দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার সবচেয়ে পুরনো জেলা শহরগুলোর একটি যশোর — ভৈরব নদের তীরের এই শহর একই সঙ্গে প্রশাসনিক কেন্দ্র, সীমান্ত-বাণিজ্যের দরজা, আর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদার নাম: ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর হয় দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা। জেলার বড় গন্তব্যগুলো — সাগরদাঁড়ির মধুপল্লী, বেনাপোল, চাঁচড়া — সবই এই শহরকে ঘাঁটি করে ঘোরা যায়; আর শহরের নিজের ভেতরেও লুকিয়ে আছে দুটি জাতীয় মাত্রার গল্প: একটি প্রেক্ষাগৃহ আর একটি সড়ক।
কালেক্টরেট চত্বর ও শহরের পুরনো প্রাণ
যশোরের নাগরিক জীবনের কেন্দ্র ঐতিহাসিক কালেক্টরেট ভবন-চত্বর ও পাশের কালেক্টরেট পার্ক — জেলা প্রশাসনের দপ্তরঘেরা এই সবুজ প্রাঙ্গণ শহরবাসীর সান্ধ্য আড্ডার জায়গা, আর ভবনগুলোর ঔপনিবেশিক রীতির গড়ন জেলা শহরটির বয়স মনে করিয়ে দেয়। কাছেই যশোর ইনস্টিটিউট ও পাবলিক লাইব্রেরি — প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শহরের সাংস্কৃতিক জীবন (নাটক, আবৃত্তি, বইমেলা-ধাঁচের আয়োজন) এখানেই গড়ে উঠেছে। শহরটি আকারে ছিমছাম: প্রধান সড়কগুলো পায়ে হেঁটে বা রিকশায় ঘোরা যায়, রেলস্টেশন (যশোর জংশন) ও বাস টার্মিনাল দুটোই নাগালে। বেনাপোল সীমান্তের কারণে শহরে ব্যবসায়ী ভ্রমণকারীর চাপ সারা বছর থাকে — হোটেল-রেস্টুরেন্টের সারি সেই চাহিদা মেটায়।
মনিহার: দেশের সবচেয়ে বড় পর্দাটির শেষ অধ্যায়
নিউ মার্কেটের পাশের এলাকাটির নামই হয়ে গেছে "মনিহার" — ১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করা এই প্রেক্ষাগৃহকে বলা হয় দেশের বৃহত্তম একক-পর্দার সিনেমা হল: মাত্র চার বিঘা জমিতে ১,৪৩০ আসন, নকশা স্থপতি কাজী মোহাম্মদ হানিফের, আর নির্মাণ-পরবর্তী সাজসজ্জার তত্ত্বাবধানে ছিলেন শিল্পী এস এম সুলতান স্বয়ং। উদ্বোধনী ছবি ছিল "জনি"; সবচেয়ে বেশি চলা ছবি "বেদের মেয়ে জোসনা" — ১৯৮৯ সালে টানা তিন মাস দিনে চার শো হাউসফুল। জাপান, কোরিয়া, রাশিয়া, ইংল্যান্ডসহ নানা দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এখানে ছবি দেখতে এসেছেন বলে হলটির ইতিহাসে লেখা আছে; ঢালিউডের প্রায় সব বড় মুক্তির প্রিমিয়ার হতো মনিহারেই। কিন্তু সময় বদলেছে: ২০১২ সালে সন্ত্রাসী হামলা-চাঁদাবাজিতে একবার বন্ধ হয়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে আবার চালু হলেও লোকসান কাটেনি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মালিকপক্ষ ঘোষণা দেন — একক-পর্দার মনিহার বন্ধ করে জায়গাটিতে মার্কেট সম্প্রসারণ ও আবাসিক হোটেল গড়া হবে (ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন); ভাঙনের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো নির্ধারিত নয়, পাশের মনিহার সিনেপ্লেক্স চালু থাকবে। সৎ পরামর্শ: এই কিংবদন্তি হলটিতে ছবি দেখার অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে দেরি করবেন না — প্রজন্মের সিনেমা-স্মৃতির এই ভবনটি যে কোনো সময় ইতিহাস হয়ে যেতে পারে।
যশোর রোড: মায়ের ব্রত থেকে গিন্সবার্গের কবিতা
শহর থেকে বেনাপোলের দিকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ — এই সড়কটি শুধু মহাসড়ক নয়, দুটি বিখ্যাত গল্পের বাহক। প্রথম গল্পটি উনবিংশ শতাব্দীর: প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী নলডাঙ্গার (বর্তমান ঝিনাইদহ) জমিদার কালী পোদ্দার তাঁর মা যশোদা দেবীর গঙ্গাস্নান-যাত্রার সুবিধার জন্য কালীগঞ্জ থেকে কলকাতার কালীঘাট পর্যন্ত এই সড়ক নির্মাণ করান; প্রখর রোদে মায়ের কষ্ট লাঘব করতে সড়কের দুই পাশে রোপণ করা হয় রেইনট্রি-কড়ই গাছ — সেই শতবর্ষী গাছের সারি আজও সড়কটির পরিচয়, আর মায়ের নামেই রোডের নাম "যশোর" বলে লোককথা প্রচলিত। দ্বিতীয় গল্পটি ১৯৭১-এর: মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ শরণার্থী এই সড়ক ধরে ভারতে পাড়ি দেন; সড়ক তখন বর্ষার পানিতে ডুবে থাকায় মার্কিন বিট-কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে নৌকাযোগে সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থী শিবিরগুলো দেখেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে লেখেন ১৫২ পঙ্ক্তির বিখ্যাত কবিতা "September on Jessore Road" — পরে বব ডিলানসহ শিল্পীদের নিয়ে গান-কনসার্টে শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন তিনি; মৌসুমী ভৌমিক কবিতাটির বঙ্গানুবাদ গানে রূপ দিয়েছেন। সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য এই শতবর্ষী গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়ে দুই দেশেই প্রতিবাদ ও আদালতের হস্তক্ষেপ হয়েছে বারবার — গাছগুলো তাই আজ শুধু ছায়া নয়, দুই বাংলার যৌথ ঐতিহ্য-আন্দোলনের প্রতীক। বেনাপোল যেতে যেতে এই সড়ক ধরে গাড়ি চললেই ইতিহাসের দুই যুগ একসঙ্গে পাড়ি দেওয়া যায়।
খাওয়া-দাওয়া: গুড় আর জামতলার মিষ্টি
যশোরের নিজস্ব স্বাদের তালিকায় সবার ওপরে খেজুরের গুড় — শীতকালে জেলার গ্রামে গ্রামে রস-গুড়ের ঐতিহ্য, শহরের বাজারে খাঁটি নলেন গুড়ের সন্ধান মেলে (ভেজালের যুগে চেনা বিক্রেতা থেকে কেনাই নিরাপদ)। আরেকটি স্থানীয় খ্যাতি জামতলার মিষ্টি — যশোর সদরের জামতলা এলাকার মিষ্টির দোকানগুলো জেলাজুড়ে পরিচিত। সঙ্গে নদীর মাছ ও সাধারণ বাঙালি হোটেল-খাবার তো আছেই। শহরের বাইরে বেরোলে যশোর ছিল প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রও — তার স্মৃতি দেখতে দক্ষিণে ঈশ্বরীপুর পর্যন্ত দিন-ভ্রমণ সাজানো যায়, যদিও সেটি এখন সাতক্ষীরার শ্যামনগরে পড়েছে।
থাকা ও যাতায়াত
ঢাকা থেকে যশোরে বাস (পদ্মা সেতু রুট) ও ট্রেন দুটোই চলে; যশোর জংশন থেকে খুলনা ও বেনাপোল পর্যন্ত রেল সংযোগ আছে — বেনাপোল হয়ে কলকাতাগামী যাত্রীদের জন্য শহরটি স্বাভাবিক রাত্রিযাপনের ঠিকানা। বেনাপোল স্থলবন্দরকেন্দ্রিক যাত্রীচাপের কারণে শহরে নানা মানের হোটেল রয়েছে — উৎসব ও ছুটির সময় আগাম বুকিং ভালো। শহরের ভেতরে রিকশা-ইজিবাইক, জেলার গন্তব্যগুলোর (সাগরদাঁড়ি ~৪৫ কিমি, বেনাপোল ~৩০ কিমি, চাঁচড়া শহরতলিতেই) জন্য বাস ও ভাড়া গাড়ি সহজলভ্য।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
যশোর কেন "প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা"?
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর যশোর পাকিস্তানি দখল থেকে মুক্ত হয় — জেলা পর্যায়ে এটিই প্রথম মুক্তি, তাই এই মর্যাদা।
মনিহার কি এখনো চালু আছে?
একক-পর্দার মূল হলটি বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে (ভাঙনের তারিখ নির্ধারিত হয়নি); পাশের মনিহার সিনেপ্লেক্স চালু থাকবে বলে মালিকপক্ষ জানিয়েছে। যেতে চাইলে আগে খোঁজ নিন।
যশোর রোডের গাছগুলো কত বছরের?
ঐতিহ্য অনুযায়ী ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রোপিত — অর্থাৎ দেড় শতকের কাছাকাছি বয়সী অনেক গাছ; প্রশস্তকরণের কারণে এগুলো কাটার উদ্যোগ নিয়ে প্রতিবাদ ও মামলা হয়েছে।
গিন্সবার্গের কবিতাটি কোন ঘটনার?
১৯৭১ সালে যশোর রোড ধরে ভারতে যাওয়া শরণার্থীদের দুর্দশা দেখে লেখা "September on Jessore Road" (১৯৭১) — পরে এটি গানে রূপ পায় ও শরণার্থী-সহায়তায় ব্যবহৃত হয়।
যশোর শহরে কত দিন থাকা উচিত?
শহর নিজে এক দিনেই ঘোরা যায়; জেলার গন্তব্যগুলো (সাগরদাঁড়ি, চাঁচড়া, বেনাপোল, ভরত ভায়না) মিলিয়ে ২–৩ দিনের ঘাঁটি হিসেবে আদর্শ।
শেষকথা
যশোর শহরের আকর্ষণ তার আকারে নয়, স্তরে — ঔপনিবেশিক প্রশাসন-ভবন, সিনেমার স্বর্ণযুগের শেষ সাক্ষী, আর বিশ্বসাহিত্যে ঢুকে যাওয়া একটি সড়ক। বেনাপোল বা সাগরদাঁড়ির পথে শুধু রাত কাটানোর জায়গা না ভেবে এই শহরে এক দিন সময় দিন — মনিহারে একটি শো দেখা, কালেক্টরেট পার্কে সন্ধ্যা আর যশোর রোডে গাছের ছায়ায় গাড়ি চালানো মিলে তা ফেরত পাবেন।