• 01 Nov, 2026

মধুটিলা ইকোপার্ক ভ্রমণ গাইড — নালিতাবাড়ীর পোড়াগাঁওয়ে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইকোপার্কের ইতিহাস, বন-লেক-ওয়াচ টাওয়ারের বিবরণ, ২০২৬ সালের সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে আসা জরাজীর্ণ অবস্থা ও ১০০ টাকা প্রবেশমূল্যের বিতর্ক এবং হাতির অভয়ারণ্য পরিকল্পনা।

গজনী অবকাশ কেন্দ্রের পর শেরপুরের দ্বিতীয় বিখ্যাত ঠিকানা মধুটিলা ইকোপার্ক — নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পোড়াগাঁও ইউনিয়নে, মেঘালয়ের কোল ঘেঁষে প্রায় ৩৮০ একর বনভূমি জুড়ে এর বিস্তার। তবে এই গাইড শুরু থেকে একটা কথা পরিষ্কার করে দিচ্ছে: মধুটিলার প্রকৃতি আজও অসাধারণ, কিন্তু পার্কের অবকাঠামো দুই দশকের অবহেলায় ভেঙে পড়েছে — প্রত্যাশা ঠিক করে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সাম্প্রতিক সরেজমিন প্রতিবেদনগুলোই (অক্টোবর ২০২৬) এই গাইডের ভিত্তি।

বন বিভাগের স্বপ্নের প্রকল্প: ১৯৯৯–২০০৪

বন বিভাগের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে ইকোপার্ক হিসেবে যাত্রা শুরু হয় মধুটিলার (সংবাদ প্রতিবেদন); বৃহত্তর ময়মনসিংহে এটিই প্রথম মানব-নির্মিত পর্যটন পার্ক (দ্য ডেইলি স্টার, ২০০৭)। প্রথম পর্যায়ে বনবিভাগের প্রকল্পে (ব্যয় প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, সম্পন্ন জুন ২০০৪) এলজিইডি তৈরি করে রেস্ট হাউস, লেক, পাহাড়চূড়ায় ওয়াচ টাওয়ার, স্পিলওয়ে আর হাতি-বাঘ-হরিণ-কুমির-মৎস্যকন্যার ভাস্কর্য; দ্বিতীয় পর্যায়ে মিনি চিড়িয়াখানা, শিশু কর্নার ও তথ্যকেন্দ্র যুক্ত হয় (দ্য ডেইলি স্টার)। পাহাড়চূড়ার মহুয়া রেস্ট হাউস, লেকে প্যাডেল বোট, টিলা থেকে টিলায় ভাস্কর্যের সারি — ২০০০-এর দশকে এই পার্কে সপ্তাহান্তে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত।

সৎ চিত্র ২০২৬: জরাজীর্ণ পার্ক, তবু প্রবেশমূল্য ১০০ টাকা

২০০৪-এর পর দুই দশকে পার্কে বড় কোনো সংস্কার হয়নি — এর ফল সরেজমিন প্রতিবেদনে (অক্টোবর ২০২৬) নির্মমভাবে স্পষ্ট: তথ্য ও প্রদর্শনী কেন্দ্রগুলো তালাবদ্ধ বা ভাঙাচোরা, তথ্যকেন্দ্রে এক ভবঘুরের বসবাস; হাতি-বাঘ-হরিণের ভাস্কর্যের রং উঠে গেছে; 'মিনি চিড়িয়াখানা'য় কোনো প্রাণী নেই, গেটে তালা ঝুলছে; শিশুদের সব রাইড অকেজো; কৃত্রিম লেক, ওয়াচ টাওয়ার ও শৌচাগার জরাজীর্ণ; পানীয় জলের সংকট। এরই মধ্যে প্রবেশমূল্য সম্প্রতি ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে — ফলে অনেক পর্যটক হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন (সংবাদ প্রতিবেদনসমূহ, অক্টোবর ২০২৬)। যা এখনো অসাধারণ, তা হলো বনটা নিজে: টিলা, শালবন আর মেঘালয়ের পাহাড়ের দিগন্ত। ওয়াচ টাওয়ার থেকে বিকেলে বন্য হাতির দল দেখা মেলার কথা পুরোনো ভ্রমণ-বিবরণে আছে — তবে টাওয়ারের বর্তমান অবস্থায় ওঠার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নিরাপত্তা যাচাই করে নিন।

হাতি-মানুষ দ্বন্দ্ব আর অভয়ারণ্যের পরিকল্পনা

মধুটিলা শুধু পার্ক নয় — এটি মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বের সক্রিয় এলাকা; সীমান্ত পেরিয়ে বন্য হাতি নিয়মিত এই বনে ঢোকে। ১০ অক্টোবর ২০২৬-এ এই পার্কেই বসে মতবিনিময় সভা: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ঘোষণা দেন — ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ বাড়ানো হবে, বন্য হাতিকে পর্যটনের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং গারো পাহাড়ে হাতির অভয়ারণ্য গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে; ভারতের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী সীমান্তে হাতির ছয়টি করিডোর নিয়ে আগামী তিন-চার মাসে বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে (মানবজমিন; দৈনিক জনতা)। সভায় হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণের চেক ও ৩২টি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের মধ্যে হাতি তাড়ানোর সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়। পর্যটকের জন্য শিক্ষা একটাই: এটি হাতির এলাকা — বনকর্মীদের নির্দেশনা ছাড়া গভীর বনে বা সন্ধ্যার পর ঘোরাঘুরি নয়।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া:শেরপুর শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে নালিতাবাড়ী হয়ে পোড়াগাঁও; ঢাকা থেকে প্রায় ২০০–২২০ কিলোমিটার। কৌশল: গজনী ও মধুটিলা একই দিনে দেখা যায় — সকালে গজনীর সুবিধা-সমৃদ্ধ পরিবেশ, বিকেলে মধুটিলার বন; মধুটিলায় খাবার-পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে নিন (ভেতরের সুবিধা নির্ভরযোগ্য নয়)। প্রবেশমূল্য: অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ১০০ টাকা — তবু গিয়ে যাচাই করুন, বদলাতে পারে। কখন: শীতকালে (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) বন সবচেয়ে উপভোগ্য। নিরাপত্তা: হাতির চলাচলের এলাকা — সতর্কতা বোর্ড ও বনকর্মীদের কথা মানুন; সন্ধ্যার আগে পার্ক ছাড়ুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

মধুটিলা ইকোপার্ক কোথায়?

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে, প্রায় ৩৮০ একর বনভূমিতে (সংবাদ প্রতিবেদন)।

পার্কটি কবে প্রতিষ্ঠিত?

১৯৯৯ সালে; প্রথম পর্যায়ের উন্নয়ন শেষ হয় ২০০৪ সালে (দ্য ডেইলি স্টার)।

পার্কের বর্তমান অবস্থা কেমন?

জরাজীর্ণ — খালি চিড়িয়াখানা, ভাঙা রাইড, তালাবদ্ধ তথ্যকেন্দ্র (সরেজমিন প্রতিবেদন, অক্টোবর ২০২৬)।

প্রবেশমূল্য কত?

সম্প্রতি ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে এসেছে (অক্টোবর ২০২৬) — গিয়ে যাচাই করুন।

বন্য হাতি দেখা যায় কি?

এলাকাটি হাতির চলাচলের পথ; বিকেলে দেখা মেলার কথা পুরোনো ভ্রমণ-বিবরণে আছে — নিশ্চয়তা নেই, নিরাপত্তাই আগে।

হাতির অভয়ারণ্যের পরিকল্পনা কী?

গারো পাহাড়ে অভয়ারণ্য গড়ার পরিকল্পনার কথা পরিবেশমন্ত্রী জানিয়েছেন ১০ অক্টোবর ২০২৬-এর সভায় (মানবজমিন)।

শেষকথা

মধুটিলা আজ বাংলাদেশের পর্যটন-ব্যবস্থাপনার একটা কঠিন পাঠ: প্রকৃতি দিয়ে গেছে অঢেল, যত্নে ঘাটতি দুই দশকের। অভয়ারণ্য-পরিকল্পনা আর মন্ত্রীর সফর যদি সত্যিকারের সংস্কারে রূপ নেয়, এই বন আবার জেগে উঠতে পারে — ততদিন বনের জন্য যান, সুবিধার আশা কম রাখুন।