পেয়ারার ভাসমান হাট বলতেই সবার মুখে ভিমরুলির নাম — কিন্তু খাল-জালটা শুধু ভিমরুলিতেই শেষ নয়। ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ও নবগ্রাম ইউনিয়নের গ্রামগুলোর খালে বর্ষা এলেই বসে আরও একগুচ্ছ ছোট ছোট ভাসমান হাট, যার একটি ছত্রকান্দা। পর্যটকের ভিড় এখানে কম, কিন্তু চাষিদের আসল বেচাকেনার চেহারাটা এখানেই সবচেয়ে অনাড়ম্বরভাবে দেখা যায়। গোড়াতেই সৎভাবে বলে রাখা ভালো — ছত্রকান্দা নিয়ে আলাদা করে প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই কম; এই লেখা তাই পুরো খাল-জালের যাচাইকৃত চিত্রের ভিত্তিতে সাজানো।
কীর্তিপাশা-নবগ্রামের পনেরো গ্রামের বাগান-জাল
বাংলাদেশ তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা ও নবগ্রাম ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি গ্রামে বহু বছর ধরে পেয়ারা চাষ হয়ে আসছে — পেয়ারাই এই এলাকার মানুষের বেঁচে থাকার প্রথম অবলম্বন (ইনস্ক্রিপ্টে উদ্ধৃত তথ্য বাতায়ন)। এই অঞ্চলের প্রধান প্রধান ভাসমান হাটের তালিকায় আছে ভীমরুলি, শতদশকাঠি, আতা, ডুমুরিয়া, কুড়িয়ানা ও আটঘর বাজার (একই সূত্র) — ছত্রকান্দার হাটটি এই একই জালের ছোট বিন্দু, যেখানে আশপাশের বাগানের চাষিরা নৌকা নিয়ে জড়ো হন। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ভাসমান হাটের ঐতিহ্য দেড়শো বছর পেরিয়ে গেছে, আর বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা চাষ বিস্তৃত হয় ১৯৪০ সাল থেকে (যুগান্তর)। বর্ষা মৌসুমে এই খালগুলো দিয়েই চাষিরা বাগানে ঢোকেন — পুরুষদের পাশাপাশি নারী চাষিরাও নিজেরাই নৌকা চালিয়ে বাগানের অলিগলিতে প্রবেশ করেন, পেয়ারা তুলে হাটে নিয়ে আসেন (বাসস)।
হাটের সকাল: সাতটা থেকে বারোটা
এই জালের হাটগুলোর ছন্দ ভোরের — বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা; রোদ কিংবা বৃষ্টি, ক্রেতার জন্য নৌকায় অপেক্ষা করেন চাষি (বাসস)। পেয়ারার পাশাপাশি হাটে ওঠে কাগজি লেবু, আমড়া, সুপারি, কলা ও বোম্বাই মরিচসহ নানা সবজি (যুগান্তর)। পেয়ারা জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত দুটি ব্র্যান্ডিং পণ্যের একটি — জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সামনের ফোয়ারায় শীতলপাটির ওপরে পেয়ারার ভাস্কর্যও বসানো হয়েছে (বাসস)। ছত্রকান্দার মতো ছোট হাটে পর্যটক-সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে — বৃহত্তর ভিমরুলি হাট নিয়েই পর্যটকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত টয়লেট, বিশ্রামাগার বা ভালো হোটেলের ব্যবস্থা নেই (বণিক বার্তা); তাই এই সফরকে "অভিজ্ঞতা-প্রধান" মনে করে প্রস্তুতি নিন — থাকার জন্য ঝালকাঠি শহরকে ঘাঁটি করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বনের স্মৃতি ও বাস্তব সতর্কতা
এই পেয়ারা বনের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের অধ্যায়ও আছে — বর্ষায় জলে-জঙ্গলে ঘেরা এই বাগানাঞ্চল ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম গোপন ঘাঁটি ছিল (ইনস্ক্রিপ্ট/যুগান্তর)। তবে একই বনের আরেক বাস্তবতা — ঘন ঝোপে কেউটে সাপের উপদ্রবের কথা স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত; ইনস্ক্রিপ্টের পরামর্শ স্পষ্ট: ঘন বনে ঢুকতে হলে স্থানীয় কাউকে — সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নৌকার মাঝিকেই — সঙ্গে নিন। বাগানের ভেতরে একা ঘোরাঘুরি না করে খালের নৌকা থেকেই হাট ও বাগান দেখাই নিরাপদ ও উপভোগ্য।
কীভাবে যাবেন
ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে অটোরিকশা/স্থানীয় যানে কীর্তিপাশা এলাকা; সেখান থেকে ডিঙি নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করে খাল বেয়ে ছত্রকান্দাসহ ছোট হাটগুলো ঘোরা যায় — একই সফরে শতদশকাঠি-আতা-ডুমুরিয়ার দিকেও যাওয়া সম্ভব, মাঝির সঙ্গে আগেই রুট ও ভাড়া ঠিক করে নিন। সময়জ্ঞান জরুরি: হাট সকালের — আগের রাতে ঝালকাঠি বা বরিশালে থেকে ভোরে রওনা হোন। মৌসুম: পেয়ারা জুলাই–সেপ্টেম্বর (শ্রাবণ–ভাদ্র শিখর); মৌসুমের বাইরে হাট বসে না বললেই চলে (বণিক বার্তা/বাসস)। শুক্রবারে বড় হাটগুলোতে কেনাবেচা তুলনামূলক বেশি হয় (বণিক বার্তা)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ছত্রকান্দা ভাসমান বাজার কোথায়?
ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্তিপাশা এলাকার খালে — একই খাল-জালে আছে শতদশকাঠি, আতা ও ডুমুরিয়া হাটও (তথ্য বাতায়ন/ইনস্ক্রিপ্ট)।
ভিমরুলির সঙ্গে এর পার্থক্য কী?
ভিমরুলি এই জালের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত হাট, পর্যটক বেশি; ছত্রকান্দার মতো ছোট হাটগুলোতে ভিড় কম, চাষিদের নিত্য বেচাকেনার চেহারা বেশি খাঁটি — তবে পর্যটক-সুবিধাও কম।
হাট কখন বসে?
পেয়ারা মৌসুমে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত (বাসস)।
ঝালকাঠি শহর থেকে কীভাবে যাব?
অটোতে কীর্তিপাশা এলাকা, তারপর নৌকা/ট্রলার ভাড়া করে খাল বেয়ে — মাঝির সঙ্গে রুট-ভাড়া আগেই ঠিক করুন।
কোনো সতর্কতা আছে কি?
ঘন বাগানে কেউটে সাপের ঝুঁকি আছে — স্থানীয় গাইড/মাঝি ছাড়া বনে ঢুকবেন না (ইনস্ক্রিপ্ট); এলাকায় টয়লেট-বিশ্রামাগারের সুবিধা সীমিত (বণিক বার্তা)।
শেষকথা
ছত্রকান্দা বিখ্যাত নয় — আর ঠিক সেজন্যই যারা পর্যটক-ভিড়ের বাইরে দক্ষিণের আসল জলজীবন দেখতে চান, তাদের জন্য এই ছোট হাটগুলো বিশেষ। ভোরের খালে নৌকার সারি, নারী চাষির বৈঠা আর সদ্য তোলা পেয়ারার গন্ধ — ভিমরুলির গল্পের এই শান্ত অধ্যায়টাই ছত্রকান্দার নিজস্ব সম্পদ।