• 30 Oct, 2026

ঝালকাঠি সদরের গাভা রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের রাজধানী — রাজা রামচন্দ্রের (১৫৯৮–১৬৬৮) পঞ্চনদীর সঙ্গমে গড়া রাজধানী, কালীমন্দির, পরিখা ও বন্দরের ইতিহাস এবং বৌঠাকুরানীর হাটের কিংবদন্তি।

ঝালকাঠি জেলা সদর থেকে অল্প উত্তরে, সদর উপজেলার ১নং ইউনিয়ন গাভা রামচন্দ্রপুর — নামটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে চারশো বছরের পুরনো ইতিহাস (বাংলা উইকিপিডিয়া)। এই ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে একসময় ছিল বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের রাজধানী: রাজপ্রাসাদ, কালীমন্দির, পরিখা-ঘেরা নগরী আর পাঁচ নদীর সঙ্গমে ব্যস্ত বন্দর। আজ প্রাসাদের কিছুই চোখে পড়ে না — কিন্তু জায়গাটির নাম, দীঘি আর নদীর ভূগোল এখনো সেই রাজধানীর সাক্ষ্য বহন করে। ঝালকাঠি শহর থেকে অর্ধেক দিনের সফরে ইতিহাসের এই স্তরটি ছুঁয়ে আসা যায়।

রাজা রামচন্দ্র: চন্দ্রদ্বীপের দশম রাজা

বরিশালপিডিয়া অনুযায়ী রামচন্দ্র বসু (রায়) ছিলেন চন্দ্রদ্বীপের দশম রাজা; পিতা রাজা কন্দর্প নারায়ণের মৃত্যুর পর ১৫৯৮ সালে তিনি বাকলার সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং দীর্ঘকাল — ১৬৬৮ সাল পর্যন্ত — রাজত্ব করেন (বরিশালপিডিয়া)। বাংলা ও সংস্কৃতে শিক্ষিত এই তরুণ রাজা যুদ্ধবিদ্যায়ও পারদর্শী ছিলেন; তাঁর আমলেই চন্দ্রদ্বীপের সঙ্গে যশোরের প্রতাপাদিত্যের রাজ্যের বৈবাহিক সম্পর্ক ও সংঘাত ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

পঞ্চনদীর সঙ্গমে রাজধানী হোসেনপুর

পিতা কন্দর্প নারায়ণ জীবিতকালেই হোসেনপুরে রাজধানী প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন; সিংহাসনে বসেই রামচন্দ্র সেই কাজ শুরু করেন (বরিশালপিডিয়া)। স্থানটি ছিল পঞ্চকরণ — পাঁচটি নদীর সঙ্গমস্থল, যেখান থেকে একটি ধারা যেত দক্ষিণে ঝালকাঠির দিকে, একটি দক্ষিণ-পশ্চিমে স্বরূপকাঠি, একটি গুঠিয়া, অপরটি উত্তরে উজিরপুরের দিকে (একই সূত্র)। রাজধানী গড়ার বিবরণে আছে: নদীর পশ্চিম পাশে দীঘি খনন করে কালীমন্দির নির্মাণ, পশ্চিম দিকে পরিখা খনন করে নগরী সুরক্ষিত করা, রাজবাড়ির উত্তরে রঘুনাথ ও অনন্তদেবের বিগ্রহ স্থাপন, আর পঞ্চকরণে একটি বন্দর প্রতিষ্ঠা (বরিশালপিডিয়া)। রাজা কুলীন ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যদের এখানে বসতি দেন, আর হোসেনপুরের পশ্চিমে নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করেন রামচন্দ্রপুর গ্রাম — আজকের ইউনিয়নের নামের উৎস এখানেই (একই সূত্র)। এই রাজধানীর বাস্তবতার সমসাময়িক প্রমাণও মেলে: ১৫৯৯ সালে মোগল রাজস্ব কর্মকর্তা কানুনগো জুম্মন খাঁ হোসেনপুরে এসে তরুণ রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও রাজ্যের সমৃদ্ধির প্রশংসা লিখে যান; একই বছর অক্টোবরে জেসুইট পাদ্রী মেলকিয়র ফনসেকাও রাজধানীতে রাজার অতিথি হন (বরিশালপিডিয়া)। কয়েক বছর পর রামচন্দ্র রাজধানী স্থানান্তর করেন মাধবপাশায় (নতুন নাম শ্রীনগর) — যেখানে পরবর্তীকালে খনন করা হয় বিখ্যাত দুর্গাসাগর দীঘি; ফলে হোসেনপুর ধীরে ধীরে স্মৃতিতে রূপ নেয়।

বৌঠাকুরানীর হাটের কিংবদন্তি

হোসেনপুরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত রাজকীয় প্রেম-বিরহের কিংবদন্তিগুলোর একটি। বরিশালপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী রামচন্দ্রের বিয়ে হয় যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের কন্যা বিমলার সঙ্গে (১৬০২); বিয়ের আসরে এক দুর্ঘটনায় প্রতাপাদিত্য জামাতার প্রাণনাশের আদেশ দিলে রামচন্দ্র রাতের অন্ধকারে পালিয়ে বাকলায় ফিরে আসেন। পরে বিমলা নৌকায় এসে হোসেনপুরের কাছে নোঙর করেন — যেখানে রানীর নৌকা ভিড়েছিল, সেখানে লোকজমায়েতে বসে যায় হাট, নাম হয় "বৌঠাকুরানীর হাট" (বরিশালপিডিয়া)। এই কিংবদন্তির ওপর ভিত্তি করেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন তাঁর উপন্যাস বৌ-ঠাকুরানীর হাট — যদিও কাহিনির বহু চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক (একই সূত্র)। কাহিনির শেষ নিয়ে বর্ণনাভেদ আছে — কেউ বলেন দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিমলাকে গ্রহণ করেন রাজা, কেউ বলেন বিমলা কাশী চলে যান (বরিশালপিডিয়া)।

আজকের গাভা রামচন্দ্রপুর

এলাকাটি এখন শান্ত কৃষিপ্রধান ইউনিয়ন — ১৪টি গ্রাম নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে রামচন্দ্রপুর, হোসেনপুর, ভারুকাঠি উল্লেখযোগ্য (বরিশালপিডিয়া/বাংলা উইকিপিডিয়া)। ভারুকাঠির মিয়া বাড়ি মসজিদ এই ইউনিয়নেই। সৎভাবে বলতে হয় — হোসেনপুরে রাজপ্রাসাদ বা মন্দিরের কোনো দৃশ্যমান ধ্বংসাবশেষের নির্ভরযোগ্য বিবরণ আজ পাওয়া যায় না; এই গন্তব্যের মূল্য প্রাচীরে নয়, স্মৃতিতে: নদীর সঙ্গমের ভূগোল, গ্রামের নাম আর চারশো বছর ধরে বহন করা ইতিহাসে। ইতিহাস-অনুরাগীদের জন্য এটি "দেখা"র চেয়ে "অনুভব" করার জায়গা।

কীভাবে যাবেন ও টিপস

ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে অটোরিকশা/স্থানীয় যানে গাভা রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর-হোসেনপুর এলাকা যাওয়া যায়। নির্দিষ্ট কোনো টিকিটঘর বা প্রদর্শনী কেন্দ্র নেই — স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কথা বললেই হোসেনপুর, দীঘি আর পুরনো বন্দরঘাটার অবস্থান সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা মিলবে। একই সফরে ভারুকাঠির মিয়া বাড়ি মসজিদও যোগ করুন। টিপস: ব্যক্তিগত জমি-বাড়িতে প্রবেশের আগে অনুমতি নিন; প্রত্যাশা রাখুন ইতিহাস-সন্ধানী হাঁটাহাঁটির, প্রাসাদ-দর্শনের নয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

গাভা রামচন্দ্রপুর নাম এলো কার নামে?

চন্দ্রদ্বীপের রাজা রামচন্দ্র হোসেনপুরের পশ্চিমে নিজের নামে রামচন্দ্রপুর গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন — সেখান থেকেই নামটি এসেছে বলে বরিশালপিডিয়া জানায়।

হোসেনপুরে রাজধানী কে, কবে গড়েন?

রাজা রামচন্দ্র ১৫৯৮ সালে সিংহাসনে বসার পরপরই পঞ্চনদীর সঙ্গম পঞ্চকরণের পাশে হোসেনপুরে রাজধানী নির্মাণ শুরু করেন (বরিশালপিডিয়া)।

রাজধানীতে কী কী ছিল?

দীঘি ও কালীমন্দির, পরিখা, রঘুনাথ-অনন্তদেবের বিগ্রহ এবং পঞ্চকরণে বন্দর (বরিশালপিডিয়া)।

বৌঠাকুরানীর হাটের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক কী?

কিংবদন্তি অনুযায়ী রানী বিমলার নৌকা হোসেনপুরের কাছে নোঙর করলে সেখানে যে হাট বসে, তারই নাম বৌঠাকুরানীর হাট; এই কাহিনি নিয়েই রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস (বরিশালপিডিয়া)।

এখন হোসেনপুরে কী দেখা যায়?

দৃশ্যমান প্রাসাদ-ধ্বংসাবশেষ নেই বললেই চলে — গ্রাম, দীঘি ও নদীর ভূগোলই সাক্ষী; একই ইউনিয়নে ভারুকাঠির মিয়া বাড়ি মসজিদ দেখা যায়।

শেষকথা

বাংলার বারো ভূঁইয়ার যুগের এক রাজধানী আজ নীরব গ্রাম — গাভা রামচন্দ্রপুরে এসে সেই বিস্ময়টাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যেখানে পাঁচ নদী মিলত, যেখানে বিদেশি পাদ্রী আর মোগল কর্মকর্তা রাজদরবারে হাজিরা দিতেন, আজ সেখানে ধানক্ষেত আর গ্রামবাংলার ছন্দ — ইতিহাসের পাঠ এখানে বইয়ের পাতা থেকে মাটিতে নেমে আসে।