বেশিরভাগ পর্যটক সুনামগঞ্জ শহরকে দেখেন শুধু টাঙ্গুয়ার হাওরের যাত্রাবিরতি হিসেবে — রাতে বাস থেকে নেমে সকালে ঘাটের দিকে ছুট। অথচ এই শহর নিজেই এক জীবন্ত অধ্যায়: এখানেই সুরমার তীরে জন্মেছিলেন বাংলার মরমি কবিতার সবচেয়ে আলাদা কণ্ঠদের একজন — দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী। হাওর-ভ্রমণে অর্ধেক দিন শহরের জন্য রেখে দিলে লাভ আপনারই।
হাসন রাজা: জমিদার থেকে মরমি
- জন্ম ও শৈশব:১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর (৭ পৌষ ১২৬১), সুনামগঞ্জ শহরের কাছেই সুরমা নদীর তীরে লক্ষ্মণশ্রী পরগণার তেঘরিয়া গ্রামে (বাসস)। বাবা প্রতাপশালী জমিদার দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী, মা হুরমত বিবি; হাসন ছিলেন তৃতীয় সন্তান। মাত্র ১৫ বছর বয়সে জমিদারিতে অভিষিক্ত হন; জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের হিসাবে তার জমি ছিল ৫ লাখ ২৭ হাজার বিঘা — সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, রামপাশা, লক্ষ্মণশ্রী ও সিলেটের একাংশজুড়ে (বাসস)।
- বদলে যাওয়া জীবন: ঐশ্বর্যের মাঝেই ১৮৯৭-এর ভয়াবহ ভূমিকম্প আর মায়ের মৃত্যু (১৯০৪) তার জীবনদর্শন ওলটপালট করে দেয় বলে জীবনীকারদের ধারণা; বিলাসী জমিদার ক্রমে পরিণত হন সংসার-বিরাগী মরমি সাধকে, নিজেকে ডাকতে শুরু করেন ‘হাসন জান’।
- গান: উচ্চারিত সংখ্যা নিয়ে একমত নেই — বিশ্বাস করা হয় প্রায় দুই শতাধিক গান তার রচিত, অনেকটাই লোকমুখে সংরক্ষিত (নিউ এজ)। ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয় তার গানের সংকলন ‘হাসন উদাস’ — ২০৬টি গান নিয়ে; পরে ‘হাসন রাজার তিনপুরুষ’সহ নানা প্রকাশনায় আরও গান এসেছে (বাসস/নিউ এজ)। অমর হয়ে আছে ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়া রে’ কিংবা ‘লোকে বলে বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা না আমার’ — ধর্ম-বর্ণের বিভেদ পেরিয়ে মানবতার এই গানই তার দর্শন।
- রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতি: বিশ্বকবি ১৯২৫ সালে কলকাতায় এবং পরে লন্ডনের হিবার্ট বক্তৃতায় হাসন রাজার গানের প্রশংসা করেছিলেন ও উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন (বাসস/নিউ এজ) — গ্রামের জমিদার-কবির দর্শন পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বের মঞ্চে।
- মৃত্যু ও সমাধি:১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর মৃত্যু। লক্ষ্মণশ্রীতে মায়ের কবরের পাশে সমাহিত হন — কবরটি তিনি মৃত্যুর আগেই নিজে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন, আর এপিটাফ হিসেবে লেখা আছে ‘মাটির পিঞ্জিরা’ গানের কলি; লোকবিশ্বাস, গানটি তিনি নিজের কবরকে নিয়েই রচনা করেছিলেন (বাসস)।
শহরে হাসন রাজার ঠিকানাগুলো
- হাসন রাজার বাড়ি ও সমাধি, লক্ষ্মণশ্রী: শহরের কাছেই — সুরমার পাড়ের এই এলাকাই ছিল কবির প্রিয়তম জায়গা (‘কতদিন থাকিবায় লক্ষণছিরি রে হাসন রাজা’ — নিজের গানেই লিখে গেছেন)। জেলা শহরে তার সমাধি ও হাসন রাজা মিউজিয়াম-এর কথা প্রথম আলোও তাদের পর্যটন-প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
- সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর: শহরের প্রাণকেন্দ্রে, পুরনো কালেক্টরেট ভবনে; প্রবেশ টিকিট ২০ টাকা (ঢাকা ট্রিবিউন)। জেলার লোকঐতিহ্য আর প্রত্নসম্পদ এক ছাদের নিচে — শহর বোঝার সেরা শুরু এটাই।
শহরের বাকি সার্কিট
- গৌরারং জমিদার বাড়ি: শহর থেকে কয়েক কিমি পশ্চিমে, ~৩০ একর জুড়ে প্রায় দুইশ বছরের পুরনো জমিদার বাড়ি — ছয়টি আলাদা ভবন (উইকিভ্রমণ)। চৌধুরী বংশের প্রতাপশালী জমিদার রাম গোবিন্দ চৌধুরীর আমলে এর বিস্তার; রংমহলের দেয়ালে নারী-মূর্তি ও লতাপাতার আল্পনা-কারুকাজ আজও চোখে পড়ে (ষাটমাকণ্ঠ)। তবে প্রত্যাশা যুক্তিসঙ্গত রাখুন — ভূমিকম্প ও ১৯৭১-এর ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটি আজ জরাজীর্ণ, অনেকটাই অযত্নে (ষাটমাকণ্ঠ/পর্যটন বিচিত্রা)।
- ডলুরা স্মৃতিসৌধ ও নারায়ণতলা: সীমান্তবর্তী ডলুরা এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সমাধিসৌধ; পাশে বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে (প্রথম আলো)। ডলুরা বর্ডার হাট বর্তমানে বন্ধ (ঢাকা ট্রিবিউন) — হাটের আশায় যাবেন না।
- সুরমা ভ্যালি ডিসি পার্ক: শহরতলীর ধারারগাঁওয়ে (হালুয়ারঘাট খেয়াঘাট সংলগ্ন), প্রবেশ ২০ টাকা; শিশুদের দোলনা, মিনি সুইমিংপুল, ফুলের বাগান, ক্যান্টিন (ঢাকা ট্রিবিউন) — পরিবার নিয়ে বিকেল কাটানোর জায়গা।
- পাগলা বড় জামে মসজিদ: জেলার ধর্মীয় পর্যটনের তালিকায় প্রথম আলোর উল্লেখিত বড় মসজিদ — শহর সার্কিটে যুক্ত করা যায়।
- সুরমা নদীর ঘাট: সাহেববাড়ী ঘাটসহ শহরের ঘাটগুলো থেকে হাউসবোট ছাড়ে (বাসস); সন্ধ্যায় নদীপাড়ে হাঁটা আর চায়ের দোকানের আড্ডা এই শহরের নিজস্ব আমেজ। সময় থাকলে চলতি নদী ও দেখার হাওরে নৌকাভ্রমণও শহর থেকেই সাজানো যায় (প্রথম আলো)।
থাকা-খাওয়া ও ব্যবহারিক টিপস
শহরে এখন নানা মানের আবাসিক হোটেল (সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেবা উন্নত হয়েছে — বাসস); বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন এলাকায় থাকলে ভোরের ট্রান্সফারে সুবিধা হয়। খাওয়ায় হাওরের মাছই আকর্ষণ — শহরের হোটেলগুলোতে টাটকা হাওর-মাছের পদ মেলে। শহরের ভেতরে যাতায়াতে অটোরিকশা/মিশুকই যথেষ্ট; গৌরারং-ডলুরা ঘুরতে রিজার্ভ নেওয়া সুবিধাজনক।
একদিনের নমুনা সূচি
- সকাল: ঐতিহ্য জাদুঘর (শহরের কেন্দ্র) → লক্ষ্মণশ্রীতে হাসন রাজার বাড়ি-সমাধি।
- দুপুর: শহরে হাওরের মাছ দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ; বিশ্রাম।
- বিকেল: গৌরারং জমিদার বাড়ি → ডলুরা স্মৃতিসৌধ; সন্ধ্যায় সুরমা ভ্যালি পার্ক/নদীঘাটে চা — রাতের বাসে ঢাকা অথবা পরদিন ভোরে হাওর।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হাসন রাজার বাড়ি কি এখনো টিকে আছে?
লক্ষ্মণশ্রীতে কবির বাড়ি ও সমাধি দর্শনীয় স্থান হিসেবে চিহ্নিত (ঢাকা ট্রিবিউন/প্রথম আলো); স্থাপত্য জরাজীর্ণ হওয়াই স্বাভাবিক — এটি ঐতিহ্যদর্শন, প্রাসাদ-ভ্রমণ নয়।
শহর ঘুরতে কত সময় লাগবে?
মূল স্পটগুলোতে অর্ধেক দিনই যথেষ্ট; ডলুরা পর্যন্ত গেলে পুরো দিন হাতে রাখুন।
হাওর-সফরের সঙ্গে শহর কখন মেলাবেন?
হাওর থেকে ফেরার দিন বিকেলটা — এতে থাকা-খরচ বাঁচে, আর শহরটাও দেখা হয়।
শেষকথা
সুনামগঞ্জ মানে শুধু হাওর নয় — একজন কবি-জমিদারের দর্শন, আড়াইশ বছরের জমিদারবাড়ি আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে এক পূর্ণাঙ্গ শহর। ফেব্রুয়ারিতে এলে সঙ্গে রাখুন শিমুল বাগান; পরের পোস্টে আমরা যাচ্ছি প্রাচীন লাউড় রাজ্যের গড়ে।