• 29 Oct, 2026

চন্দনাইশ ভ্রমণ গাইড: দোহাজারীর নামকথা, শুক্লাম্বর দীঘি ও শঙ্খ পাড়ের জনপদ

চন্দনাইশ ভ্রমণ গাইড: দোহাজারীর নামকথা, শুক্লাম্বর দীঘি ও শঙ্খ পাড়ের জনপদ

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পথের উপজেলা চন্দনাইশের গাইড — মুগল আমলের দোহাজারী নামের গল্প, বাগিচাহাটের তিন গম্বুজ খান মসজিদ, সাতবাড়িয়ার নবরত্ন বিহার, শুক্লাম্বর দীঘি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্মৃতি আর শঙ্খ নদীর তীর।

কক্সবাজারের পথে যাঁরা যান, চন্দনাইশ তাঁদের কাছে সাধারণত শুধু ‘দোহাজারী’ নামের একটি যানজট-বিরতি। অথচ এই উপজেলার মাটিতে মুগল যুগের দুর্গ, মুক্তিযুদ্ধের রেডিও-স্মৃতি আর শতবর্ষের মসজিদ-বিহার ছড়িয়ে আছে। বড় পর্যটন গন্তব্য নয় বটে, কিন্তু পথে থেমে অর্ধেক দিন দিলে সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ-এর উত্তরের তীর্থ-ধারার পাশাপাশি দক্ষিণের এই ইতিহাসটাও সম্পূর্ণ হয়।

দোহাজারী: দুই হাজারী মনসবদারের নামে নাম

বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম মুগল অধিকারে আসার পর মোর্তজা খাঁর বাহিনী শঙ্খ নদীর উত্তর তীরে অবস্থান নেয়; সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত হন দুজন ‘হাজারী’ মনসবদার — আধু খাঁ ও লক্ষ্মণ সিংহ। কথিত আছে, এই দুই হাজারীর নাম থেকেই জায়গার নাম দোহাজারী। পরে এখানে দুটি দুর্গ তৈরি হয়, ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠে বিমানঘাঁটি, আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে চট্টগ্রাম শহর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থানান্তরিত হয় দোহাজারীতে — মুক্তিকামী কণ্ঠের শেষ আশ্রয়গুলোর একটি ছিল এই জনপদ। উপজেলার জামিরজুরী বধ্যভূমি সেই সময়ের নীরব সাক্ষী।

প্রত্ন ও ধর্মীয় স্থাপনা

  • তিন গম্বুজ খান মসজিদ (বাগিচাহাট): বাংলাপিডিয়ার প্রত্নতালিকাভুক্ত এই মসজিদটি চন্দনাইশের প্রাচীনতম স্থাপনাগুলোর একটি; পাশেই ঐতিহাসিক খান দীঘি।
  • নবরত্ন বিহার ও সাতবাড়িয়া শান্তি বিহার: সাতবাড়িয়ার বৌদ্ধ বিহার দুটি উপজেলার বৌদ্ধ ঐতিহ্যের কেন্দ্র; কাছেই হাফেজ নগর দরবার শরীফও রয়েছে।
  • বুড়ি কালি মন্দির (বরমা): প্রত্নতালিকাভুক্ত প্রাচীন কালি মন্দির; বরমা এলাকায় আরও আছে শুক্লাম্বর দীঘি ও ঠাকুর দীঘি — বড় বড় প্রাচীন দীঘির পাড়ে বসে বিকেল কাটানোর মজাই আলাদা। ধামাইর হাটের বরমা মিষ্টি ঘরের মিষ্টির স্থানীয় খ্যাতি আছে, চেখে দেখতে ভুলবেন না।

শঙ্খ নদী ও পাহাড়ি পূর্ব

উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে শঙ্খ (সাঙ্গু) নদী — বৈলতলীর খোদার হাট সেতুর ওপর থেকে নদী আর দূরের পাহাড়ের দৃশ্য সুন্দর; তীরের গ্রামগুলোতে নৌকা-জীবন দেখা যায়। উপজেলার পূর্বের পাহাড়ি অংশে রাঙ্গুনিয়া সীমান্তজুড়ে দুধপুকুরিয়া-ধোপাছড়ি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বিস্তার — সবুজ পাহাড় ও বন্যপ্রাণীর এই এলাকা অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের টানলেও যাতায়াত কঠিন (বর্ষায় নদী উত্তাল থাকে), তাই স্থানীয় গাইড ছাড়া গভীরে যাওয়া ঠিক নয়। কাঞ্চনাবাদ-হাশিমপুরের পেয়ারা বাগান আর ছৈদাবাদের পাইকারি পেয়ারা বাজারের মৌসুমি চাঞ্চল্যও এই জনপদের আরেক রূপ।

কীভাবে যাবেন

  • রুট: চট্টগ্রাম শহর থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে পটিয়া পেরিয়ে চন্দনাইশ সদর ও দোহাজারী (প্রায় দেড় ঘণ্টা); রেলপথে দোহাজারী স্টেশনও আছে। কক্সবাজার বা বান্দরবান যাত্রার পথে থামা সবচেয়ে সুবিধাজনক।
  • সাজানো অর্ধদিন: বাগিচাহাট খান মসজিদ ও খান দীঘি → বরমার শুক্লাম্বর দীঘি ও বুড়ি কালি মন্দির → সাতবাড়িয়া বিহার → ফেরার পথে খোদার হাট সেতু থেকে শঙ্খের সূর্যাস্ত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

দোহাজারী নামের উৎপত্তি কী?
কথিত আছে মুগল আমলের দুজন হাজারী মনসবদারের নামানুসারে এই নাম।

চন্দনাইশে আলাদা করে ট্রিপ করা যায়?
যায়, তবে কক্সবাজার/বান্দরবান রোড-ট্রিপে থেমে দেখাই বেশি ব্যবহারিক — অর্ধেক দিন যথেষ্ট।

শুক্লাম্বর দীঘি কোথায়?
বরমা ইউনিয়নে (৫নং ওয়ার্ড এলাকা) — দোহাজারী থেকে স্থানীয় যানে যাওয়া যায়।

শেষকথা

চন্দনাইশ চিৎকার করে পর্যটক ডাকে না — তাই এর মসজিদ, বিহার আর দীঘির নীরবতাই এর সৌন্দর্য। ইতিহাসে ভরা এই পথ ধরে এগিয়ে যান আরও পাহাড়ের দিকে; পরের গন্তব্যের প্রস্তুতিতে পড়ুন বান্দরবান - মেঘ পাহাড়ের দেশ। শুভ যাত্রা!