• 30 Oct, 2026

মুন্সীগঞ্জ শহরে ইদ্রাকপুর কেল্লা — ১৬৬০ সালে মীর জুমলার নির্মাণ, ত্রিভুজ জলদুর্গ ব্যবস্থা, গোলাকার ড্রাম টাওয়ার, গুপ্ত অস্ত্রাগার, সংস্কার ও জাদুঘরসহ ভ্রমণ গাইড।

মুন্সীগঞ্জ শহরের ব্যস্ত বাজারের মাঝখানে হঠাৎ চোখে পড়ে উঁচু ইটের প্রাচীর আর তার ওপরে বিশাল গোলাকার এক মঞ্চ — এটি ইদ্রাকপুর কেল্লা, মোঘল বাংলার জলদুর্গগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত ও সবচেয়ে ভালো অবস্থায় টিকে থাকা একটি। সাড়ে তিনশ বছর আগে এই দুর্গ থেকেই ঢাকার দিকে ধেয়ে আসা জলদস্যুদের পথ রুখে দাঁড়াতেন মোঘল সৈন্যরা।

১৬৬০: ত্রিভুজ প্রতিরক্ষার কেন্দ্র

সপ্তদশ শতকে মগ (আরাকানি) ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা মেঘনা-শীতলক্ষ্যা পথে ঢাকা পর্যন্ত লুটপাট চালাত। ১৬৬০ সালে বাংলার সুবাহদার নিযুক্ত হয়ে মীর জুমলা গড়ে তোলেন নদীকেন্দ্রিক ত্রিভুজ প্রতিরক্ষা — মেঘনা, ইছামতী ও শীতলক্ষ্যার পথ ধরে তিনটি জলদুর্গ, যার কেন্দ্রে ছিল আনুমানিক ১৬৬০ সালে নির্মিত ইদ্রাকপুর; বাকি দুটি নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা ও হাজীগঞ্জ দুর্গ (বাসস, ডিসেম্বর ২০২৫)। দুর্গটি ছিল তখনকার ইছামতী-মেঘনা সঙ্গমের কাছে কৌশলগত অবস্থানে (নদীর গতিপথ বদলে ইছামতী এখন শুকনো খাল)। এখানে মোতায়েন ছিল নৌসেনাপতি আবুল হোসেনের অধীনে প্রায় ২০০ জাহাজের মোঘল নৌবহর — ঢাকাগামী দস্যুদের প্রথম প্রতিরোধ-রেখা (দ্য এশিয়ান এজ/বাসস)। দুর্গটি শুধু যুদ্ধের নয়, ঢাকার মসলিন ও পণ্য বহনকারী বাণিজ্যতরীর নিরাপত্তারও ঘাঁটি ছিল (বাসস)।

গোলাকার ড্রাম — এই দুর্গের আসল বিস্ময়

ইটের তৈরি চতুর্ভুজ দুর্গটি উত্তর-দক্ষিণে ৮৬.৮৭ মিটার লম্বা ও ৫৯.৬০ মিটার চওড়া (বাসস/প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর)। প্রাচীরের কোণে গোলাকার বুরুজ, ওপরে মার্লন ও বন্দুক চালানোর ছিদ্র; উত্তরে একমাত্র প্রধান ফটক, যার ওপরে প্রহরীদের কক্ষ। দুর্গের সবচেয়ে অভিনব অংশ পূর্বদিকের গোলাকার উঁচু মঞ্চ বা "ড্রাম" — ব্যাস প্রায় ৩২.৫ মিটার, উচ্চতা ৯.১৪ মিটার, সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা যায় (দ্য এশিয়ান এজ/বাসস)। তিন স্তরের এই মঞ্চে বসত ভারী কামান; চূড়ার গড়ন পদ্মের পাপড়ির মতো, গায়ে দূর-কাছের শত্রুর জন্য সাজানো ফায়ারিং ছিদ্র (বাসস/ডেইলি সান)। ড্রামের পাদদেশে গুপ্ত সিঁড়ি নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ কক্ষে — জনশ্রুতিতে তা পালানোর সুড়ঙ্গ হলেও, প্রকৃতপক্ষে সেটি ছিল অস্ত্র ও বারুদের গুদামঘর (দ্য এশিয়ান এজ)। দুর্গের ভেতরে ছিল সৈন্যদের পানির জলাধারও (বাসস)। স্থাপত্যের এই ধরন দেখে দুর্গটিকে লালবাগ কেল্লার সমসাময়িক প্রতিরক্ষা-ভাবনার সঙ্গে তুলনা করেন ইতিহাসবিদরা (বাসস)।

সংস্কার, জাদুঘর ও আজকের অবস্থা

ব্রিটিশ আমল পেরিয়ে দুর্গটি নানা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে; ড্রামের ওপরে একসময় জেলা প্রশাসকের বাসভবনও ছিল (বাংলাদেশ অন রেকর্ড)। ২০১৫ সালের সংস্কারকাজের সময় মেঝের প্লাস্টার তোলার সময় কর্মীরা খুঁজে পান সারি সারি সাজানো প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো মাটির কলস — যার উদ্দেশ্য নিয়ে গবেষকদের কৌতূহল আজও (দ্য এশিয়ান এজ)। সাম্প্রতিক সংস্কারের প্রথম পর্যায় শেষ হয়েছে এবং দুর্গের ভেতরে জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে; পরবর্তী পর্যায়ের প্রস্তুতি চলছে (বাসস ২০২৫/ডেইলি সান)। শহরের মাঝে হওয়ায় প্রাচীরের বাইরের অংশে পলি ও দখলের চাপ আছে, তবে মূল কাঠামো ও গোল টাওয়ার অক্ষত।

যাতায়াত

মুন্সীগঞ্জ সদর শহরের ভেতরেই দুর্গ — ঢাকা থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে (বাংলাদেশ অন রেকর্ড)। গুলিস্তান/যাত্রাবাড়ী থেকে মুন্সীগঞ্জগামী বাসে শহরে নেমে রিকশায় কেল্লা। শহরে নেমে স্থানীয় কাউকে "কেল্লা" বললেই চেনে। ড্রামের ওপরে উঠে শহর ও চারপাশের নদী-খালের দৃশ্য দেখাটাই এখানকার সেরা মুহূর্ত; সঙ্গে বিক্রমপুরের ঐতিহাসিক গ্রামাঞ্চল ঘুরে নেওয়া যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ইদ্রাকপুর কেল্লা কে, কবে বানান?

আনুমানিক ১৬৬০ সালে বাংলার সুবাহদার মীর জুমলা (বাসস)।

ত্রিভুজ জলদুর্গ ব্যবস্থা কী?

ঢাকা রক্ষায় তিন দুর্গের শৃঙ্খল — ইদ্রাকপুর, হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দা (বাসস)।

গোলাকার ড্রামটি কী কাজে লাগত?

ভারী কামান বসানোর উঁচু মঞ্চ ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার (দ্য এশিয়ান এজ)।

ভূগর্ভস্থ কক্ষটি কি সুড়ঙ্গ ছিল?

না — সিঁড়িটি নামে অস্ত্র-বারুদের গুদামঘরে; সুড়ঙ্গের ধারণাটি জনশ্রুতি (দ্য এশিয়ান এজ)।

এখন ভেতরে কী দেখা যায়?

সংস্কারকৃত প্রাচীর ও ড্রাম টাওয়ার এবং নতুন জাদুঘর-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (বাসস ২০২৫)।

শেষকথা

হাজীগঞ্জ বা লালবাগের মতো ইদ্রাকপুর নামডাকে পিছিয়ে থাকলেও প্রকৌশলের দিক থেকে এটি মোঘল জলদুর্গগুলোর সবচেয়ে সৃজনশীল নমুনা। ঢাকা থেকে এক ঘণ্টার পথে এমন দুর্গ থাকাটা সৌভাগ্য — একদিনের বিক্রমপুর ভ্রমণে এটিকে কেন্দ্র করেই রুট সাজান।