শালবনের ছায়াঘেরা পথ পেরিয়ে যে সবুজ গ্রামটিতে পা রাখলেই মনে হয় কোনো গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন, সেটি গাজীপুরের পিরুজালিতে নুহাশ পল্লী — কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের (১৯৪৮–২০১২) নিজের হাতে গড়া স্বপ্নের জগৎ। লেখক এখানে শুধু বেড়াতে আসতেন না; জীবনের শেষ বছরগুলোর বড় অংশ কেটেছে এই পল্লীতে লেখালেখি, নাটক-সিনেমার শুটিং আর বৃষ্টি দেখে। একই পিরুজালি এলাকায় গাজীপুর সাফারি পার্কও — দুটো মিলিয়ে দিনটা সাজানো যায়।
২২ বিঘা থেকে ৪০ বিঘার স্বপ্ন
১৯৮৭ সালে হুমায়ূন আহমেদ মাত্র ২২ বিঘা জমি নিয়ে শুরু করেন; আজ আয়তন প্রায় ৪০ বিঘা (দ্য এশিয়ান এজ/ভ্রমণগাইড)। নামটি তাঁর ও গুলতেকিন খানের পুত্র নুহাশের নামে। গাজীপুর সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে, মির্জাপুর ইউনিয়নের পিরুজালি গ্রামে শালগাছের সারির ভেতরে এই পল্লী — প্রবেশপথেই চোখে পড়বে ভাস্কর আসাদুজ্জামান খানের তৈরি "মা ও শিশু" ভাস্কর্য। লেখকের মৃত্যুর পর (১৯ জুলাই ২০১২) তাঁকে এখানেই সমাহিত করা হয় — প্রবেশ পথের পাশে লিচু বাগানের ছায়ায় তাঁর কবর নুহাশ পল্লীকে ভক্তদের জন্য তীর্থে পরিণত করেছে (ভ্রমণগাইড)।
লীলাবতী দীঘি, ভূতবিলাস ও বৃষ্টিবিলাস
পল্লীর সর্ব-উত্তরে বিশাল লীলাবতী দীঘি — নামটি হুমায়ূন আহমেদের অকালমৃত কন্যা লীলাবতীর স্মৃতিতে; দীঘির ওপর কাঠের সেতু, মাঝখানে কৃত্রিম দ্বীপে তাঁবু (দ্য এশিয়ান এজ)। দীঘির পাশে ভূতবিলাস — লেখক আমেরিকায় চিকিৎসাধীন থাকাকালে নির্মিত এই ভবনটি তিনি শেষ সফরে উদ্বোধন করেন, মাঝরাতে বারান্দায় বসে সত্যিকারের ভূত দেখার বিলাসে (দ্য এশিয়ান এজ)। বৃষ্টি আর পূর্ণিমা দেখার জন্য তৈরি টিনের বারান্দাওয়ালা কটেজ বৃষ্টিবিলাস, ঠিক উল্টোদিকে তাঁর বিখ্যাত ট্রি হাউস (ভ্রমণগাইড)। আরও আছে আঁকাবাঁকা সুইমিং পুল — যেখানে তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে সাঁতার কেটেছিলেন বলে জানা যায়, দাবা খেলার ঘর, নামাজের স্থান, শিশুদের জন্য ভূত ও ব্যাঙের মজার ভাস্কর্য, একটি ছোট চা বাগান আর প্রায় ৩০০ প্রজাতির গাছের সংগ্রহসহ ঔষধি বাগান (ভ্রমণগাইড/দ্য এশিয়ান এজ)। পেছনের টিন ও কাদামাটির বাড়িটি তাঁর নাটকের শুটিং স্পট। প্রতি পহেলা বৈশাখে এখানে বৈশাখী মেলাও বসত (ওয়ান্ডারলগ)।
যাওয়ার আগে যা জানা জরুরি
প্রবেশ ফি: সাধারণত জনপ্রতি ২০০ টাকার মতো (ওয়ান্ডারলগ) — যাওয়ার আগে হালনাগাদ জেনে নেওয়া ভালো। খাবার: পল্লীর ভেতরে কোনো হোটেল-রেস্তোরাঁ নেই — হালকা খাবার সঙ্গে নিন; বড় দলের পিকনিকের (সাধারণত নভেম্বর–মার্চ মৌসুমে, আগাম বুকিংয়ে) ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগে থেকে খাবারসহ সব ব্যবস্থা ঠিক করতে হয় (দ্য এশিয়ান এজ)। ভিড়: ছুটির দিনে প্রচণ্ড ভিড় হয় — শান্ত পরিবেশ চাইলে সপ্তাহের মাঝামাঝি কোনো দিন যান (ওয়ান্ডারলগ)। যাওয়া: ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে হোটাপাড়া বাসস্ট্যান্ড নেমে টেম্পু/রিকশায় প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে পিরুজালি (দ্য এশিয়ান এজ)। মনে রাখুন, এটি একজন প্রিয় লেখকের স্মৃতিধন্য স্থান — কবরের পাশে নীরবতা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখুন। সাহিত্যিক-স্মৃতির এই ধারা দেশে আরও আছে — কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়ায় মীর মশাররফ হোসেনের জন্মভিটা তার অন্যতম।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নুহাশ পল্লী কবে, কে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৯৮৭ সালে হুমায়ূন আহমেদ; শুরুতে ২২ বিঘা, এখন প্রায় ৪০ বিঘা (দ্য এশিয়ান এজ/ভ্রমণগাইড)।
নামটি এলো কোথা থেকে?
হুমায়ূন আহমেদের পুত্র নুহাশের নামে (ভ্রমণগাইড)।
হুমায়ূন আহমেদের কবর কোথায়?
নুহাশ পল্লীর ভেতরে লিচু বাগানের ছায়ায় (ভ্রমণগাইড)।
লীলাবতী দীঘির নামকরণ কেন?
লেখকের অকালমৃত কন্যা লীলাবতীর স্মৃতিতে (দ্য এশিয়ান এজ)।
ভেতরে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে কি?
কোনো হোটেল-রেস্তোরাঁ নেই; খাবার সঙ্গে নিন বা পিকনিক হলে আগাম ব্যবস্থা করুন (দ্য এশিয়ান এজ)।
শেষকথা
নুহাশ পল্লী কোনো সাধারণ পিকনিক স্পট নয় — এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রিয় গল্পকারের মনের মানচিত্র, যেখানে তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো যেন এখনো হেঁটে বেড়ায়। বৃষ্টির দিনে বৃষ্টিবিলাসের বারান্দায় বসতে পারলে অভিজ্ঞতাটা হয়ে ওঠে ঠিক তাঁর লেখার মতোই জাদুকরী।