ঝিনাইদহ জেলা সদর সাধারণত পথের শহর — কালীগঞ্জের বারোবাজারের সুলতানি নগরী কিংবা নলডাঙ্গার মন্দিরের দিকে যাওয়ার মাঝখানে থেমে যাওয়া এক স্টপ। কিন্তু নবগঙ্গা নদীর এই শহরে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো ঐতিহ্যও কম নয়: দুই শ বছরের পুরনো এক জমিদার দালান, বাংলার গণিত-শিক্ষার ইতিহাসে নাম লিখিয়ে যাওয়া এক গণিতবিদের পরিত্যক্ত বাড়ি, এক রাজার খোঁড়া বিশাল দীঘি, আর এক বাউল সাধকের মাজার। এই গাইডে শহরটার সেই ধীর, ঐতিহ্য-ঘেঁষা মুখটাই তুলে ধরা হলো।
মিয়ার দালান: দুই শ বছরের জমিদার বাড়ি (মুরারীদহ)
সদর উপজেলার মুরারীদহে অবস্থিত মিয়ার দালান ঝিনাইদহ শহর-এলাকার সবচেয়ে পরিচিত পুরনো বাড়ি — বাংলাপিডিয়ার তালিকায় এটি "সেলিম চৌধুরীর বাড়ি (১৮২২)" নামে অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ নির্মাণকাল প্রায় দুই শ বছর আগের। স্থানীয়দের বর্ণনায় (বণিক বার্তা), ১৯৪৭ সালে ভবনটি সেলিম চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ায় অনেকে একে সেলিম চৌধুরীর বাড়ি নামেও চেনেন। জমিদার আমলের স্থাপত্যের ছাপ বহন করা দালানটি আজ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হতে বসেছে — ঝিনাইদহের ২১টি গেজেটভুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার বড় অংশের মতো এটিও যত্নের অপেক্ষায়। ভেতরে ঢোকার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই; বাইরে থেকে দেখা ও ছবি তোলাই সাধারণত দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা, স্থানীয়দের অনুমতি নিয়ে এগোনোই ভালো।
কে পি বসুর বাড়ি: গণিতবিদের নীরব ভিটে (হরিশংকরপুর)
কালীপদ বসু — ইতিহাসে "কে পি বসু" নামেই বিখ্যাত (১৮৬৫–১৯১৪) — ছিলেন প্রখ্যাত বাঙালি গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানশিক্ষক, কে পি বসু পাবলিশিং কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা; তাঁর লেখা গণিতের পাঠ্যবই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছাত্রদের হাতে ঘুরেছে। তাঁর বাড়িটি সদর উপজেলার হরিশংকরপুর গ্রামে, নবগঙ্গা নদীর তীরে — ১৯০৭ সালে নয় বিঘা জমির ওপর তিনি বাড়িটি নির্মাণ করেন (বণিক বার্তা)। দুঃখের বিষয়, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বাড়িটি আজ পরিত্যক্ত ও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে; স্থানীয়দের অভিযোগ, দর্শনীয় স্থান হওয়া সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণে প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখা যায়নি। আশার কথা — সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, বাড়িটি রক্ষার জন্য জেলা পরিষদের কাছে এরই মধ্যে একটি প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে; পাস হলে সীমানাপ্রাচীরসহ মূল ভবনের মেরামত শুরু হবে। পাঠকের জন্য সতর্কবার্তা: বাড়িটি ব্যক্তিগত/পরিত্যক্ত সম্পত্তি — বাইরে থেকে দেখুন, ভঙ্গুর অংশে ঢুকবেন না।
ঢোল সমুদ্র দীঘি ও পাগলা কানাইয়ের মাজার
শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে পাগলা কানাই ইউনিয়নে প্রায় ৫২ বিঘাজুড়ে বিস্তৃত ঢোল সমুদ্র দীঘি — খনন করেছিলেন রাজা মুকুট রায়, যিনি খান জাহান আলীর মতো রাস্তা ও জলাশয় খনন করতে করতে অগ্রসর হতেন বলে জনশ্রুতি। দীঘির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক করুণ লোককথা: খরায় পানি না উঠলে স্বপ্নাদেশে রানি নিজে পূজার অর্ঘ্য নিয়ে দীঘির তলায় নামেন, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবল বেগে পানি উঠতে শুরু করে — কিন্তু স্রোতে তলিয়ে যান রানি, আর ফিরে আসেননি (লোকশ্রুতি হিসেবেই পড়ুন)। একই ইউনিয়নের নাম যাঁর নামে, সেই বাউল-সাধক পাগলা কানাই বা কানাই শেখ (জন্ম ৮ মার্চ ১৮০৯, মৃত্যু ১২ জুলাই ১৮৮৯) ছিলেন দেহতত্ত্ব, জারি, ধূয়া ও মুর্শিদি গানের অনন্য স্রষ্টা; সদরের বেড়বাড়িতে তাঁর মাজার (বাংলাপিডিয়া) এলাকার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কেন্দ্র — অনুসারীদের আনাগোনা বছরজুড়ে, বিশেষ দিনে ভিড় বাড়ে। সদরের প্রত্ন-তালিকায় আরও আছে একটি পঞ্চরত্ন মন্দির ও মধুপুর নীলকুঠি (বাংলাপিডিয়া) — সময় থাকলে স্থানীয়দের কাছে পথ জেনে ঘুরে আসা যায়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও এই মাটিতে গভীর: ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল সদরের বিষখালীতে বেগবতী নদীর তীরে পাকবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন (বাংলাপিডিয়া)। শহরের ভেতরে বিকেলের হাঁটার জন্য নবগঙ্গা নদীর পাড় (শিল্পকলা একাডেমি এলাকা) স্থানীয়দের প্রিয় আড্ডাস্থল; পারিবারিক বেড়ানোর আধুনিক ঠিকানা হিসেবে জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টও জনপ্রিয় (ভ্রমণ-বর্ণনা অনুযায়ী)।
কীভাবে যাবেন ও এক দিনের পরিকল্পনা
ঝিনাইদহ শহর ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে — ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি যাওয়া যায়; যশোর ও খুলনা থেকেও নিয়মিত বাস চলে। শহরের ভেতরের দূরত্বগুলো রিকশা/ইজিবাইকের — মিয়ার দালান (মুরারীদহ) ও হরিশংকরপুরের কে পি বসুর বাড়ি শহরকেন্দ্র থেকে ছোট যাত্রা, ঢোল সমুদ্র দীঘি শহরের পশ্চিমে ~৫ কিলোমিটার। এক দিনের পরিকল্পনা হতে পারে: সকালে মিয়ার দালান ও কে পি বসুর বাড়ি, দুপুরের পর ঢোল সমুদ্র দীঘি ও পাগলা কানাইয়ের মাজার, সন্ধ্যায় নবগঙ্গার পাড়ে হাঁটা। জেলার বাকি ঠিকানার সঙ্গে মিলিয়ে নিলে পরদিন বারোবাজার-নলডাঙ্গা-মল্লিকপুরের কালীগঞ্জ-বৃত্ত — শহরে হোটেল-থাকা সহজলভ্য, সদরেই রাত কাটানো সুবিধাজনক।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মিয়ার দালান কত পুরনো ও কার বাড়ি?
বাংলাপিডিয়ার তালিকা অনুযায়ী বাড়িটি ১৮২২ সালের (সেলিম চৌধুরীর বাড়ি নামে তালিকাভুক্ত); ১৯৪৭ সালে সেলিম চৌধুরীর কাছে বিক্রির পর থেকে স্থানীয়ভাবে এই নামেও পরিচিত। বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ।
কে পি বসু কে ছিলেন?
কালীপদ বসু (১৮৬৫–১৯১৪) — খ্যাতনামা গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানশিক্ষক, কে পি বসু পাবলিশিং কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। হরিশংকরপুরে নবগঙ্গার তীরে ১৯০৭ সালে নির্মিত তাঁর বাড়িটি আজ পরিত্যক্ত; সংস্কারের একটি প্রকল্প জেলা পরিষদে জমা পড়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
ঢোল সমুদ্র দীঘি কে খনন করেন?
জনশ্রুতি অনুযায়ী রাজা মুকুট রায়; দীঘিটি প্রায় ৫২ বিঘা আয়তনের, শহর থেকে ~৫ কিলোমিটার পশ্চিমে পাগলা কানাই ইউনিয়নে।
পাগলা কানাই কে?
বাউল-সাধক কানাই শেখ (১৮০৯–১৮৮৯) — দেহতত্ত্ব, জারি ও মুর্শিদি গানের স্রষ্টা; তাঁর মাজার সদরের বেড়বাড়িতে।
শহরে এক দিনে কী কী দেখা যায়?
মিয়ার দালান, কে পি বসুর বাড়ি, ঢোল সমুদ্র দীঘি ও পাগলা কানাইয়ের মাজার — সবই শহর ও আশপাশে, ইজিবাইকে এক দিনে সম্ভব।
শেষকথা
ঝিনাইদহ শহরের ঐতিহ্য আজ প্রায়ই "সংরক্ষণ হয়নি" শিরোনামে খবরে আসে — ২১টি গেজেটভুক্ত স্থাপনার তালিকাটা যেমন গর্বের, যত্নের ঘাটতিটা তেমনি সত্য। তবু মিয়ার দালানের প্রাচীর, কে পি বসুর বিদ্যাপীঠ-স্মৃতি আর ঢোল সমুদ্রের পানিতে শহরটার গল্প এখনো পড়া যায়। কে পি বসুর বাড়ির প্রকল্পটি বাস্তব হলে এই সফরের মূল্যই বদলে যাবে — প্রত্যাশা রাখা যাক।