চট্টগ্রাম শহর থেকে কর্ণফুলী পেরিয়ে দক্ষিণে প্রায় ৩০ কিলোমিটার — পটিয়া সেই পুরনো জনপদ যেখানে বৌদ্ধ, হিন্দু আর মুসলিম ঐতিহ্য শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বেঁচে আছে। দক্ষিণে শঙ্খ নদী বয়ে যাওয়া এই উপজেলা প্রকৃতি-ভ্রমণের চেয়ে ঐতিহ্য-ভ্রমণের জন্যই মূল্যবান — কাছের সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ-এর তীর্থ-ধারারই যেন দক্ষিণের অধ্যায়।
চক্রশালা: বুদ্ধের চংক্রমণের স্মৃতি
পটিয়া সদর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার পূর্বে চক্রশালা মন্দির — বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন তীর্থ। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, তথাগত বুদ্ধ রেঙ্গুন (বার্মা) থেকে আসার পথে এখানে অবকাশ যাপন ও চংক্রমণ (ধ্যানপদচারণা) করেছিলেন — সেই ‘চংক্রমণ’ থেকেই নাম চক্রশালা বলে মনে করা হয়। মন্দিরের গায়ের পাথরে খোদাই করা আছে ‘ফরাতারা স্তূপ — নবতর সংস্কার ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ’ — স্তূপটির সংস্কারের সেই নথিই এর ধারাবাহিক গুরুত্বের প্রমাণ। শান্ত গ্রামীণ পরিবেশে স্তূপ ও মন্দির চত্বর ঘুরে দেখতে আধঘণ্টা যথেষ্ট।
ঠেগরপুনির বুড়াগোঁসাই মন্দির
সদর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে ভাটিখাইন-ঠেগরপুনি গ্রামে বুড়াগোঁসাই মন্দির — গল্পে ভরপুর এক তীর্থ। কথিত আছে, প্রায় সাড়ে তিনশ–চারশ বছর আগে ছান্দামা রাজার আমলে এখানে ছিল ছান্দামা দীঘি; রাজবংশ বিলুপ্ত হলে এলাকাটি বনে ঢাকা পড়ে ও প্রাচীন বুদ্ধমূর্তিটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। পরে মূর্তিটি উদ্ধার করে (লোককথায় স্বপ্নাদেশের গল্পও জড়িত) সেই জায়গাতেই গড়ে ওঠে মন্দির। প্রতি বছর প্রবারণা পূর্ণিমায় এখানে ফানুস উড্ডয়নসহ বড় ধর্মীয় আয়োজন হয় — সেই সময়ে গেলে পটিয়ার বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রাণবন্ত রূপ দেখা যাবে।
মুসা খাঁ মসজিদ ও মাজারগুলো
হুলাইন গ্রামে মুসা খাঁ মসজিদ — ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে (১০৬৬ হিজরি) আজিজ খাঁ কর্তৃক নির্মিত এই মসজিদ পটিয়ার প্রাচীনতম স্থাপনাগুলোর একটি, যা বাংলাপিডিয়ার প্রত্নসম্পদ তালিকায়ও স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া পৌর এলাকায় বাস স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে শাহচান্দ আউলিয়া (রহ.)-এর মাজার আর কোলাগাঁওয়ে গরিব আলী শাহ (রহ.)-এর মাজার শরীফ — স্থানীয়দের কাছে গভীর শ্রদ্ধার জায়গা।
ইতিহাসের আরেক পাতা: গৈরলায় মাস্টারদার গ্রেফতার
পটিয়ার মাটি বিপ্লবী ইতিহাসেরও সাক্ষী: ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এই উপজেলার গৈরলা গ্রামে ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন মাস্টারদা সূর্য সেন ও ব্রজেন্দ্র সেন — চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়কের স্বাধীন জীবনের শেষ ঠিকানা ছিল এই গ্রাম। আজ সেখানে বড় কোনো স্মৃতিস্তম্ভ না থাকলেও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে জায়গাটির নামই যথেষ্ট।
কীভাবে যাবেন
- রুট: চট্টগ্রাম শহর থেকে শাহ আমানত সেতু পেরিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ধরে পটিয়া বাস স্ট্যান্ড (প্রায় ১ ঘণ্টা); ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে পটিয়া স্টেশনেও নামা যায়। উপজেলার ভেতরের জায়গাগুলো সিএনজি/রিকশায়।
- সাজানো দিন: সকালে চক্রশালা → ঠেগরপুনি বুড়াগোঁসাই → দুপুরে হুলাইনের মুসা খাঁ মসজিদ → ফেরার পথে শাহচান্দ আউলিয়ার মাজার। প্রবারণা পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা মিলিয়ে গেলে অভিজ্ঞতা পূর্ণ হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পটিয়া কি দিনে গিয়ে ফেরা যায়?
হ্যাঁ — শহর থেকে ডে-ট্রিপেই সব প্রধান স্থান দেখা যায়।
চক্রশালা নামের অর্থ কী?
প্রচলিত মতে বুদ্ধের ‘চংক্রমণ’ (ধ্যানপদচারণা) স্মৃতি থেকে এই নাম।
এখানে কি থাকার ব্যবস্থা আছে?
পটিয়া সদরে সীমিত মানের হোটেল আছে; বেশিরভাগ দর্শনার্থী চট্টগ্রাম শহরে থেকে দিনে ঘুরে যান।
শেষকথা
পটিয়া বড় পর্যটন কেন্দ্র নয় — কিন্তু বৌদ্ধ তীর্থ, সাড়ে তিনশ বছরের মসজিদ আর বিপ্লবের স্মৃতি মিলে এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস বোঝার একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঐতিহ্যের এই ধারা আরও পড়তে চাইলে দেখুন লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। আপনার পটিয়া ভ্রমণ হোক অর্থবহ!