• 31 Oct, 2026

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার চাংগুরিয়ায় বাইতুল আমান জামে মসজিদ কমপ্লেক্স (গুঠিয়া মসজিদ) — ১৪ একরে ২০ গম্বুজের সাদা মার্বেলের মসজিদ, ১৯৩ ফুট মিনার, ২০ হাজার ধারণক্ষমতার ঈদগাহ, তিনটি হ্রদ; প্রতিষ্ঠাতা এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর ব্যক্তিগত উদ্যোগের গল্প।

সাদা মার্বেলের ঝকঝকে গম্বুজ, পুকুরের জলে ভাসা প্রতিচ্ছবি আর রাতে আলোকসজ্জায় ঝলমলে চত্বর — গুঠিয়া মসজিদ দক্ষিণ বাংলার সবচেয়ে চমকপ্রদ ধর্মীয় স্থাপনা। ধর্মীয় গাম্ভীর্যের পাশাপাশি এটি এখন বরিশালের শীর্ষ পর্যটন আকর্ষণগুলোর একটি: বাসসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন (মার্চ ২০২৬) অনুযায়ী প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী আসেন এই কমপ্লেক্সে।

পরিচয় ও প্রতিষ্ঠার গল্প

মসজিদটির পুরো নাম বাইতুল আমান জামে মসজিদ কমপ্লেক্স; তবে পুরো দেশে এটি পরিচিত গুঠিয়া মসজিদ নামে। অবস্থান বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে — বানারীপাড়া সড়ক ধরে জেলা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে (বাসস)। এটি সম্পূর্ণ এক ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফসল: স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু নিজ বাড়ির সামনে প্রায় ১৪ একর জমিতে (যা জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমের ৮.৩০ একর জায়গার চেয়েও বড় — ইংরেজি উইকিপিডিয়া) ২০০৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু করেন; তত্ত্বাবধানে ছিল এসএএস ফাউন্ডেশন, আর কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন তাঁর ছোট ভাই মো. আমিনুল ইসলাম নিপু (বাসস)। তিন বছরের নির্মাণ শেষে কমপ্লেক্সটি সম্পন্ন হয় ২০০৬ সালে — উদ্বোধন ২০ অক্টোবর ২০০৬ (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। নির্মাণব্যয় ছিল তৎকালীন প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং কাজে অংশ নেন প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার নির্মাণ শ্রমিক বলে জানা যায় (বাসস/ভ্রমণট্রিপস)।

স্থাপত্য: মধ্যপ্রাচ্যের ছাপ, বরিশালের কারিগরি

নকশা চূড়ান্ত করার আগে প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি বন্ধুদের নিয়ে ঘুরেছেন শারজাহ, দুবাই, তুরস্ক, মদিনা, ভারত ও পাকিস্তানের নামকরা মসজিদ (বাসস) — ফলে গুঠিয়ার গঠনে মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া ও ইউরোপের মসজিদ-স্থাপত্যের মিশেল চোখে পড়ে। সাদা মার্বেলে গড়া মূল মসজিদে রয়েছে ২০টি গম্বুজ (বাসস/উইকিপিডিয়া) এবং পাশে উঠেছে ১৯৩ ফুট (৫৮ মিটার) উঁচু মিনার — উচ্চতায় যা দেশের মিনারগুলোর শীর্ষস্থানীয়। মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন প্রায় দেড় হাজার মুসল্লি, বাইরের চত্বরে আরও প্রায় পাঁচ হাজার; মহিলাদের জন্য রয়েছে আলাদা নামাজের ব্যবস্থা (বাসস, ২০২৬)। ভেতরের কারুকাজে চোখে পড়বে আয়াতুল কুরসির ক্যালিওগ্রাফি — মূল গম্বুজের ভেতরের দিকেও খোদাই করা আছে আয়াতুল কুরসি, ভেতরের দেয়ালে লেখা সূরা আর-রাহমান (আলকেট্রন); ক্যালিওগ্রাফির কাজ করেছেন বরিশালেরই শিল্পী আরিফুর রহমান, সহযোগী ছিলেন ক্যালিওগ্রাফার বশির মেসবাহ (বাসস)।

কমপ্লেক্সে যা যা আছে

১৪ একরের এই চত্বরে শুধু মসজিদ নয় — রয়েছে ২০ হাজারের বেশি ধারণক্ষমতার বিশাল ঈদগাহ ময়দান (প্রবেশপথের দুই পাশে দুটি ফোয়ারা), এতিমখানা, হাফেজি মাদরাসা, কবরস্থান, অফিস, খতিব ও মুয়াজ্জিনের কোয়ার্টার, ডাকবাংলো, হেলিপ্যাড ও প্রশস্ত গাড়ি পার্কিং (বাসস)। মূল প্রবেশপথের ডান পাশে বড় পুকুর — এমনভাবে খনন করা যে জলে মসজিদের প্রতিচ্ছবি ভাসে; কমপ্লেক্সে রয়েছে আরও হ্রদ/পুকুর ও ফুলের বাগান (বাসস/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় পুরো কমপ্লেক্স ঝলমল করে ওঠে (বাসস, ২০২৬) — তাই অনেক দর্শনার্থী মাগরিবের আগ দিয়ে পৌঁছে দিনের আলো ও রাতের আলো দুটোই দেখে ফেরেন। পুরনো মসজিদ-স্থাপত্যের সঙ্গে তুলনা টানতে চাইলে দেখে নিন আমাদের বজরা শাহী মসজিদের (১৭৪১–৪২, নোয়াখালী) গাইড — দুই শতকের ব্যবধানে বাংলার মসজিদ-নির্মাণের দুই রূপ পাশাপাশি দেখা যাবে।

কীভাবে যাবেন ও পরিদর্শনের শিষ্টাচার

বরিশাল শহর থেকে বানারীপাড়া সড়কে বাস বা সিএনজি-অটোরিকশায় চাংগুরিয়া; চাইলে রিজার্ভ গাড়িতে উজিরপুরের অন্য ঠিকানা মিলিয়ে একদিনের ছক সাজানো যায়। এটি সক্রিয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান — পোশাকে শালীনতা বজায় রাখুন, নামাজের সময়ে ভেতরের চত্বরে নীরবতা রক্ষা করুন, মহিলা দর্শনার্থীদের জন্য নির্ধারিত ব্যবস্থা মেনে চলুন, আর অনুমতি ছাড়া ভেতরের অংশের ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন। জুমার দিনে ও ঈদের জামায়াতে এখানে বিশাল ভিড় হয় — শুধু দেখতে গেলে অন্য দিন বেছে নিন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

গুঠিয়া মসজিদ কোথায়?

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের চাংগুরিয়া গ্রামে — জেলা শহর থেকে বানারীপাড়া সড়কে প্রায় ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে (বাসস)।

মসজিদটি কে, কবে নির্মাণ করেন?

এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে; নির্মাণ শুরু ১৬ ডিসেম্বর ২০০৩, সম্পন্ন ২০০৬ সালে; ব্যয় প্রায় ২০ কোটি টাকা (বাসস/উইকিপিডিয়া)।

মসজিদের বিশেষত্ব কী?

২০টি গম্বুজ, ১৯৩ ফুট উঁচু সাদা মার্বেলের মিনার, আয়াতুল কুরসি ও সূরা আর-রাহমানের ক্যালিওগ্রাফি, আর ১৪ একরে ঈদগাহ-মাদরাসা-এতিমখানা-হ্রদসহ পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স।

একসঙ্গে কতজন নামাজ পড়তে পারেন?

ভেতরে প্রায় ১,৫০০, বাইরের চত্বরে আরও প্রায় ৫,০০০ (বাসস, ২০২৬); পাশের ঈদগাহে ২০ হাজারের বেশি।

দর্শনার্থীদের জন্য সেরা সময় কখন?

বিকেল থেকে সন্ধ্যা — দিনের আলোয় স্থাপত্য আর সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জা, দুটোই এক সফরে দেখা যায় (বাসস)।

শেষকথা

একজন মানুষের ব্যক্তিগত সাধ আর তিন বছরের শ্রম যেখানে ১৪ একর জুড়ে এমন স্থাপত্য হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে দাঁড়ালে বিশ্বাস আর শিল্পের মিলন নিজে থেকেই অনুভূত হয়। বরিশাল সফরে গুঠিয়া মসজিদকে তালিকার উপরেই রাখুন — বিশেষ করে সন্ধ্যার আলোয় এর রূপ দেখা হাতছাড়া করবেন না।