• 30 Oct, 2026

খুলনার কয়রায় কপোতাক্ষ নদের তীরে ৫০০ বছরের পুরনো নয় গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদকুঁড় মসজিদ — শতাব্দী ধরে জঙ্গল আর পলির নিচে লুকিয়ে থাকার পর ১৯৪৭-এ আবিষ্কারের গল্প, খান জাহান আলীর যুগের স্থাপত্য, আর সুন্দরবনের দ্বারপ্রান্তের উপজেলা কয়রা ঘোরার পূর্ণ গাইড।

বাংলাদেশের সবচেয়ে নাটকীয় আবিষ্কারের গল্পগুলোর একটি লুকিয়ে আছে খুলনার দক্ষিণ সীমানায় — কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের মসজিদকুঁড় গ্রামে। এখানে কপোতাক্ষ নদের তীরে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ শ বছরের বেশি পুরনো একটি নয় গম্বুজবিশিষ্ট ইটের মসজিদ, যেটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ঘন জঙ্গল আর নদীর পলির নিচে চাপা পড়ে ছিল — মানুষ ভুলেই গিয়েছিল এর অস্তিত্ব। আর গ্রামটি ছাড়িয়ে পুরো কয়রা উপজেলাটাই আরেক বিস্ময়: দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা, যার বেশির ভাগটাই সুন্দরবন। এই পোস্টে দুটোরই গল্প — মসজিদের ইতিহাস আর সুন্দরবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো জনপদের ভ্রমণবিবরণ।

মাটির নিচ থেকে উঠে আসা মসজিদ

প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, নির্মাণের প্রায় তিন শ বছর পর জলদস্যুদের অত্যাচারে এই জনপদ জনশূন্য হয়ে পড়ে; ধীরে ধীরে এলাকাটি ঘন জঙ্গলে ঢেকে যায়, আর জোয়ার-ভাটার পলিতে চাপা পড়ে যায় মসজিদসহ আশপাশের স্থাপনা। শতাব্দী পেরিয়ে দেশভাগের বছর, ১৯৪৭ সালে, ঘন জঙ্গল কেটে ও মাটি খুঁড়ে আবার খুঁজে পাওয়া যায় মসজিদটি — মাটি 'কুঁড়ে' বা খুঁড়ে বের করা হলো বলেই নাম হয় মসজিদকুঁড়; পরবর্তীতে গ্রামটির নামও এই মসজিদের নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়। আবিষ্কারের সময় কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি, তাই নির্মাণকাল নিশ্চিত নয়; তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক ১৪৫০ থেকে ১৪৯০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে, অর্থাৎ হজরত খান জাহান আলীর যুগে বা তার অব্যবহিত পরে। জনশ্রুতিতে নির্মাতা হিসেবে নাম আসে খান জাহানের বিশ্বস্ত সহচর বুড়া খাঁ ও তাঁর ছেলে ফতেহ খাঁর — তাঁরা নাকি এই অঞ্চলে আমাদিতে কাছারি বসিয়ে মসজিদ, রাস্তা আর জলাশয় নির্মাণ করেছিলেন। আমাদিতে আজও 'বুড়ো খাঁ-ফতে খাঁর দিঘি' নামে পরিচিত জলাশয়ের সন্ধান মেলে।

নয় গম্বুজের স্থাপত্য

মসজিদটি বর্গাকার — বাইরের দিক থেকে প্রতি বাহু প্রায় ৫৪ ফুট, ভেতরে ৩৯ ফুটের মতো; দেয়াল প্রায় সাত ফুট পুরু, যার ফলে গ্রীষ্মেও ভেতরটা বিস্ময়করভাবে ঠান্ডা থাকে বলে স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা। ভেতরের চারটি প্রস্তর স্তম্ভ ও দেয়াল মিলিয়ে নামাজের হলঘরটি ভাগ হয়েছে নয়টি সমান অংশে, প্রতিটির মাথায় একটি করে — মোট নয়টি গম্বুজ। পূর্বদিকে তিনটি প্রধান প্রবেশপথ, উত্তর ও দক্ষিণেও তিনটি করে দরজা, আর পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব। বাংলাপিডিয়ার মসজিদ-স্থাপত্য আলোচনা অনুযায়ী বাংলাদেশের মাত্র চারটি নয় গম্বুজ মসজিদের মধ্যে বাগেরহাটের নয় গম্বুজ, এই মসজিদকুঁড় আর বরিশালের কসবা মসজিদ খান জাহান আলীর নির্মাণরীতিতে গড়া — অর্থাৎ এটি সেই একই স্থাপত্যধারার দক্ষিণতম নিদর্শন। তুলনার জন্য বলা যায়, একই রীতির সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ। মসজিদটি এখনো সক্রিয় — প্রতিদিনের নামাজের পাশাপাশি রমজানে জুমার নামাজে আশপাশের উপজেলা থেকেও মুসল্লিরা আসেন; প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে এর তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থাও আছে।

কয়রা: সুন্দরবনের সবচেয়ে কাছের জনপদ

মসজিদ দেখে সময় থাকলে কয়রা সদরের দক্ষিণে শাকবাড়িয়া নদীর পাড়ে একবার যান — কয়রার আসল চরিত্র সেখানেই। কয়রা উপজেলার মোট আয়তন প্রায় ১,৭৭৫ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় ১,৫০০ বর্গকিলোমিটারই সংরক্ষিত সুন্দরবন। উপজেলা সদর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে শাকবাড়িয়া নদীর এক পাশে লোকালয়, অন্য পাশে বনের সবুজ দেয়াল — স্থানীয়দের ভাষ্যে লোকালয়ের পার থেকেই চোখে পড়ে বনের ধারে ঘাস খাওয়া চিত্রা হরিণ, গাছে গাছে বানর, আর নদীতে কখনো কুমির বা শুশুক। স্থানীয়দের দাবি, আর কোনো উপজেলা সদর সুন্দরবনের এত কাছে নয়। একটি সৎ তথ্য: এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও কয়রায় এখনো কোনো সাজানো পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি — গোলখালী থেকে কেওড়াকাটায় স্থান বদলেও ট্যুরিজম বোর্ড অনুমোদিত পর্যটনকেন্দ্রের নির্মাণকাজ বছরের পর বছর শুরু হয়নি (পত্রিকা প্রতিবেদন অনুযায়ী)। অর্থাৎ কয়রা ভ্রমণে পাবেন অনায়াস, অসাজানো জনপদ-অভিজ্ঞতা — তবে থাকা-খাওয়ার প্রস্তুতি সেই অনুযায়ী রাখুন। আর মনে রাখুন, কয়রা থেকে সরাসরি সুন্দরবনে ঢোকার কোনো অনুমোদিত পর্যটক-প্রবেশপথ নেই; বনে প্রবেশ করতে হয় অনুমতিসহ নির্ধারিত পয়েন্ট দিয়ে (বিস্তারিত আমাদের সুন্দরবন ভ্রমণ গাইডে)।

কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন

খুলনা শহর থেকে মসজিদকুঁড়ের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। শহর থেকে কয়রাগামী বাসে চড়ে কয়রা সদর, সেখান থেকে স্থানীয় যানে আমাদি ইউনিয়নের মসজিদকুঁড় গ্রাম — সব মিলিয়ে অন্তত আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় হাতে রাখুন, রাস্তার অবস্থা ভেদে বেশি লাগতে পারে। গ্রামের ভেতরের পথে শেষ অংশটা ইজিবাইক বা ভ্যানে যেতে হবে। একই ভ্রমণে আমাদির বুড়ো খাঁ-ফতে খাঁর দিঘি আর সময় মিললে কয়রার অন্যান্য পুরনো নিদর্শন (খালে খাঁর দিঘি, বেদকাশির প্রতাপাদিত্য-স্মৃতিস্থল) দেখে নেওয়া যায়। সেরা সময় শীতকাল — নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি; বর্ষায় এই অঞ্চলের পথ ও নদীপাড় চলাচলের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে, আর ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে উপকূলীয় আবহাওয়ার সতর্কতা মাথায় রাখা জরুরি।

টিপস

মসজিদটি একইসঙ্গে প্রত্ননিদর্শন ও সক্রিয় ইবাদতখানা — নামাজের সময়ে ভেতরে ঘোরাঘুরি এড়িয়ে চলুন, পোশাকে শালীনতা রাখুন, ভেতরে ছবি তোলার আগে ইমাম বা তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নিন। শুক্রবার জুমার সময় ভিড় থাকে, ইতিহাস দেখতে চাইলে অন্য দিনে যাওয়া সুবিধাজনক। কয়রায় রাত কাটানোর ভালো ব্যবস্থা সীমিত — বেশি ভাগ ভ্রমণকারী খুলনা শহর থেকে দিনে গিয়ে দিনেই ফেরেন; যারা থাকতে চান, উপজেলা সদরের সাধারণ মানের হোটেল-বোর্ডিংই ভরসা। শাকবাড়িয়ার পাড়ে গেলে বনের দিকে নৌকা নিয়ে নিজে উদ্যোগে অগ্রসর হবেন না — বনরক্ষীদের অনুমতি ছাড়া বনে প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং কুমির-বাঘের এলাকায় তা বিপজ্জনকও বটে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

মসজিদকুঁড় নামটি এলো কোথা থেকে?

শতাব্দী ধরে জঙ্গল আর পলির নিচে চাপা থাকা মসজিদটি ১৯৪৭ সালে মাটি খুঁড়ে (কুঁড়ে) আবার আবিষ্কৃত হয় — সেই থেকেই এই নাম। পরে গ্রামটিও একই নামে পরিচিতি পায়।

মসজিদটি কে নির্মাণ করেছিলেন?

শিলালিপি না থাকায় নিশ্চিত করে বলা যায় না। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, ১৪৫০–১৪৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে খান জাহান আলীর যুগে এটি নির্মিত; জনশ্রুতিতে নির্মাতা তাঁর সহচর বুড়া খাঁ ও পুত্র ফতেহ খাঁ।

মসজিদে কি এখনো নামাজ হয়?

হয় — এটি সক্রিয় মসজিদ। রমজান ও জুমার দিনে দূর থেকেও মুসল্লিরা আসেন। দর্শনার্থীদের নামাজের সময়ের প্রতি সম্মান রাখা উচিত।

খুলনা থেকে কয়রা যেতে কতক্ষণ লাগে?

মসজিদকুঁড় পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার পথ — বাস ও স্থানীয় যান মিলিয়ে মোটামুটি আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে রাখা ভালো।

কয়রা থেকে কি সুন্দরবনে ঢোকা যায়?

সরাসরি পর্যটক-প্রবেশের ব্যবস্থা কয়রায় নেই। লোকালয়ের পাড় থেকে বন দেখা যায়, কিন্তু বনে প্রবেশ করতে হলে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে নির্ধারিত প্রবেশপথ ব্যবহার করতে হয়।

শেষকথা

মসজিদকুঁড় মসজিদ একসঙ্গে বিস্ময় আর বিষাদ — বিস্ময়, কারণ পাঁচ শ বছরের পুরনো একটি মসজিদ আবার মাটির উপর নিজের জায়গা ফিরে পেয়েছে; বিষাদ, কারণ এর যত্ন আর পরিচিতি এখনো এর ইতিহাসের তুলনায় অনেক কম। কয়রার নদীপাড়ের অকৃত্রিম দৃশ্য যোগ হলে এই ভ্রমণটা খুলনা সফরের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।