• 30 Oct, 2026

মাগুরার মোহাম্মদপুরে রাজা সীতারাম রায়ের (১৬৫৮–১৭১৪) রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ — পরিখাঘেরা প্রাসাদ-দুর্গ, দোলমঞ্চ, দশভুজা ও অষ্টকোণ লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, রামসাগর-কৃষ্ণসাগর দিঘি এবং ডিসির বাসভবনে পাওয়া রাজপালঙ্কের গল্প।

তিন শ বছর আগে এই মাটিতেই ছিল এক স্বাধীন রাজার রাজধানী — যিনি মুঘল-নবাবি শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে পাবনা থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত এক রাজ্য চালিয়েছিলেন। মাগুরার মোহাম্মদপুরে, মধুমতী নদীর পুরনো পাড়ে, রাজা সীতারাম রায়ের সেই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ আজও ছড়িয়ে আছে — পরিখা, প্রাসাদের ভগ্নাংশ, দোলমঞ্চ, মন্দির আর তিনটি বিশাল দিঘি। মাগুরা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বের এই প্রত্নস্থান খুলনা বিভাগের সবচেয়ে নাটকীয় ইতিহাস-ভ্রমণগুলোর একটি।

সীতারাম রায়: আমলা থেকে স্বাধীন রাজা

সীতারাম রায়ের (১৬৫৮–১৭১৪) শুরুটা ছিল মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের একজন আমলা হিসেবে — সেখান থেকে জমিদারি, তারপর রাজা উপাধি (প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬৮৬ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজসভা থেকে তিনি রাজা উপাধি পান)। ১৬৯৭–৯৮ সালের দিকে তিনি মোহাম্মদপুরে জমিদারির পত্তন করেন (আদার বেপারী) এবং ক্রমে তাঁর রাজ্য বিস্তৃত হয় উত্তরে পাবনা, দক্ষিণে সুন্দরবন, পূর্বে বরিশাল থেকে পশ্চিমে নদিয়া পর্যন্ত। প্রতাপ বেড়ে গেলে একপর্যায়ে তিনি নবাব সরকারকে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করে স্বাধীন, সার্বভৌম রাজার মতো শাসন শুরু করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। রুষ্ট নবাব মুর্শিদকুলি খান ফৌজদার আবু তোরাবের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠালে সীতারামের সৈন্যরা সেই বাহিনীকে পরাজিত করে — আবু তোরাব যুদ্ধে নিহত হন। কিন্তু ১৭১৪ সালে বখশ আলী খাঁর নেতৃত্বে আসা শক্তিশালী বাহিনীর কাছে সীতারাম পরাজিত, বন্দী ও নিহত হন — শেষ হয় তাঁর স্বল্পস্থায়ী স্বাধীন রাজ্যের (বাংলা উইকিপিডিয়া; সূত্র: সতীশচন্দ্র মিত্রের "যশোর-খুলনার ইতিহাস")। কথিত আছে, তাঁর ২,২০০ সৈন্য যুদ্ধের বাইরের সময়ে জনসাধারণের জন্য জলাশয় খনন করত — রাজধানীর বিশাল দিঘিগুলো সেই শ্রমেরই সাক্ষী।

রাজধানীতে যা টিকে আছে: পরিখা, দোলমঞ্চ, মন্দির, দিঘি

নিজের রাজ্য সুরক্ষিত রাখতে সীতারাম মোহাম্মদপুরে গড়েছিলেন দুর্ভেদ্য দুর্গ, কাঁচারিবাড়ি আর পরিখা-পরিবেষ্টিত রাজপ্রাসাদ (বাংলা উইকিপিডিয়া)। সেই পরিখা স্থানীয়ভাবে "গড়" নামে পরিচিত — একসময় এর ভেতর দিয়ে মধুমতি নদীর স্রোত প্রবাহিত হতো। আজ যা দেখা যায়: সিংহদরজা, রাজপ্রাসাদের ভগ্নাংশ, কাচারিবাড়ি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কার করা দোলমঞ্চ (প্রথম আলো), দশভুজা মন্দির, লক্ষ্মীনারায়ণের অষ্টকোণ মন্দির ও কৃষ্ণজীর মন্দির; আর সুপেয় পানির জন্য খনন করা তিনটি বিশাল দিঘি — রামসাগর, সুখসাগর ও কৃষ্ণসাগর (বাংলা উইকিপিডিয়া)। যা হারিয়ে গেছে, তালিকাটি তাও দীর্ঘ: বিলাস গৃহ, কোষাগার, মালখানা, তোষাখানা, নহবতখানা, গোলাঘর ও কারাগার (বাংলা উইকিপিডিয়া); ছিল অস্ত্র তৈরির কামারশালাও (প্রথম আলো)। রাজার মৃত্যুর পরও জনপদটি টিকে ছিল আরও শতবর্ষ — ১৮৩৬ সালের মহামারীতে মোহাম্মদপুর প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বাংলা ট্রিবিউনের সাম্প্রতিক ভ্রমণ-প্রতিবেদন অনুযায়ী, দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখনো এখানে আসেন, আর এলাকাবাসীর প্রত্যাশা — যথাযথ সংস্কার হলে মোহাম্মদপুর গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

রাজপালঙ্কের অদ্ভুত গল্প

২০১৯ সালে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে এক অভিনব তথ্য: তিন শ বছরের বেশি পুরনো রাজা সীতারাম রায়ের একটি পালঙ্কের খোঁজ মিলেছে মাগুরার জেলা প্রশাসকের বাসভবনে। তৎকালীন ডিসি আলী আকবর পালঙ্কটি নিজে ব্যবহারের কথা অস্বীকার করে জানান, এটি তাঁর বাসভবনে সংরক্ষিত আছে এবং তিনি তা মেরামত করেছেন (প্রথম আলো, ৩১ মে ২০১৯)। রাজা নেই, রাজ্য নেই — তবু রাজপ্রাসাদের অন্তত একটি আসবাব জেলা প্রশাসনের দপ্তরি কক্ষে টিকে আছে; মোহাম্মদপুর ঘুরে এলে এই গল্পটা স্থানীয়দের কাছ থেকে শুনে নেওয়ার মজাই আলাদা।

কীভাবে যাবেন

মাগুরা সদর থেকে মোহাম্মদপুর উপজেলা সদর প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে — বাসে সরাসরি যাওয়া যায়। রাজবাড়ি প্রত্নস্থানটি মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার উত্তরে, পাকা রাস্তার পাশে — রিকশা, ভ্যান বা পায়ে হেঁটেই পৌঁছানো যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। স্থাপনাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় হাতে অন্তত দুই-তিন ঘণ্টা রাখুন এবং স্থানীয় কাউকে গাইড হিসেবে নিলে প্রতিটি ধ্বংসাবশেষের পরিচয় মেলাতে সুবিধা হবে। মধুমতী ও নবগঙ্গা নদীর কাছাকাছি এই জনপদের প্রাকৃতিক পরিবেশটাও ঘোরার আনন্দ বাড়িয়ে দেয় (বাংলা ট্রিবিউন)। পুরো বিভাগের ঐতিহ্য-ছক চাইলে একই সফরে আগের দিন মুজিবনগর আর পরের দিন খুলনার দিকে ফেরার পথে আমঝুপি নীলকুঠি জুড়ে দেওয়া যায়। মন্দিরগুলোতে এখনো পূজা-অর্চনা হয় — শালীনতা ও স্থানীয় রীতি মেনে চলুন; প্রাসাদের ভগ্নপ্রায় অংশে ওঠা বা পরিখার ধসে যাওয়া পাড়ে নামা উচিত নয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

রাজা সীতারাম রায় কে ছিলেন?

সপ্তদশ-অষ্টদশ শতাব্দীর বাঙালি রাজা (১৬৫৮–১৭১৪) — নবাব সরকারের আমলা থেকে জমিদার ও রাজা হয়ে শেষে রাজস্ব বন্ধ করে স্বাধীন রাজ্য চালান; ১৭১৪ সালে নবাবের বাহিনীর কাছে পরাজিত ও নিহত হন।

মোহাম্মদপুরে এখন কী কী দেখা যায়?

পরিখা (গড়), সিংহদরজা, প্রাসাদের ভগ্নাংশ, কাচারিবাড়ি, দোলমঞ্চ, দশভুজা মন্দির, অষ্টকোণ লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির, কৃষ্ণজী মন্দির ও রামসাগর-সুখসাগর-কৃষ্ণসাগর দিঘি।

রাজধানীটি কোথায়, মাগুরা থেকে কত দূর?

মোহাম্মদপুর উপজেলায় — মাগুরা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে; বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রত্নস্থান মাত্র আধা কিলোমিটার উত্তরে।

রাজপালঙ্কটি কোথায় আছে?

প্রথম আলোর ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীতারাম রায়ের তিন শ বছরের পুরনো পালঙ্কটি মাগুরা জেলা প্রশাসকের বাসভবনে সংরক্ষিত ছিল।

সীতারামের রাজ্য কত বড় ছিল?

উত্তরে পাবনা থেকে দক্ষিণে সুন্দরবন, বরিশাল থেকে নদিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত — মোহাম্মদপুর ছিল তার রাজধানী।

শেষকথা

মোহাম্মদপুরের পরিখার পাড়ে দাঁড়ালে বাংলার ইতিহাসের এক অল্প-পঠিত অধ্যায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে — যখন একজন আমলা হয়েছিলেন রাজা, আর এক প্রজন্মের জন্য এই নদীতীরের জনপদ হয়েছিল এক স্বাধীন দেশের কেন্দ্র। রাজপ্রাসাদ ভেঙেছে, কিন্তু গল্পটা এখনো দিঘির জলে ভাসছে।