দক্ষিণবঙ্গের আধ্যাত্মিক মানচিত্রে মির্জাগঞ্জের নামটি জড়িয়ে আছে একজন মানুষের সঙ্গে — হযরত ইয়ার উদ্দিন খলিফা (রহ.)। পটুয়াখালী শহর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে মির্জাগঞ্জ উপজেলা সদরের এই দরবারে সারা বছরই জিয়ারতে আসেন হাজারো ভক্ত; শুধু সমাধি নয়, এই মাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ইয়াতিমখানা, মাদ্রাসা আর দেশজোড়া এক দানবাক্স-ব্যবস্থা।
জীবনী: শরীয়তপুর থেকে শ্রীমন্ত নদীর পাড়ে
বরিশালপিডিয়ার জীবনী অনুযায়ী ইয়ার উদ্দিন খলিফার জন্ম আনুমানিক ১৮৫১ সালে (বাংলা ১২৫৮) শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার রাজনগর গ্রামে; তাঁর পিতা সরাই খা ছিলেন হাজী শরীয়ত উল্লাহর সহকর্মী। বাল্যে পিতাকে হারিয়ে মায়ের সঙ্গে নানাবাড়ি ধামসি গ্রামে চলে যান তিনি, সেখানে নবু দরবেশ নামে এক ব্যক্তির কাছে কোরআন পড়া শেখেন — তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মূলত এ পর্যন্তই। অল্প বয়সে পালং থানার দেওভোগ গ্রামে বিয়ে করেন; কিন্তু কলেরায় স্ত্রী ফাতেমা বেগম ও পুত্রের মৃত্যু তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই সময় ফরিদপুর অঞ্চল থেকে ধান-সুপারির ব্যবসায়ীরা দক্ষিণবঙ্গে আসতেন — তাঁদের সঙ্গেই তিনি চলে আসেন এ অঞ্চলে। প্রথমে শ্রীমন্ত নদীর পাড়ে খড়-কুটোর ঘর, পরে মির্জাগঞ্জের স্টিমারঘাটের পাশে একচালা ছাপড়ার ঘরে থেকে সুচ-সুতা দিয়ে সেলাইয়ের কাজ (দর্জি পেশা) করতেন তিনি (বরিশালপিডিয়া)। সেই ছাপড়া থেকেই ক্রমে গড়ে ওঠে তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানুষের সেবার জীবন — ব্যবসা, সাধনা ও সমাজসেবা একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার জন্যই তিনি স্থানীয়দের কাছে এতটা শ্রদ্ধার (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
মাজার ও দরবারের প্রতিষ্ঠানসমূহ
১৯২১ সালে (আনুমানিক ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) তাঁর মৃত্যুর পর মির্জাগঞ্জেই তাঁকে দাফন করা হয় — সেই সমাধিকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে আজকের মাজার ও দরবার (বাংলা উইকিপিডিয়া)। মাজারের পাশে রয়েছে তাঁর সফরসঙ্গী মরহুম গগন আলী মল্লিকের সমাধিও (বাংলা উইকিপিডিয়ার ছবির বিবরণ)। দরবারটি শুধু জিয়ারতের জায়গা নয় — এখানে পরিচালিত হয় ইয়াতিমখানা ও শিক্ষা ব্যবস্থা (প্রায় ১৫০–২০০ শিক্ষার্থী), সিনিয়র মাদ্রাসা ও হেফজখানা এবং মসজিদকেন্দ্রিক ধর্মীয় কার্যক্রম (বাংলা উইকিপিডিয়া)। খলিফা সাহেবকে ঘিরে লোকমুখে কাঁঠাল ও মাছ সংক্রান্ত অলৌকিক ঘটনাসহ নানা কারামতের কাহিনি প্রচলিত আছে — এগুলো ভক্তদের লোকবিশ্বাসের অংশ হিসেবেই দেখা উচিত (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
দানবাক্সের গল্প: সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সেবার জাল
এই দরবারের সবচেয়ে আলোচিত দিকটি তার দানবাক্স-ব্যবস্থা। আজকের পত্রিকার ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনের শিরোনামেই ছিল — মাজারের প্রায় ৩০ হাজার দানবাক্স; সারা দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই বাক্সগুলোতে ভক্তদের দেওয়া দানেই চলে ইয়াতিমখানা, মাদ্রাসাসহ দরবারের শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কাজ (বাংলা উইকিপিডিয়া/আজকের পত্রিকা)। লাল রঙের এই দানবাক্স দক্ষিণবঙ্গের পথে-ঘাটে অনেকেরই চেনা দৃশ্য। জিয়ারতে গেলে দরবারের তথ্য-বোর্ডে খলিফা সাহেবের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্তও পড়ে নেওয়া যায়। ধর্মীয় ভ্রমণে আগ্রহীদের জন্য বরিশালের আরেক উল্লেখযোগ্য ঠিকানা উজিরপুরের গুঠিয়া মসজিদ — একই সফরে দুটোই দেখা সম্ভব।
কীভাবে যাবেন ও জিয়ারতের শিষ্টাচার
মির্জাগঞ্জ পটুয়াখালী জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমের উপজেলা — পটুয়াখালী সদর থেকে বাস ও স্থানীয় যানে মির্জাগঞ্জ সদরে পৌঁছে সেখান থেকে রিকশা-অটোতে মাজার। বরিশাল দিক থেকেও বাকেরগঞ্জ হয়ে মির্জাগঞ্জে আসা যায় (বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলার উত্তরে বাকেরগঞ্জ)। যাত্রার আগে স্থানীয় পরিবহনের সময় জেনে নিন। জিয়ারতের ক্ষেত্রে সাধারণ শিষ্টাচার মেনে চলুন: পরিচ্ছন্ন ও শালীন পোশাক, মাজার প্রাঙ্গণে নীরবতা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা, ছবি তোলার আগে কর্তৃপক্ষ বা উপস্থিতদের অনুমতি নেওয়া, আর দান করতে চাইলে নির্ধারিত দানবাক্সেই দিন। শুক্রবার ও ধর্মীয় উপলক্ষে ভিড় বেশি থাকে — শান্ত পরিবেশ চাইলে অন্য দিন বেছে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ইয়ার উদ্দিন খলিফা কে ছিলেন?
দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম সুফি সাধক (আনু. ১৮৫১–১৯২১)। শরীয়তপুরের রাজনগরে জন্ম; জীবনের বড় অংশ মির্জাগঞ্জে কাটিয়ে সাধনা, ব্যবসা ও সমাজসেবা করেছেন (বরিশালপিডিয়া/বাংলা উইকিপিডিয়া)।
মাজারটি কোথায়, কবে প্রতিষ্ঠিত?
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলা সদরে; ১৯২১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর এখানে দাফন থেকেই মাজারের শুরু (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
দরবারে কী কী প্রতিষ্ঠান আছে?
ইয়াতিমখানা (প্রায় ১৫০–২০০ শিক্ষার্থী), সিনিয়র মাদ্রাসা, হেফজখানা ও মসজিদ — দানবাক্সের তহবিলে এগুলো পরিচালিত হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
দানবাক্স কেন এত বিখ্যাত?
আজকের পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী সারা দেশে মাজারের প্রায় ৩০ হাজার দানবাক্স রয়েছে; ভক্তদের দানে দরবারের শিক্ষা ও সেবাকাজ চলে।
পটুয়াখালী শহর থেকে কীভাবে যাব?
বাস বা স্থানীয় যানে মির্জাগঞ্জ সদর, তারপর রিকশা-অটোতে মাজার। বরিশাল দিক থেকে বাকেরগঞ্জ হয়েও আসা যায়।
শেষকথা
একচালা ছাপড়ায় সুচ-সুতো সেলাই করা এক দর্জি থেকে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম শ্রদ্ধেয় সুফি — ইয়ার উদ্দিন খলিফার জীবনটাই এই দরবারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। ধর্মীয় অনুভূতি যাই হোক, শত বছর ধরে চলা এই সেবা-প্রতিষ্ঠানগুলো দেখতে মির্জাগঞ্জের এই সফর পটুয়াখালী ভ্রমণকে দেবে আলাদা এক গভীরতা।