কাজীর দেউড়ি থেকে একটু এগোলেই শহরের কোলাহল হঠাৎ থেমে যায় — শুরু হয় টিলা, উপত্যকা আর শতবর্ষী গাছের ছায়ায় ঢাকা সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) এলাকা। চট্টগ্রামবাসী একে ডাকেন বন্দরনগরীর ‘ফুসফুস’ বলে, আর এর উন্মুক্ত চত্বর শিরিষতলা শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি-র পুরনো শহর থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের পথ এই সবুজ ঐতিহ্য।
লাল ভবনটির গল্প
সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং নির্মিত হয় ১৮৭২ সালে, তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর হিসেবে — বন্দর নগরীর প্রাচীনতম ভবনগুলোর একটি। প্রায় ২০ একর জমির ওপর দাঁড়ানো উজ্জ্বল লাল ভবনটি প্রথমে ছিল দোতলা (নিচতলায় ৩৪ ও ওপরে ৩৩টি কক্ষ); ১৯১৮ সালের পর দক্ষিণাংশ তিনতলা ও পূর্ব-উত্তরাংশ চারতলা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। গথিক খিলান, গম্বুজওয়ালা ফোয়ার, প্যাঁচানো সিঁড়ির মিনার — ঔপনিবেশিক ও মুগল ছোঁয়ার এই মিশেল স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্য উপভোগ্য। ১৯৭১ সালে বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি মূল নকশা অনুযায়ী পুনর্নির্মিত হয়। ভবনটি এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর; সামনের বাগানে প্রদর্শিত আছে প্রাচীন একটি বাষ্পীয় লোকোমোটিভ (স্টিম ইঞ্জিন)। ভবনটি সক্রিয় সরকারি অফিস — ভেতরে প্রবেশ সীমিত, তবে বাইরে থেকে দেখা ও চত্বরে ঘোরাই দর্শনার্থীদের জন্য প্রধান আকর্ষণ।
শিরিষতলা: উৎসব আর আড্ডার চত্বর
ভবনের সামনের উন্মুক্ত মঞ্চ-এলাকা শিরিষতলা — নামটি এসেছে শতবর্ষী শিরিষ গাছের ছায়া থেকে। এলাকাটিতে গর্জন, সেগুন, মেহগনি, কড়ইসহ ৬৪টি শতবর্ষী গাছ ও মোট তিন শতাধিক গাছ আছে; পাশের টিলায় নানা পাখির আবাস। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে এখানে বসে শহরের সবচেয়ে বড় নববর্ষ উদ্যাপন — ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা (কুস্তি) দেখতে ভিড় করেন হাজারো মানুষ; পয়লা ফাল্গুন ও রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানও এখন এখানকার নিয়মিত আয়োজন। উৎসব না থাকলেও প্রতিদিন সকাল-বিকেলে হাঁটাহাঁটি আর আড্ডায় প্রাণবন্ত থাকে চত্বরটি। এলাকার সবুজ সংরক্ষণ নিয়ে নগরবাসীর সচেতন আন্দোলনের ইতিহাসও এই জায়গাটিকে করেছে ভালোবাসার প্রতীক।
কীভাবে যাবেন ও টিপস
- অবস্থান: সিআরবি সড়ক, কাজীর দেউড়ি-টাইগারপাসের কাছে — শহরের যেকোনো জায়গা থেকে সিএনজি/রিকশায় পৌঁছানো সহজ।
- সেরা সময়: বিকেলের আলোয় ভবন সবচেয়ে সুন্দর; পয়লা বৈশাখে গেলে ভোরে আসুন — পরে অসম্ভব ভিড় হয়।
- এটি সরকারি অফিস এলাকা — ভবনের ভেতরে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নয়; চত্বর ও বাগান সবার জন্য উন্মুক্ত। গাছের ছায়ায় বসে আড্ডা দিন, কিন্তু আবর্জনা ফেলবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সিআরবি ভবনের ভেতরে ঢোকা যায়?
সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য ভেতরে প্রবেশ সীমিত; বাইরের স্থাপত্য, বাগানের স্টিম ইঞ্জিন ও শিরিষতলা চত্বরই মূল দর্শনীয়।
শিরিষতলায় বলী খেলা কখন হয়?
প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে (১৪ এপ্রিলের দিকে) নববর্ষ উদ্যাপনের অংশ হিসেবে।
পরিবার নিয়ে কতক্ষণ কাটানো যায়?
বিকেলে ১–২ ঘণ্টা আরামে কাটে — পাশে কাজীর দেউড়ির খাবারের দোকানগুলো মিলিয়ে সন্ধ্যার প্ল্যান সম্পূর্ণ হয়।
শেষকথা
সিআরবি শুধু একটি অফিস ভবন নয় — দেড় শতাব্দীর ইতিহাস, উৎসব আর দৈনন্দিন আড্ডার মিলনস্থল। শহরের ঐতিহ্য-ভ্রমণের এই ধারায় এরপর চলুন উত্তরের পাহাড়ের দিকে — পড়ুন সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ। সবুজটা বেঁচে থাকুক আমাদের যত্নে!