কোটবাড়ির প্রাচীন বিহার দেখে ফেরার পথে কুমিল্লা শহরটাকে অনেকেই শুধু যাতায়াতের ঠিকানা ভাবেন — অথচ শহরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ছয়শো বছরের পুরনো এক সুবিশাল দিঘি আর দেড়শো বছরের শিক্ষা-ঐতিহ্য। ময়নামতীর গাইডের (ময়নামতী ভ্রমণ গাইড) পর এই পর্বে শহরের গল্প — ধর্মসাগর, রানীর দিঘি আর ভিক্টোরিয়া কলেজ।
ধর্মসাগর: ১৪৫৮ সালের দিঘি
ঐতিহাসিক দলিল ও তাম্রশাসন অনুযায়ী ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরার রাজা ধর্মমাণিক্য (প্রথম) প্রজাদের পানীয় জলের সংকট দূর করতে এই বিশাল দিঘি খনন করান; তাঁর ১৩৮০ শকাব্দের তাম্রশাসনে ধর্মসাগর উৎসর্গের কথা লিপিবদ্ধ আছে, আর রাজার নামেই দিঘির নামকরণ। শহরের প্রাণকেন্দ্র বাদুরতলা এলাকায় অবস্থিত দিঘিটির জলভাগের আয়তন ২৩.১৮ একর (৯.৩৮ হেক্টর) — দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭৫ মিটার, প্রস্থ প্রায় ২৩৭ মিটার, গড় গভীরতা সাড়ে তিন মিটারের বেশি। বাংলাদেশের নগর জল-ঐতিহ্যের প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে ধর্মসাগরকে গণ্য করা হয়। (স্থানীয় কোনো কোনো বর্ণনায় দিঘিটির খনন নিয়ে ভিন্ন কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে — তবে তাম্রশাসনের সাক্ষ্যই প্রামাণ্য ধরা হয়।)
দিঘির আজকের রূপ: নগরীর ফুসফুস
কুমিল্লাবাসীর কাছে ধর্মসাগর শুধু ইতিহাস নয়, প্রতিদিনের ঠিকানা — স্থানীয়রা একে বলেন ‘নগরীর ফুসফুস’। দিঘির চারপাশে বাঁধানো হাঁটাপথ, সারিবদ্ধ পুরনো গাছের ছায়া, বসার বেঞ্চ; সকালে প্রাতঃভ্রমণকারী আর বিকেলে শত শত মানুষের আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে পাড়। উত্তর কোণে শিশুপার্ক, জলে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থাও থাকে; শীতকালে পরিযায়ী পাখির আনাগোনা বাড়ে। দিঘির সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ৪৮ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে (বাসস, আগস্ট ২০২৫) — তাই ভবিষ্যতে পাড়ের রূপ আরও বদলাতে পারে।
পশ্চিম পাড়ে নজরুলের স্মৃতি
ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ে রয়েছে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের এক রঙিন অধ্যায় জড়িয়ে আছে কুমিল্লার সঙ্গে — ১৯২০-এর দশকে তিনি বারবার এই শহরে এসেছেন, থেকেছেন, লিখেছেন; কুমিল্লার দৌলতপুরে তাঁর বিয়েও হয়েছিল। শহর ঘুরতে গেলে স্মৃতিকেন্দ্রটি দেখে আসুন — নজরুল-প্রেমীদের জন্য এটি আবেগের ঠিকানা।
রানীর দিঘি ও ভিক্টোরিয়া শিক্ষা-ঐতিহ্য
ধর্মসাগর থেকে অল্প হাঁটাপথে কান্দিরপাড়ে আরেক ঐতিহাসিক জলাশয় রানীর দিঘি — যার পাড়ে দাঁড়িয়ে কুমিল্লার শিক্ষা-ইতিহাসের দুই স্তম্ভ। দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে মনোহরপুরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৬ সালে — জমিদার রায় আনন্দচন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠিত ‘রায় এন্ট্রান্স স্কুল’ই পরে মহারানী ভিক্টোরিয়ার নামে এই স্কুলে রূপ নেয়। আর দিঘির পশ্চিম পাড়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ — দানবীর রায় বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায় ১৮৯৯ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার স্মরণে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন; প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজ ১৯৬৮ সালে সরকারি হয়; ১৯৬২–৬৩ সালে ডিগ্রি শাখা সরে যায় ধর্মপুরের নতুন ক্যাম্পাসে — পুরনো ক্যাম্পাসে এখনো রয়েছে অধ্যক্ষের কার্যালয়, গ্রন্থাগার, মিলনায়তন ও পুরনো ভবনগুলো। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ — প্রতিটি আন্দোলনে এই কলেজের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা গর্বের ইতিহাস; দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে এর খ্যাতি আজও অটুট, এমনকি বিপিএলের দল ‘কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস’-এর নামটাও এই কলেজের স্মরণেই। ঘোরার সময় কলেজের পুরনো ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সামনে রায় বাহাদুরের সাদা ভাস্কর্যটি চোখে পড়বে (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলাকালে ভেতরে প্রবেশের নিয়ম মেনে চলুন)।
শহরের নামকথা ও আরও দিঘি
‘কুমিল্লা’ নামের উৎপত্তি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে — একটি প্রচলিত মতে প্রাচীন ‘কমলাঙ্ক’ নাম রূপ বদলে আজকের কুমিল্লা হয়েছে। দীর্ঘকাল ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ থাকা এই জনপদ ব্রিটিশ আমলে ত্রিপুরা জেলার সদর দপ্তর ছিল — সেই প্রশাসনিক-বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দু থেকেই আজকের শহরের গোড়াপত্তন। দিঘির শহর কুমিল্লায় ধর্মসাগর ছাড়াও আরও পুরনো জলাশয় আছে — তার মধ্যে পরিচিত নানুয়া দিঘি, যার পাড়েও সকাল-বিকেলে হাঁটতে বের হওয়া মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। পুরনো শহরের গলি ধরে হাঁটলে চোখে পড়বে — এসব দিঘিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল মহল্লা, বাজার আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; কুমিল্লার নগর-জীবনের প্রাচীনতম নকশাটাই দিঘি-কেন্দ্রিক।
আরও দুটি পরিচিতি: খাদি ও পুরনো শহর
শহরের ঐতিহ্যের আরেক সূত্র কুমিল্লার খাদি — হাতে বোনা এই কাপড়ের খ্যাতি দেশজুড়ে। জানা যায়, অসহযোগ-খাদি আন্দোলনের যুগে ১৯২১ সালে কুমিল্লায় অভয় আশ্রম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এখানে খাদি আন্দোলন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, আর গান্ধীজির কুমিল্লা সফর সেই ইতিহাসকে আরও উজ্জ্বল করে। শত বছর পেরিয়েও কুমিল্লার খাদি তার সুনাম ধরে রেখেছে — শহরে গেলে খাঁটি খাদির দোকান খুঁজে নেওয়া যায়। শহরের পুরনো এলাকাগুলো — কান্দিরপাড়, রাজগঞ্জ, ঝাউতলা, মনোহরপুর — হাঁটতে হাঁটতেই পুরনো বাড়ি, মন্দির-মসজিদ আর শতবর্ষী দোকানপাটের দেখা মিলবে; ইতিহাস এখানে জাদুঘরে নয়, রাস্তার ধারেই বেঁচে আছে।
কীভাবে ঘুরবেন
ধর্মসাগর, রানীর দিঘি ও ভিক্টোরিয়া কলেজ — সবই শহরের কেন্দ্রে, একে অপরের রিকশা-দূরত্বে। ঢাকা থেকে বাসে এলে শাসনগাছা বা জাঙ্গালিয়া নেমে রিকশায় বাদুরতলা; রেলস্টেশন থেকে রিকশা/সিএনজিতে সরাসরি ধর্মসাগর (৮০–১২০ টাকা, সূত্র: ভ্রমণ-গাইড)। সবচেয়ে ভালো সময় ভোরবেলা (প্রাতঃভ্রমণের শান্ত পরিবেশ) কিংবা বিকেল-সন্ধ্যা (দিঘির পাড়ের মিলনমেলা)। ময়নামতী ঘোরার দিনে ফেরার পথে ১–২ ঘণ্টা হাতে রাখলেই শহরের এই পর্বটা শেষ করা যায় — প্রবেশে কোনো ফি লাগে না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ধর্মসাগর কে খনন করেছিলেন?
ত্রিপুরার রাজা ধর্মমাণিক্য (প্রথম) — ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দে, পানীয় জলের সংকট দূর করতে। তাঁর তাম্রশাসনেই এই উৎসর্গের লিপিবদ্ধ প্রমাণ আছে।
দিঘিতে নৌকা বা গোসল করা যায়?
নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা পাড়ে থাকলেও গোসলের জন্য পরিবেশ এখন উপযোগী নয় বলে মনে করেন অনেকে — স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলুন, দিঘির পানি পরিষ্কার রাখুন।
ভিক্টোরিয়া কলেজের ভেতরে ঢোকা যায়?
এটি সক্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান — পর্যটক হিসেবে অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে ঢোকা উচিত নয়; বাইরে থেকে পুরনো ভবন ও ফটক দেখেই ঐতিহ্যের স্বাদ নিন।
শহর ঘোরা আর ময়নামতী — একদিনে হয়?
অবশ্যই। সকালে ওয়ার সেমেট্রি ও কোটবাড়ির ময়নামতী, বিকেলে ধর্মসাগর পাড়ে চা-আড্ডা — এই ক্রমটাই সবচেয়ে স্বস্তিকর। আর কুমিল্লায় এসে রসমালাই না খেলে তো ভ্রমণই অসম্পূর্ণ — সে গল্প আমাদের পরের পর্বে।
শেষকথা
বিহারের শহর কুমিল্লার ভেতরে লুকিয়ে থাকা এই দিঘি-কেন্দ্রিক অধ্যায়টা না দেখলে ভ্রমণটা অর্ধেক থেকে যায় — ছয়শো বছরের পানি আর দেড়শো বছরের পাঠশালা একই পাড়ায়। এর পরের গন্তব্য হতে পারে শহরের বাইরের নীরব ইতিহাস — ময়নামতী ওয়ার সেমেট্রি ও লালমাই পাহাড়।