• 01 Nov, 2026

রাজার পাহাড় ও শেরপুরের খাবার গাইড — শ্রীবরদীর কর্ণঝোরায় গারো পাহাড়ের উঁচু চূড়া ও বাবেলাকোনা আদিবাসী জনপদের বিবরণ এবং জেলার দুটি জিআই পণ্য তুলশীমালা চাল (১৪তম, ২০২৩) ও ছানার পায়েশের (৪৪তম, ২০২৪) গল্প।

শেরপুরের পাহাড়ি বলয়ের শেষ বড় ঠিকানা শ্রীবরদীর রাজার পাহাড় — আর এই জেলার গল্প শুধু পাহাড়ে শেষ হয় না; পানিহাটা-তারানির মতো এখানেও প্রকৃতির পাশাপাশি আছে স্বাদের ঐতিহ্য। শেরপুর দেশের হাতে-গোনা জেলাগুলোর একটি, যার ঝুলিতে দুটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য — তুলশীমালা চাল আর ছানার পায়েশ। এই পোস্টে তাই পাহাড় আর খাবার একসঙ্গে।

রাজার পাহাড়: গারো শ্রেণির উঁচু চূড়া

শ্রীবরদী পৌর শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে কর্ণঝোরা বাজার-সংলগ্ন এলাকায় এই পাহাড় (আদার ব্যাপারী; ভ্রমণ গাইড) — গারো পাহাড়শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে উঁচু বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। নামের পেছনের গল্প লোককথা: প্রাচীনকালে এখানে এক স্বাধীন রাজ্য ছিল, প্রতাপশালী রাজার নামেই পাহাড়ের নাম (ভ্রমণ গাইড)। চূড়ার আকর্ষণ তার শতাধিক হেক্টর বিস্তৃত সবুজ সমতল ভূমি — সরু পথ বেয়ে উঠলেই চারদিকে খুলে যায় কর্ণঝোরা, মালাকোচা, দিঘলাকোনা, হারিয়াকোনা, চান্দাপাড়া, বাবেলাকোনা আর ওপারে ভারতের সীমান্ত এলাকার দৃশ্য। পাদদেশ দিয়ে কুলকুল শব্দে বয়ে গেছে খরস্রোতা ঢেউফা নদী — বর্ষায় কানায় কানায় ভরা, শীতে শীর্ণকায়া হলেও পানি শুকোয় না (সংবাদ-ভ্রমণ বিবরণ)। পাহাড়ের কোণে কোণে আম, কাঁঠাল, লিচু আর কলার বাগান; কাছে রাবার বাগানও আছে। শহুরে পর্যটকের কাছে এখনো কম পরিচিত হলেও স্থানীয়দের কাছে এটি প্রিয় বিনোদন স্পট।

বাবেলাকোনা: পাহাড়ের পাদদেশে আদিবাসী জনপদ

রাজার পাহাড়ের তলায় বাবেলাকোনা — গারো, হাজং ও কোচ সম্প্রদায়ের জনপদ। এখানে রয়েছে বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি, জাদুঘর, লাইব্রেরি, গির্জা ও মন্দির (ভ্রমণ গাইড) — পাহাড় দেখার ফাঁকে আদিবাসী সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ এটাই। পাশের হারিয়াকোনা গ্রামের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ গারো (প্রথম আলো) — মেঘালয়ের পুরাখাসিয়া থেকে নেমে আসা ঢেউফা সেখান দিয়েও বয়ে গেছে। অতিথি হিসেবে নিয়ম একটাই: মানুষের বাড়ি-ঘর ও উপাসনালয়ে সম্মানজনক দূরত্ব রাখুন, ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

তুলশীমালা: সুগন্ধি ধানের জেলা

শেরপুরের মাঠে হেমন্তে বাতাসে ভাসে যে মিষ্টি গন্ধ, তা তুলশীমালা ধানের (প্রথম আলো, ডিসেম্বর ২০২৫)। চিকন, কালচে-রঙা এই সুগন্ধি আমন ধানের সুনাম শত শত বছরের; 'পর্যটনের আনন্দে, তুলশীমালার সুগন্ধে' স্লোগানে ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসন একে ব্র্যান্ডিং পণ্য ঘোষণা করে, আর ১২ জুন ২০২৩-এ এটি পায় দেশের ১৪তম জিআই পণ্যের স্বীকৃতি (উইকিপিডিয়া; বিডিনিউজ২৪)। চলতি আমন মৌসুমে (২০২৫) জেলার পাঁচ উপজেলায় ৮ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে এর চাষ হয়েছে, সবচেয়ে বেশি নালিতাবাড়ীতে (জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, প্রথম আলো)। পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, পায়েস, পিঠা — সবেই এই চালের কদর; উৎসবে আত্মীয়ের বাড়িতে তুলশীমালা পাঠানো আর নতুন জামাইকে এর পোলাও খাওয়ানো জেলার প্রাচীন রীতি — তাই এর আরেক নাম 'জামাই আদুরি চাল' (ট্যুরবিডি)।

ছানার পায়েশ: ব্রিটিশ আমলের মিষ্টি, ৪৪তম জিআই

দ্বিতীয় গর্বটি মিষ্টির — ছানার পায়েশ। ব্রিটিশ আমলে শেরপুর শহরেরঘোষ পট্টির মিষ্টিকারিগরদের হাতে এর যাত্রা; সে যুগে কলকাতাতেও এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়েছিল (দ্য ডেইলি স্টার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪)। তৈরি দুধ, চিনি, ময়দা আর এলাচে: দুধ ঘন করে ক্ষীর বানিয়ে, ছানার সঙ্গে ময়দা মিশিয়ে ছোট ছোট গোল্লা — তাতেই সেই স্বাদ। ৫ ডিসেম্বর ২০২৪-এ এটি স্বীকৃতি পায় দেশের ৪৪তম জিআই পণ্য হিসেবে (ডেইলি স্টার)। এখন জেলায় অন্তত ৫০টি মিষ্টির দোকানে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কেজি ছানার পায়েশ বিক্রি হয়; কেজিপ্রতি দাম ছিল ৩৮০–৪০০ টাকা (ডেইলি স্টার, ডিসেম্বর ২০২৪ — বর্তমান দাম দোকানে যাচাই করুন)। অনুরাধা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, নন্দ গোপাল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, চারু সুইটস — নামগুলো স্থানীয়দের মুখে মুখে। সঙ্গে জেলার আরেক বিখ্যাত পদ ছানার চপও চেখে দেখতে পারেন।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: শেরপুর শহর থেকে শ্রীবরদী (~৩৩ কিলোমিটার) হয়ে কর্ণঝোরা বাজার; সেখান থেকে ~১ কিলোমিটারেই রাজার পাহাড়ের প্রবেশপথ (ভ্রমণ গাইড)। থাকা: ⚠ গারো পাহাড়ের কাছাকাছি রাতযাপনের ব্যবস্থা প্রায় নেই — ছোট একটি রিসোর্টে মাত্র নয়জনের জায়গা হয়, বেশিরভাগ পর্যটককে দিনের আলো থাকতেই ফিরতে হয় (প্রথম আলো) — শেরপুর শহরে থাকুন। কেনা: ফেরার পথে শহরের দোকান থেকে ছানার পায়েশ আর খাঁটি তুলশীমালা চাল কিনুন — জিআই পণ্যের নকল এড়াতে পরিচিত দোকান বেছে নিন। কখন: শীতকাল (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) পাহাড় ও ধান-কাটা মৌসুমের সুবাস — দুটোর জন্যই সেরা। খরচ-ভাবনা: একসঙ্গে গজনী-মধুটিলা-রাজার পাহাড় মিলিয়ে দুই দিনের পরিকল্পনা করলে যাতায়াত সাশ্রয়ী হয়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

রাজার পাহাড় কোথায়?

শ্রীবরদীর কর্ণঝোরায়, উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে (ভ্রমণ গাইড)।

পাহাড়ের বিশেষত্ব কী?

গারো শ্রেণির সবচেয়ে উঁচু বলে পরিচিত; চূড়ায় শতাধিক হেক্টর সমতল ভূমি, পাদদেশে ঢেউফা নদী (সংবাদ-ভ্রমণ বিবরণ)।

বাবেলাকোনায় কী আছে?

গারো-হাজং-কোচ জনপদ, কালচারাল একাডেমি, জাদুঘর, গির্জা ও মন্দির (ভ্রমণ গাইড)।

তুলশীমালা চাল কবে জিআই পায়?

১২ জুন ২০২৩ — দেশের ১৪তম জিআই পণ্য (বিডিনিউজ২৪)।

ছানার পায়েশ কবে জিআই পায়?

৫ ডিসেম্বর ২০২৪ — দেশের ৪৪তম জিআই পণ্য (দ্য ডেইলি স্টার)।

রাজার পাহাড়ের কাছে রাতে থাকা যায় কি?

প্রায় অসম্ভব — থাকতে হয় শেরপুর শহরে, দিনের আলোয় ফেরা নিরাপদ (প্রথম আলো)।

শেষকথা

রাজার পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে একদিকে মেঘালয়ের সীমান্ত, অন্যদিকে বাবেলাকোনার উঠোন-জীবন; আর শহরে ফিরে থালায় তুলশীমালার পোলাও আর ছানার পায়েশ — শেরপুরের গল্পটা এভাবেই পূর্ণ হয়: প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর স্বাদ মিলিয়ে। এই পোস্ট দিয়েই শেরপুর জেলার পাঁচটি গাইড সম্পূর্ণ হলো।