চ একসঙ্গে দেখা যায়। রাজশাহী গেলে এই অর্ধবেলা না রাখলে ভ্রমণটাই অর্ধেক থেকে যাবে।