দক্ষিণ বাংলার প্রাণকেন্দ্র বরিশাল — কীর্তনখোলা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এমন এক শহর, যেখানে সন্ধ্যা নামলেই লঞ্চঘাটে ভিড় জমে, বেলস পার্কের মাঠে আড্ডা বসে, আর নদীর হাওয়ায় ভেসে আসে জীবনানন্দের কবিতার গন্ধ। নদী-খালের জালের জন্য একে স্নেহে ডাকা হয় "বাংলার ভেনিস"। বিভাগীয় সদর এই শহরটি দক্ষিণাঞ্চল ভ্রমণের স্বাভাবিক ঘাঁটি — এখান থেকে দুর্গাসাগর, লাকুটিয়া, গুঠিয়া কিংবা কুয়াকাটার দিকে ছড়িয়ে পড়া যায়।
কীর্তনখোলা ও লঞ্চঘাট: নদীর সঙ্গে বাঁধা শহর
বরিশাল শহর গড়ে উঠেছিল মোঘল আমলে প্রতিষ্ঠিত লবণচৌকি গিরদে বন্দরকে কেন্দ্র করে (ভ্রমণগাইড); আজকের কীর্তনখোলা নদীর পাড়ের নদীবন্দরটি দেশের অন্যতম প্রাচীন ও দ্বিতীয় বৃহত্তম নদীবন্দর (ভ্রমণগাইড)। নদীটি শায়েস্তাবাদ থেকে শুরু হয়ে গাবখান খালের কাছে গজালিয়া নদীতে মিলেছে; বর্তমানে এটি "বরিশাল নদী" নামেও পরিচিত (পর্যটন বিডি)। নদীপাড়ের দুটি ঠিকানা অবশ্যই দেখবেন: ত্রিশ গোডাউন — একদা ৩০টি গুদামের ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র, আজ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধসহ পার্ক ও নদীদৃশ্যের প্রিয় জায়গা (এভেন্ডো); আর কীর্তনখোলার পাড়ে মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, উদ্বোধন ২০১১ সালে — ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধে সাজানো শান্ত চত্বর (এভেন্ডো)। পড়ন্ত বিকেলে কীর্তনখোলায় নৌবিহার বরিশাল ভ্রমণের সবচেয়ে সহজ আনন্দ — ঘাট থেকে স্থানীয় নৌকা পাওয়া যায়। দক্ষিণের নদীভ্রমণের পরের ধাপ হিসেবে অনেকেই এখান থেকে পরিকল্পনায় রাখেন সুন্দরবনের লঞ্চ সফর।
বঙ্গবন্ধু উদ্যান (বেলস পার্ক) ও বিবির পুকুর
শহরের প্রাণকেন্দ্র ব্যান্ড রোডে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ বঙ্গবন্ধু উদ্যান — পুরনো নামেই বেশি চেনা, বেলস পার্ক (বরিশাল সিটি কর্পোরেশন/এভেন্ডো)। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা আর সান্ধ্য হাঁটার কেন্দ্র এই উদ্যান; চারপাশে শহরের প্রধান সড়ক ও প্রতিষ্ঠান। উদ্যানের কাছেই শহরের মাঝখানে ঐতিহ্যবাহী বিবির পুকুর — শতবর্ষী এই পুকুরপাড় বরিশালের প্রাচীনতম নাগরিক ঠিকানাগুলোর একটি (সিটি কর্পোরেশনের উল্লেখযোগ্য স্থানের তালিকায় দুটোই রয়েছে)। একই এলাকায় সদর রোডে দাঁড়িয়ে আছে অশ্বিনী কুমার টাউন হল — শহরের উন্নয়নের প্রাণপুরুষ মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্তের নামে নামকরণ করা ঐতিহ্যবাহী মিলনায়তন (পর্যটন বিডি)।
অশ্বিনী কুমারের শিক্ষানগরী: বি এম কলেজ ও জিলা স্কুল
বরিশালের শিক্ষা-ঐতিহ্যের বীজ বুনেছিলেন মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত: ১৮২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল জিলা স্কুলের (বাংলা উইকিপিডিয়া) পর ১৮৮৪ সালের ২৭ জুন তিনি পিতা ব্রজমোহন দত্তের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রজমোহন স্কুল; তারই ধারাবাহিকতায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রমেশচন্দ্র দত্তের অনুরোধে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুন যাত্রা শুরু করে ব্রজমোহন কলেজ — বি এম কলেজ (প্রথম আলো/বাংলা উইকিপিডিয়া)। সত্য, প্রেম, পবিত্রতার আদর্শে গড়া এই কলেজের মান এককালে এতটাই খ্যাতি পায় যে একে ডাকা হতো "দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড" (আজকের পত্রিকা)। ১৯৬৫ সালের ১ জুলাই কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়। প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থীর এই ক্যাম্পাসে (প্রথম আলো) হেঁটে বেড়ানো মানেই বরিশালের ইতিহাসে হাঁটা।
জীবনানন্দের বরিশাল: "ধানসিড়ি" বাড়ির খোঁজে
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্ম নেওয়া কবি জীবনানন্দ দাশ পড়েছেন ও পরবর্তীতে ইংরেজি পড়িয়েছেন এই বি এম কলেজেই (প্রথম আলো)। জীবনানন্দ দাশ সড়কে (আগের বগুড়া রোড) সর্বানন্দ ভবনে — ঠাকুরদা সর্বানন্দ দাশের নামে বাড়ি — কলকাতা চলে যাওয়ার আগে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত থেকেছে কবির পরিবার; পরবর্তীতে মালিকানা বদলালেও বাড়িটি পায় কাব্যিক নাম "ধানসিড়ি" (ডাকবাংলা)। সৎ সতর্কতা: বাড়িটির "হাল খারাপ, আসল চেহারা আর কিছুই অবশিষ্ট নেই" (ডাকবাংলা) — তাই এখানে যাবেন কবির শহরটাকে অনুভব করতে, স্থাপত্য দেখতে নয়। আর কবির সেই ধানসিড়ি নদীটি বয়ে চলেছে পাশের জেলা ঝালকাঠি দিয়ে — এ জেলার গাইডে তা আবার আসবে।
কীভাবে যাবেন: লঞ্চই এই পথের রাজা
সড়কপথ: পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা থেকে বরিশাল প্রায় ১৮০ কিলোমিটার; বাসে এখন মাত্র ৩–৩.৫ ঘণ্টা (ভ্রমণগাইড) — ভাড়া নন-এসি ৬২৫–৯০০ টাকা, এসি ৭০০–১,৩৫০ টাকা (ভ্রমণগাইড)। নৌপথ: সদরঘাট থেকে নৌদূরত্ব ১৭৮ কিলোমিটার; রাত ৮–৯টায় ছাড়া বড় বিলাসবহুল লঞ্চে ঘুমিয়ে ভোরে বরিশাল পৌঁছানো এই রুটের চিরায়ত অভিজ্ঞতা — ২০২৬ সালের ভাড়া তালিকা অনুযায়ী ডেক ৩৫০–৪০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১,০০০–১,২০০, ডাবল কেবিন ২,০০০–২,৪০০ টাকা (বাংলাকথন)। এছাড়া বিমানেও ঢাকা-বরিশাল যাওয়া যায় (ভ্রমণগাইড)। শহরে থাকার জন্য সদর রোড এলাকায় নানা মানের হোটেল রয়েছে; খাবারে বরিশালের ইলিশ, স্থানীয় দই-রসগোল্লা আর শীতের খেজুরের রসের পিঠা অবশ্যই চেখে দেখুন। দক্ষিণের সফর এখানে শেষ না করে অনেকে জুড়ে দেন পাশের বিভাগীয় শহর খুলনা — বাসে সহজ যাতায়াত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বরিশালকে বাংলার ভেনিস বলা হয় কেন?
শহর ও জেলাজুড়ে নদী-খালের ঘন জালের জন্য — কীর্তনখোলা ছাড়াও মেঘনা, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, বিশখালী, আড়িয়াল খাঁ, বলেশ্বর ও সুগন্ধা বয়ে গেছে এই অঞ্চল দিয়ে।
ঢাকা থেকে বরিশাল যাওয়ার সেরা উপায় কী?
সময়ে দ্রুত হলে পদ্মা সেতু হয়ে বাস (৩–৩.৫ ঘণ্টা); অভিজ্ঞতা চাইলে সদরঘাট থেকে রাতের লঞ্চ — ভোরে পৌঁছে যাবেন কীর্তনখোলার ঘাটে।
একদিনে শহরে কী কী দেখা যায়?
কীর্তনখোলা লঞ্চঘাট, ত্রিশ গোডাউন, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, বঙ্গবন্ধু উদ্যান (বেলস পার্ক), বিবির পুকুর, অশ্বিনী কুমার টাউন হল, বি এম কলেজ ক্যাম্পাস ও জীবনানন্দের ধানসিড়ি বাড়ি।
বি এম কলেজ কবে প্রতিষ্ঠিত?
১৮৮৯ সালের ১৪ জুন, মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত কর্তৃক পিতা ব্রজমোহন দত্তের নামে; "দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড" নামে খ্যাত।
জীবনানন্দ দাশের বাড়ি কি দেখা যায়?
ধানসিড়ি নামের বাড়িটি জীবনানন্দ দাশ সড়কে আছে, তবে মূল চেহারা প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই (ডাকবাংলা) — পরিদর্শনটি স্মৃতির, স্থাপত্যের নয়।
শেষকথা
বরিশাল শহর তাড়াহুড়োর গন্তব্য নয় — এর সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে লঞ্চের ডেকে চা খেতে খেতে ভোরের নদী দেখায়, বেলস পার্কের সান্ধ্য আড্ডায় আর এক কবির পদচিহ্ন খুঁজে বেড়ানোয়। দক্ষিণ বাংলার যেকোনো বড় সফরের শুরুটা এখান থেকেই হওয়া উচিত।