• 29 Oct, 2026

কালুরঘাট সেতু ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: কর্ণফুলীর বুকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী ঠিকানা

কালুরঘাট সেতু ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: কর্ণফুলীর বুকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী ঠিকানা

কালুরঘাটের পূর্ণ গাইড — ১৯৩০ সালের রেল সেতুর ইতিহাস, গঠন ও বর্তমান অবস্থা, আর ১৯৭১-এর ২৬–৩০ মার্চের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহাসিক ভূমিকা; যাতায়াত ও দর্শনের বাস্তব টিপসসহ।

বহদ্দারহাট থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে কর্ণফুলী নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ ইস্পাতের কাঠামোটি দেখতে সাধারণ — কিন্তু কালুরঘাট নামটির ওজন বাংলাদেশের ইতিহাসে অসাধারণ। একদিকে প্রায় শতবর্ষী রেল সেতু, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম কণ্ঠস্বর — স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্মস্থান। শহরের ঐতিহ্যের বড় মানচিত্রে জায়গাটি বুঝতে পড়ুন সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ।

সেতুর ইতিহাস

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্য চলাচলের জন্য কর্ণফুলীতে সেতুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়; ১৯৩০ সালে হাওড়ার ব্রুনিক অ্যান্ড কোম্পানি নির্মিত প্রায় ৭০০ গজ লম্বা সেতুটি উদ্বোধন হয় — প্রথমে শুধু ট্রেন চলাচলের জন্য।
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যানবাহনের জন্য ডেক বসানো হয়; ১৯৫৮ সালে সেতুটিকে সব ধরনের যান চলাচলের উপযোগী রূপ দেওয়া হয় — সেই থেকে একই কাঠামোয় ট্রেন ও সড়কযান চলছে।
  • কাঠামোতে উনিশটি স্প্যানের কথা ভ্রমণ-বিবরণীতে উল্লেখ আছে; দীর্ঘদিন ধরেই এই পুরনো সেতুর পাশে নতুন সেতুর দাবি উঠছে।

১৯৭১: পাঁচ দিনের বেতার কেন্দ্র

কালুরঘাটের প্রেরণ কেন্দ্র থেকেই জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র:

  • ২৬ মার্চ ১৯৭১, সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে আবুল কাশেম সন্দ্বীপীর কণ্ঠে প্রথম ঘোষিত হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ (বেলাল মোহাম্মদের বই অনুযায়ী); সেদিন রাতেই এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
  • ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান এখান থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
  • ২৮ মার্চ নাম থেকে ‘বিপ্লবী’ শব্দটি বাদ যায়; ৩০ মার্চ পাকিস্তানি বিমান হামলায় কেন্দ্রটি অচল হয়ে গেলে সম্প্রচার বন্ধ হয় — পরে কেন্দ্রটি ভারতে সরে গিয়ে যুদ্ধজুড়ে সম্প্রচার চালায়।
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময়ের বেতার যন্ত্রপাতির অংশবিশেষ এখন জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

আজকের কালুরঘাট

কালুরঘাট প্রেরণ কেন্দ্রটি বর্তমানে বাংলাদেশ বেতারের সম্প্রচার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে — এটি সংরক্ষিত সরকারি স্থাপনা, পর্যটনকেন্দ্র নয়; ভেতরে সাধারণ দর্শনের ব্যবস্থা নেই। দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা তাই মূলত বাইরের: পুরনো সেতুর কাঠামো, কর্ণফুলীর প্রশস্ত বাঁক, ঘাটের জীবন আর ইতিহাসের জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি।

কীভাবে যাবেন

বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বাস/সিএনজিতে কালুরঘাট প্রায় ৫–৭ কিলোমিটার। সেতুর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে নদী দেখাই সেরা পরিকল্পনা; ট্রেন পার হওয়ার মুহূর্তে পুরনো সেতুর কাঁপনি অনুভব করা যায় — তবে সেতুর ওপর পায়ে হেঁটে ওঠা যানজট ও নিরাপত্তার কারণে এড়িয়ে চলুন, পাড় থেকে ছবি তোলাই ভালো।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

কালুরঘাট সেতু কত সালের?

১৯৩০ সালে নির্মিত; প্রথমে শুধু রেলের জন্য, ১৯৫৮ সাল থেকে সব যানবাহনের জন্য।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ঠিক কোথায় ছিল?

কালুরঘাট প্রেরণ কেন্দ্রে (বহদ্দারহাটের সন্নিকটে) — ২৬ থেকে ৩০ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত এখান থেকে সম্প্রচার হয়।

বেতার কেন্দ্রের ভেতর কি দেখা যায়?

এটি সক্রিয় সম্প্রচার কেন্দ্র ও সংরক্ষিত এলাকা; সাধারণ দর্শনের সুযোগ নেই।

শেষকথা

কালুরঘাটে পর্যটনের চাকচিক্য নেই, আছে ইতিহাসের গাম্ভীর্য — একটি নদী, একটি সেতু আর পাঁচটি দিন যা একটি জাতির ভাগ্য বদলে দিয়েছিল। শহরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এরপর পড়ুন লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।