• 30 Oct, 2026

মানিকগঞ্জের শিবালয়ে তেওতা জমিদার বাড়ি — পঞ্চানন সেনের তিনশ বছরের প্রাসাদ, নজরুল-প্রমীলার প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি, ১৮৫৮ সালের নবরত্ন মন্দির, বর্তমান ধ্বংসপ্রায় অবস্থা ও আরিচা হয়ে যাতায়াতসহ গাইড।

মানিকগঞ্জের দুই বিখ্যাত জমিদার বাড়ির একটি বালিয়াটি — প্রাচীরঘেরা সাত প্রাসাদের অক্ষত রাজকীয়তা। অন্যটি তার উল্টো ছবি: শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামে যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা তেওতা জমিদার বাড়ি — দরজা-জানালাহীন, অর্ধধ্বসা, তবু ইতিহাস ও প্রেমের স্মৃতিতে দেশের সবচেয়ে রোমান্টিক ধ্বংসাবশেষগুলোর একটি। কারণ এ বাড়ির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রমীলা দেবীর প্রেমের গল্প।

তামাক-ব্যবসায়ীর প্রাসাদ

জনশ্রুতি অনুযায়ী, দরিদ্র কিশোর পাঁচু সেন তামাকের ব্যবসায় ভাগ্য গড়ে পঞ্চানন সেন নামে দিনাজপুর অঞ্চলে জমিদারি কেনেন, তারপর আনুমানিক তিনশ বছর আগে তেওতায় এই প্রাসাদের গোড়াপত্তন করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পরবর্তীকালে জমিদারি ভাগ হয়ে যায় দুই এস্টেটে — উত্তরাংশ হেমশংকর এস্টেট, দক্ষিণাংশ জয়শংকর এস্টেট; প্রতিটি অংশের সামনে নাটমন্দির (বারসিক নিউজ/আদার ব্যাপারী)। ৭.৩৮ একর জমিতে মূল প্রাসাদসহ মোট ৫৫টি কক্ষ; পূর্বদিকের লালদিঘি ভবন ছিল অন্দরমহল — সামনে দুই শানবাঁধানো ঘাটসহ বড় পুকুর লালদিঘি, যার এক ভবনের নিচে রহস্যময় গুপ্ত কুঠুরি, স্থানীয়দের ভাষায় "অন্ধকূপ" (বারসিক নিউজ)। স্থাপত্যে মোগল ও ইউরোপীয় রীতির মিশ্রণ (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রাঙ্গণে ১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় তেওতা একাডেমি, যা আজও চলছে (দ্য ডেইলি স্টার)। ১৯৪৭ সালে শেষ উত্তরাধিকারী দুজন ভারতে চলে গেলে বাড়িটি পরিত্যক্ত হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

নজরুল ও প্রমীলা: পাশের বাড়ির মেয়ে

একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দিয়ে শুরু করা যাক: প্রমীলা দেবী এই প্রাসাদের বাসিন্দা ছিলেন না — তাঁর পরিবার থাকত প্রাসাদের ঠিক পাশের বাড়িতে (দ্য ডেইলি স্টার, ২০২৫)। প্রমীলার আসল নাম আশালতা সেনগুপ্ত, ডাকনাম দোলনা বা দুলি; পিতা বসন্ত কুমার সেন। পিতার ভ্রাতুষপুত্র বীরেন সেনের সঙ্গে নজরুলের সখ্যের সূত্রে কবির যাতায়াত ছিল সেই বাড়িতে (আদার ব্যাপারী)। স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনায়, আনুমানিক ১৯২১ সালে প্রাসাদের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইতে এসে নজরুল প্রথম আশালতাকে দেখেন (দ্য ডেইলি স্টার)। জনশ্রুতি বলে, এই প্রাসাদপ্রাঙ্গণেই কবি লিখেছিলেন অমর পঙক্তি — "তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সেকি মোর অপরাধ" (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল তাঁদের বিয়ে হয়, আর "প্রমীলা" নামটি কবি নিজেই স্ত্রীকে দেন (দ্য ডেইলি স্টার)। যমুনাপাড়ে বসে নজরুল এখানে বহু কবিতা-গান রচনা করেছিলেন বলেও জানা যায়; ২০০৮ সাল থেকে তেওতায় নিয়মিত পালিত হয় দুজনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী (দ্য ডেইলি স্টার)। সাহিত্যিক-স্মৃতির এই ধারায় কুষ্টিয়ার মীর মশাররফ হোসেনের লাহিনীপাড়াও উল্লেখযোগ্য আরেক ঠিকানা।

আজ যা দেখবেন — সত্যি কথা

আশা বাস্তবসম্মত রাখুন: প্রাসাদটি এখন মূলত কঙ্কালসার কাঠামো — দরজা-জানালা প্রায় নেই, ছাদে ফাটল, কয়েকটি কক্ষ আংশিক ধসে পড়েছে, জমির বড় অংশ দখলে (দ্য ডেইলি স্টার, ২০২৫)। তবে প্রাঙ্গণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণটি ভালো অবস্থায় আছে: ১৮৫৮ সালে নির্মিত চারতলা নবরত্ন মন্দির — ৭৫ ফুট উঁচু, সংস্কারকৃত অবস্থায় অক্ষত, যা এ অঞ্চলের বিরল স্থাপত্যরত্ন (দ্য ডেইলি স্টার/আদার ব্যাপারী)। লালদিঘির ঘাট, নাটমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আর যমুনার পাড় মিলিয়ে জায়গাটির আকর্ষণ স্থাপত্যের ঝলকে নয় — ইতিহাসের স্তরে। ধ্বংসপ্রায় ভবনের ভেতরে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ; বাইরে থেকে দেখাই নিরাপদ।

যাতায়াত

ঢাকার গাবতলী থেকে আরিচাগামী বাসে আরিচা ঘাট (ঢাকা থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার, বাসে আনুমানিক তিন ঘণ্টা — আদার ব্যাপারী; ভাড়া বদলায় বলে অঙ্ক দেওয়া হলো না), সেখান থেকে রিকশা/অটোতে মাত্র প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে তেওতা (দ্য ডেইলি স্টার)। আরিচা ঘাটের পদ্মাপারের ব্যস্ততা আর তেওতার নীরব ধ্বংসাবশেষ একই দিনে মিলিয়ে নেওয়া যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

তেওতা জমিদার বাড়ি কেন বিখ্যাত?

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রমীলা দেবীর প্রেম-স্মৃতি এবং ৭৫ ফুট উঁচু নবরত্ন মন্দিরের জন্য (দ্য ডেইলি স্টার)।

প্রমীলা দেবীর আসল নাম কী?

আশালতা সেনগুপ্ত; "প্রমীলা" নামটি বিয়ের পর নজরুলের দেওয়া (দ্য ডেইলি স্টার)।

বাড়িটি কে তৈরি করেন?

জনশ্রুতি অনুযায়ী তামাক-ব্যবসায়ী পঞ্চানন সেন, আনুমানিক তিনশ বছর আগে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

বাড়িটির বর্তমান অবস্থা কেমন?

ধ্বংসপ্রায় ও পরিত্যক্ত; তবে নবরত্ন মন্দির (১৮৫৮) সংস্কারসহ অক্ষত আছে (দ্য ডেইলি স্টার)।

তেওতা কীভাবে যাবেন?

গাবতলী থেকে বাসে আরিচা ঘাট, সেখান থেকে রিকশা/অটোতে প্রায় ৩ কিলোমিটার (আদার ব্যাপারী)।

শেষকথা

বালিয়াটি দেখায় জমিদারির গৌরব, তেওতা দেখায় তার ক্ষয় — আর দুটোর মাঝখানে নজরুলের প্রেমের গল্প তেওতাকে করে তুলেছে অনন্য। সংরক্ষণের অভাবে প্রতিদিন ঝরছে এই ঐতিহ্য; যতদিন আছে, একবার দেখে আসুন — আর সেই দেখাই হোক সংরক্ষণের দাবির কণ্ঠ।