মুজিবনগরের শপথভূমি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে, ভৈরব নদের তীরে, দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রগুলোর একটি — বল্লভপুর। এখানে গির্জা শুধু উপাসনালয় নয়; দেড় শ বছর ধরে এই গ্রাম আর পাশের ভবেরপাড়ায় গড়ে উঠেছে পুরো একটি মিশন-সভ্যতা — চার্চ, স্কুল, আর এমন একটি হাসপাতাল, যা এই বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলের একমাত্র প্রসূতি-সেবার ভরসা। মেহেরপুর সফরে মুজিবনগরের পর এই পল্লীটি দেখা মানে একই উপজেলায় বাংলাদেশের ইতিহাসের দুই ভিন্ন অধ্যায় দেখা।
কীভাবে গড়ে উঠল এই মিশন: সিএমএস থেকে চার্চ অব বাংলাদেশ
আনন্দবাজার পত্রিকার ইতিহাস-ফিচার (ডিসেম্বর ২০২৫) অনুযায়ী, ১৮৩২ সালে চার্চ মিশনারি সোসাইটির (সিএমএস) রেভারেন্ড জে দিরে নদিয়া অঞ্চলে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মপ্রচারের সূচনা করেন; কৃষ্ণনগর ছাড়াও চাপড়া, বল্লভপুর, কাপাসডাঙা ও রতনপুরে গড়ে ওঠে মিশন কেন্দ্র, আর ১৮৩২–১৮৫০ সালের মধ্যে নদিয়া অঞ্চলে দীক্ষিত হন ৪,৫২০ জন — সে সময় বঙ্গদেশে সর্বাধিক। চার্চ অব বাংলাদেশের নিজস্ব ওয়েবসাইট জানায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সিএমএস মিশনারিরা বল্লভপুরে হাসপাতাল ও স্কুল চালু করেন — সিএমএসের পদ্ধতিই ছিল এমন: প্রচারে গিয়ে সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তারপর মিশন ভবন বা গির্জা (আনন্দবাজার)। এই অঞ্চলের মাটি তুলনামূলক উঁচু ও উর্বর, অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি ও দিনমজুরি; গত পঞ্চাশ বছরে এখানে বড় বন্যা হয়েছে মাত্র একবার, ২০০০ সালে (চার্চ অব বাংলাদেশ) — অর্থাৎ মিশনটি গড়ে উঠেছিল এমন এক জনপদে, যেখানে সেবা পৌঁছানো ছিল সত্যিই দুর্গম এক কাজ। আজ বল্লভপুর ডিনারি চার্চ অব বাংলাদেশের সদস্য-সংখ্যায় বৃহত্তম ডিনারি (চার্চ অব বাংলাদেশ) — সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলের বেশিরভাগ সদস্যের বাস ভারত-সীমান্তের কাছাকাছি গ্রামগুলোতে। ডিনারির অধীনে নিয়মিত চলে সানডে স্কুল, বাইবেল পাঠ, যুব ও নারীদের আয়োজন ও সম্মেলন।
১৮৮৯ সালের ক্লিনিক থেকে ৫০ শয্যার হাসপাতাল
বল্লভপুর হাসপাতালের শুরুটা বিনীত: বাংলা উইকিপিডিয়ার তথ্যে, ১৮৮৯ সালে ইংরেজ মিশনারি নার্স মিস অ্যালেন এখানে একটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। আজ তা একতলা ৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল — ভৈরব নদের তীরে, ভারত-সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক মাইল ভেতরে (চার্চ অব বাংলাদেশ)। হাই-টেক যন্ত্রপাতি নেই, বিদ্যুৎ সরবরাহও অনিয়মিত — তবু এই হাসপাতালই চারপাশের ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলোর নারীদের একমাত্র প্রসূতি সেবার জায়গা; এখানে জুনিয়র নার্স ও ধাত্রী প্রশিক্ষণের কেন্দ্রও রয়েছে, গ্রামে গ্রামে চলা প্রায় ৩০টি প্রসবপূর্ব ক্লিনিকের মাধ্যমে পৌঁছে গেছে মাতৃস্বাস্থ্য সেবা বিস্তৃত এলাকায় (চার্চ অব বাংলাদেশ)। এই সেবার মুখ হিসেবে পরিচিত সিস্টার গিলিয়ান রোজ — হাসপাতালটির পরিচালক; ২০২২ সালে প্রথম আলো তাঁর নিভৃত মানবসেবা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, আর পরবর্তী প্রতিবেদনে এসেছে বাংলাদেশের নাগরিকত্বই তাঁর শেষ চাওয়া।
খ্রিস্টান পল্লী ও বড়দিনের আবহ
মেহেরপুর প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেলায় সবচেয়ে বেশি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর বাস মুজিবনগর উপজেলার ভবেরপাড়া ও বল্লভপুর গ্রামে — নামটি চেনা লাগছে? এই ভবেরপাড়ার জমিদার বৈদ্যনাথ বাবুর আমবাগানেই ১৯৭১-এ শপথ নিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার। বড়দিনের আগে এই পল্লীগুলোতে সাজ সাজ রব পড়ে যায় — প্রস্তুতি শুরু হয় ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকেই (ভবেরপাড়া চার্চের বড়দিন উদযাপন কমিটি); রঙিন বাতি ও তারায় সাজানো হয় গির্জা, বাড়ি আর রাস্তাঘাট, বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয় যীশুর জন্মের গোশালা-দৃশ্য, ঘরে ঘরে চলে নতুন পোশাক ও বিশেষ খাবারের আয়োজন; ২৪ ডিসেম্বর মধ্যরাত থেকে বড় ঘণ্টা বাজিয়ে, স্তোত্রগানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রার্থনা — নিজেদের ও বিশ্বের কল্যাণ কামনায় (মেহেরপুর প্রতিদিন)। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এলে এই উৎসবের আবহ পাওয়া যাবে; তবে মনে রাখুন, এটি একটি জীবন্ত ধর্মীয় জনপদ — পর্যটন কেন্দ্র নয়। গির্জায় ঢোকার আগে অনুমতি নিন, উপাসনার সময় ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন, আর রোগীর সেবায় ব্যস্ত হাসপাতাল চত্বরে ভিড় বাড়াবেন না।
কীভাবে যাবেন
বল্লভপুর মুজিবনগর উপজেলায় — ফলে মুজিবনগর কমপ্লেক্স দেখার দিনের সঙ্গেই এটি জুড়ে দেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক; মেহেরপুর শহর থেকেও সড়কপথে সহজে আসা যায়, স্থানীয়দের কাছে "বল্লভপুর মিশন" বা "মিশন হাসপাতাল" বললেই সবাই চেনে। একদিনের ছক: সকালে মুজিবনগর আম্রকানন, দুপুরে বল্লভপুর চার্চ ও হাসপাতাল চত্বর (দূর থেকে), বিকেলে আমঝুপি নীলকুঠি হয়ে শহরে ফেরা। রবিবার সকালে গেলে উপাসনার আবহ পাবেন — সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বল্লভপুর কেন বিখ্যাত?
এটি চার্চ অব বাংলাদেশের সদস্য-সংখ্যায় বৃহত্তম ডিনারির কেন্দ্র এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর সিএমএস মিশনের উত্তরাধিকার — চার্চ, স্কুল ও ঐতিহাসিক মিশন হাসপাতালসহ একটি পূর্ণ খ্রিস্টান পল্লী।
মিশন হাসপাতালটি কবে প্রতিষ্ঠিত?
১৮৮৯ সালে ইংরেজ মিশনারি নার্স মিস অ্যালেনের ক্লিনিক হিসেবে শুরু; বর্তমানে ৫০ শয্যার হাসপাতাল, এলাকার একমাত্র প্রসূতি-সেবা কেন্দ্র (চার্চ অব বাংলাদেশ)।
চার্চটি কোন মূল্যবোধের/সংগঠনের?
প্রোটেস্ট্যান্ট ঐতিহ্যের — ঐতিহাসিকভাবে চার্চ মিশনারি সোসাইটি (সিএমএস), বর্তমানে চার্চ অব বাংলাদেশের বল্লভপুর ডিনারি।
ভবেরপাড়ার সঙ্গে মুজিবনগরের সম্পর্ক কী?
ভবেরপাড়ার জমিদার বৈদ্যনাথ বাবুর আমবাগানই ছিল বৈদ্যনাথতলা — ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের শপথস্থল; ভবেরপাড়া ও বল্লভপুর পাশাপাশি দুটি খ্রিস্টান-জনবহুল গ্রাম।
কখন গেলে উৎসবের আবহ পাওয়া যাবে?
বড়দিনের সময় (২৪–২৫ ডিসেম্বর) পল্লী ও গির্জায় উৎসবের সাজ ও মধ্যরাতের প্রার্থনা হয়; এ ছাড়া বছরের যেকোনো সময় সকালে যাওয়া উপযোগী।
শেষকথা
বল্লভপুরের গল্পটা বাংলাদেশের বহুত্বের গল্প — সীমান্তের এক গ্রামে দেড় শ বছর ধরে প্রার্থনা, পড়াশোনা আর প্রসূতির সেবা পাশাপাশি চলছে। জমকালো স্থাপত্য আশা করে নয়, এই শান্ত, সেবামুখী জনপদটির প্রতি সম্মান নিয়ে গেলে মেহেরপুর সফরটি পূর্ণতা পাবে।