পাবনা জেলার পশ্চিম প্রান্তের ঈশ্বরদী — শতবর্ষ ধরে যার পরিচয় রেলের শহর, আজ তার আকাশে নতুন চিহ্ন: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিশাল কুলিং টাওয়ার। এই পোস্টে দুটোই — পুরনো জংশন-শহরের গল্প আর দেশের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি-প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা, যার একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ঘটল ঠিক এই পোস্ট লেখার আগের দুই দিনে।
রেলের শহর: দেশের বৃহত্তম জংশন
বাংলা উইকিপিডিয়ার ভাষায় ঈশ্বরদীকে বলা হয় "রেলের শহর" ও পাবনার প্রাণকেন্দ্র; এখানে আছে বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে জংশন ও ইয়ার্ড — ব্রিটিশ আমলে গড়া, প্রায় শতবর্ষের পুরনো এই স্টেশন দিয়েই উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ট্রেন বদলায় পথ (বাংলা উইকিপিডিয়া/স্যাট একাডেমি)। প্রশাসনিক ইতিহাস ছোট: ১৯৪৯ সালে থানা, ১৯৮৩ সালে উপজেলা (বাংলা উইকিপিডিয়া)। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কারণে গড়ে ওঠা পাকশী এই উপজেলারই অংশ — ঈশ্বরদী ভ্রমণ মানেই জংশনের প্ল্যাটফর্মের চাঞ্চল্য, রেল কলোনির পুরনো ভবন আর পদ্মাপাড়ের বাতাস একসঙ্গে।
রূপপুর: প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুতের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ
রূপপুরে নির্মিত হয়েছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র — রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংস্থা রসাটমের নকশা ও ঠিকাদারিতে জেনারেশন ৩+ প্রযুক্তির দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর, মোট ক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট (রসাটম/ইনডেক্স নিউজ)। সর্বশেষ অবস্থা (অক্টোবর ২০২৬): প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর কোরে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর সেটি সর্বনিম্ন নিয়ন্ত্রণযোগ্য শক্তিস্তরে পৌঁছায়; ২৯ অক্টোবর ২০২৬ বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) "পাওয়ার স্টার্টআপ"-এর অনুমোদন দেয় এবং ৩০ অক্টোবর ২০২৬ বিকেলে প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয় (ঢাকা মেইল/জাগ্রত বাংলা/সমকাল)। পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়িয়ে ৩০০ মেগাওয়াটে নিয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে (জাগ্রত বাংলা)। এদিকে দ্বিতীয় ইউনিটের প্রাথমিক জ্বালানি লোডিংয়ের সরবরাহও শুরু হয়েছে — সাইবেরিয়ার নোভোসিবিরস্ক প্ল্যান্টে তৈরি জ্বালানি অ্যাসেম্বলির প্রথম চালান বিশেষ কার্গো ফ্লাইটে বাংলাদেশে পৌঁছেছে (সমকাল, রসাটমের প্রেস নোট)। সতর্কতা: কেন্দ্রটি উচ্চ-নিরাপত্তার সংরক্ষিত এলাকা — সাধারণ দর্শনার্থীর ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নেই; কুলিং টাওয়ার ও প্রকল্পের বিস্তার দেখতে হয় পাকশী ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকার বাইরে থেকে, আর এই দৃশ্যটাই এখন এলাকার সবচেয়ে চর্চিত ছবি।
পাকশীর ইপিজেড: শিল্পের নতুন অধ্যায়, পুরনো গল্পের পাশে
একসময় ঈশ্বরদী অঞ্চলের জীবিকা ঝুঁকেছিল নর্থ বেঙ্গল পেপার মিল ও আলহাজ্ব টেক্সটাইল মিলের ওপর (ডেইলি স্টার)। ২০০১ সালে পাকশীতে প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) সেই অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা আনে: বেপজার তথ্য অনুযায়ী এখানে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২১ হাজার মানুষের, কারখানাগুলোয় তৈরি হয় পোশাক, ডেনিম, উইগ, তাঁবু, ব্যাটারি, জুতা ও ইলেকট্রনিকসসহ নানা পণ্য; এখানকার একটি ডেনিম কারখানা ২০১২ সালে দেশের প্রথম LEED Platinum সনদপ্রাপ্ত সবুজ কারখানা হয় (ঢাকা টাইমস/বেপজা)। সৎ নোট: ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণে ইপিজেডটি প্রত্যাশিত পূর্ণ সম্ভাবনায় এখনো পৌঁছায়নি এবং ঈশ্বরদী বিমানবন্দরে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু নেই (ডেইলি স্টার, ২০২১) — শিল্প-গল্পের পাশাপাশি এই বাস্তবতাও জানা ভালো।
চিনিফসলের গবেষণা আর ফলের দেশ
কৃষি-গবেষণায়ও ঈশ্বরদীর নাম বড়: বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সদর দপ্তর এখানে — ১৯৫১ সালে ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে শুরু, ১৯৮৯ সালে ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, আর ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর বর্তমান নাম পায় (মাই এক্সামিনার)। আশপাশের এলাকা ফলচাষের জন্য পরিচিত — বেপজা নিজেই খাদ্য-প্রক্রিয়াজাত শিল্প টানতে এই খ্যাতির কথা বলেছে (ডেইলি স্টার); লিচুর মৌসুমে ঈশ্বরদীর বাগান এলাকা জীবন্ত হয়ে ওঠে। জেলা সদরের গল্পের জন্য আমাদের পাবনা শহরের পোস্ট দেখুন।
ভ্রমণ তথ্য
ঈশ্বরদীতে ট্রেনে আসাই সবচেয়ে স্বাভাবিক — দেশের বড় জংশন বলে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের অনেক ট্রেন এখানে থামে। রূপপুর কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করা যায় না; কুলিং টাওয়ারের সেরা দৃশ্য পাকশী-হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকা থেকে। ইপিজেড এলাকায় সাধারণ ভ্রমণার্থীর প্রবেশ সীমিত — বাইরে থেকে দেখাই নিয়ম। একদিনের পরিকল্পনা: জংশন ও শহর সকালে, দুপুরে পাকশী-সেতু-পদ্মাপাড়, বিকেলে গ্রিড-সংযোগের যুগের নতুন ল্যান্ডমার্ক দূর থেকে দেখে ফেরা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রূপপুর কেন্দ্রে কি ঢোকা যায়?
না — এটি সংরক্ষিত নিরাপত্তা এলাকা; বাইরে থেকে কুলিং টাওয়ার দেখা যায়।
কেন্দ্রটির ক্ষমতা কত?
দুটি ভিভিইআর-১২০০ ইউনিটে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট (রসাটম)।
প্রথম ইউনিটের সর্বশেষ খবর কী?
৩০ অক্টোবর ২০২৬ পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়েছে; ধাপে ধাপে ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়িয়ে গ্রিডে দেওয়ার পরিকল্পনা (ঢাকা মেইল/জাগ্রত বাংলা)।
ঈশ্বরদী কেন বিখ্যাত?
দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে জংশন, ইপিজেড, চিনিফসল গবেষণা ইনস্টিটিউট ও রূপপুর প্রকল্পের জন্য (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ কতদূর?
প্রাথমিক জ্বালানি লোডিংয়ের সরবরাহ শুরু হয়েছে; প্রথম চালান এসে পৌঁছেছে (সমকাল)।
শেষকথা
ঈশ্বরদী-রূপপুর একই জনপদের দুই শতকের গল্প: ব্রিটিশ আমলের জংশন থেকে পরমাণু যুগের কুলিং টাওয়ার। যে সপ্তাহে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুতের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলো, সেই সপ্তাহে এই শহরে দাঁড়ানো মানে ইতিহাসের এক বাঁক প্রত্যক্ষ করা।