মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামে একই মঞ্চের ওপর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুটি মিনারসদৃশ মন্দির — স্থানীয়ভাবে সোনারং জোড়া মঠ নামে বিখ্যাত। নামে "মঠ" হলেও এগুলো আসলে জোড়া মন্দির, আর এদের ঘিরে এত বেশি অতিরঞ্জিত দাবি ছড়িয়ে আছে যে, আসল গল্পটা জানাটাই এখানে আসার প্রথম আনন্দ। বিক্রমপুর ভ্রমণে ইদ্রাকপুর কেল্লার সঙ্গে একই দিনে এটি সহজেই মিলিয়ে নেওয়া যায়।
শিলালিপি যা বলে: রূপচন্দ্রের স্মৃতিমন্দির
মন্দিরের শিলালিপি অনুযায়ী, স্থানীয় হিন্দু বণিক-জমিদার রূপচন্দ্র (স্ত্রী ভবানীমোহনসহ) তাঁর পিতা-মাতার স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁদের দাহস্থলে মন্দির দুটি নির্মাণ করেন: পূর্বদিকের বড় মন্দিরটি ১৮৪৩ সালে এবং পাশে ছোট মন্দিরটি ১৮৮৬ সালে (বাসস, ডিসেম্বর ২০২৫)। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিবরণে বড়টি কালী মন্দির ও ছোটটি শিব মন্দির — যদিও প্রত্নতত্ত্ব জরিপ প্রতিবেদন (২০০০)-ভিত্তিক একটি ভাষ্যে বড়-ছোটর দেবতা উল্টোভাবে উল্লেখ আছে (দ্য ডেইলি স্টার), তাই এই পরিচয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে সামান্য মতভেদ আছে। দুটি মন্দির একই মঞ্চে মাত্র কয়েক ফুট ব্যবধানে দাঁড়িয়ে থাকাতেই "জোড়া" নামের উৎপত্তি (বাসস)। লক্ষণীয়, অনেকে একে "অষ্টাদশ শতকের" নিদর্শন বললেও শিলালিপির তারিখ অনুযায়ী নির্মাণ আসলে ঊনবিংশ শতকের।
কাঠামো — আর উচ্চতার মিথ ভাঙন
দুটি মন্দিরই অষ্টভুজাকার ভিত্তির (দৈর্ঘ্য-প্রস্থে প্রায় ২১ ফুট) ওপর চুন-সুরকির পুরু দেয়ালে নির্মিত; মূল উপাসনালয়ের সঙ্গে বারান্দা (বড়টির ১.৯৪ মিটার, ছোটটির ১.৫ মিটার), ওপরে গম্বুজ ও ধাপ-কাটা শিখর, বড় মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বড় মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ১৫ মিটার (বাংলা উইকিপিডিয়া)। এখানে একটি জনপ্রিয় ভুল সোজা করে দেওয়া জরুরি: কিছু গাইড ও ওয়েবসাইটে দাবি করা হয় এই মঠ নাকি ২৪১–২৪৬ ফুট উঁচু, দিল্লির কুতুব মিনারের চেয়েও উঁচু এবং "উপমহাদেশের সর্বোচ্চ মঠ" — পরিমাপের সঙ্গে এই দাবির কোনো মিল নেই; এটি নিঃসন্দেহে অতিরঞ্জন। সামনে বড় পুকুর, আর মন্দিরের ওপরের খোঁড়লগুলোতে বাসা বেঁধেছে টিয়া, শালিক ও ঘুঘুর ঝাঁক — দিনভর পাখির কলকাকলিই এখন জায়গাটির প্রাণ (ভ্রমণগাইড/দ্য এশিয়ান এজ)। মন্দির-স্থাপত্যের এই ধারাবাহিকতায় যশোরের এগারো শিব মন্দিরের সমষ্টিও একই ঐতিহ্যের আরেক রূপ।
বর্তমান অবস্থা
দুঃখের কথা, শিলালিপিটিসহ মন্দিরের ভেতরের শিলাপাথর চুরি হয়ে গেছে; বিভিন্ন সময়ে কষ্টিপাথরের কলস, শিবলিঙ্গসহ মূল্যবান সামগ্রীও লুট হয়েছে (বাসস/ভ্রমণগাইড)। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, দীর্ঘ অযত্নে জৌলুস হারিয়েছে স্থাপনা দুটি — প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকলেও সংস্কারের অপেক্ষায় (বাসস ২০২৫/দ্য ডেইলি স্টার)। এখন নিয়মিত পূজা-অর্চনাও হয় না (দ্য এশিয়ান এজ, স্থানীয়দের ভাষ্য)। তবু টঙ্গীবাড়ীতে এলে আউটশাহী মঠসহ আশপাশের আরও কয়েকটি পুরনো মঠ-মন্দির মিলিয়ে একটি ছোট্ট হেরিটেজ সার্কিট সাজানো যায় (দ্য ডেইলি স্টার)।
যাতায়াত
মুন্সীগঞ্জ জেলা শহর থেকে সোনারং প্রায় ১০ কিলোমিটার (ভ্রমণগাইড)। ঢাকা থেকে বাসে মুন্সীগঞ্জ, সেখান থেকে টঙ্গীবাড়ী হয়ে অটো/রিকশায় সোনারং গ্রাম; টঙ্গীবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে জায়গাটি সহজে পৌঁছানো যায় (দ্য এশিয়ান এজ)। গ্রামের ভেতরের স্থান বলে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করে এগোনোই ভালো; পবিত্র স্থানের মর্যাদা রেখে ঘুরুন, খোঁড়লের পাখিদের বিরক্ত করবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সোনারং জোড়া মঠ আসলে কী?
মঠ নয়, একই মঞ্চে পাশাপাশি দুটি মন্দির — কালী ও শিব মন্দির (বাসস)।
কে, কবে নির্মাণ করেন?
হিন্দু বণিক-জমিদার রূপচন্দ্র; বড়টি ১৮৪৩ সালে, ছোটটি ১৮৮৬ সালে, পিতা-মাতার স্মৃতিতে (শিলালিপি/বাসস)।
মন্দির দুটি আসলে কত উঁচু?
বড়টি প্রায় ১৫ মিটার; "২৪১ ফুট, কুতুব মিনারের চেয়ে উঁচু" দাবিটি ভিত্তিহীন অতিরঞ্জন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
কোনটি কালী, কোনটি শিব মন্দির?
সংখ্যাগরিষ্ঠ বিবরণে বড়টি কালী (১৮৪৩), ছোটটি শিব (১৮৮৬); একটি জরিপ-ভাষ্যে উল্টো উল্লেখ আছে (বাসস/দ্য ডেইলি স্টার)।
এখন কি পূজা হয়?
নিয়মিত পূজা হয় না; স্থানটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে (দ্য এশিয়ান এজ)।
শেষকথা
সোনারং জোড়া মঠের আসল মূল্য মিথে নয় — মা-বাবার স্মৃতিতে গড়া দুটি মন্দির, টিয়াপাখির ঝাঁক আর বিক্রমপুরের স্তরিত ইতিহাসে। সঠিক তথ্য জেনে গেলে এই ছোট্ট স্থানটিই অনেক বড় হয়ে ধরা দেয়।